ইসরাত জেবিন
যুগ যুগ ধরে নানা রকমের খাদ্য ভোজনরসিকদের মন ভুলিয়ে রাখলেও যাদের হাতের স্পর্শে খাবার হয় অমৃত তারা অনেকটা সময় ছিলেন পর্দার আড়ালে। সময়ের সাথে আমাদের দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় রং আনতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে রেস্টুরেন্ট। রং আর স্বাদের বৈচিত্র্য আর সেই সাথে আঞ্চলিক আর দেশীয় ঢং এর উপর ভিত্তি করে থাই, ইতালিয়ান, চাইনিজ, ইন্ডিয়ান কুইজিন পরিচিতি পেয়েছে বিশ্বজুড়ে। একটু দেরিতে হলেও সেই তালিকায় স্থান করে নিচ্ছে বাংলাদেশি খাবারও। নানা বাহারের এই খাবারগুলো আমাদের সামনে নিয়ে আসে যারা তাদের ব্যাপারে আমরা খুব বেশি জানি না। সেইসব রন্ধনশিল্পীদের সম্মান জানাতেই ২০০৫ সালে ব্রিটিশ বাঙালি এনাম আলি এমবিই নিয়ে আসেন ব্রিটিশ কারি এ্যাওয়ার্ড। এ বছরের ২৫ নভেম্বর সোমবার বাটার্সি পার্কের দৃষ্টিনন্দন ভেন্যুতে কারিশিল্পের অস্কারখ্যাত ১৫তম ব্রিটিশ কারি এ্যাওয়ার্র্ড আসর অনুষ্ঠিত হয়।
ব্রিটিশ কারি এ্যাওয়ার্ড মানেই চোখ ধাঁধানো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আর আভিজাত্যের ছোঁয়া। কারিশিল্পের ‘অস্কার’ খ্যাত ব্রিটিশ কারি এ্যাওয়ার্ড এর এবারের অনুষ্ঠানও বরাবরের মতই জমকালোভাবে অনুষ্ঠিত হয়। রাজনীতিবিদ, খেলোয়াড়, মিডিয়াজগতের মানুষ আর দেশের প্রথম সারির ব্যক্তিবর্গের উপস্থিতেতে এই এ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানে সম্মান জানানো হয় ব্রিটেনের সেরা রেস্টুরেন্টগুলোকে। বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে দেয়া হয় এ্যাওয়ার্ড আর ছিল নানা ধরণের খাবারের আয়োজন আর পশ্চিমা এবং এশিয়ান দুর্দান্ত সব পারফরমেন্স।

কারিশিল্প ব্রিটেনের অর্থনীতিতেও বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। যুক্তরাজ্যের অর্থনীতিতে বছরে কারিশিল্প বা রেস্টুরেন্ট ব্যবসা থেকে আসে প্রায় সাড়ে চার বিলিয়ন পাউন্ড। বর্তমানে এই ব্যবসার সিংহভাগ ব্রিটিশ বাংলাদেশিদের হাতে। তাই বলা যায়, এই শিল্প বিলেতে বাংলাদেশিদের শুধুমাত্র অর্থনৈতিক মেরুদন্ডই নয়, তাদের পরিচয়ও বটে।
গেল বছর ব্রিটিশ কারি অ্যাওয়ার্ডের ১৪তম আসরে ১১টি ক্যাটাগরিতে পুরস্কার পায় ব্রিটেনের বিভিন্ন রেস্টুরেন্টের সফল শেফ এবং কর্তাব্যক্তিরা। এছাড়াও কিংবদন্তি সঙ্গীতশিল্পী আশা ভোসলেকে ‘দ্যা ইন্সপাইরেশন এ্যাওয়ার্ড’ এবং নন্দিত শেফ রেজাউল করিমকে দেয়া হয় ‘স্পেশাল রিকগ্নিশন এ্যাওয়ার্ড’। রন্ধনশিল্পের নেপথ্য কারিগরদের পাশাপাশি ব্রিটিশ মূলধারার রাজনীতিবিদ, বিনোদন ও ক্রীড়াজগতের এক ঝাঁক তারকার উপস্থিতিতে মিলনমেলায় পরিণত হয় ২০১৮ সালের কারি অ্যাওয়ার্ডের ১৪তম আসর।
সময়ের পরিক্রমায় ব্রিটিশ কারি এ্যাওয়ার্ড এখন আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত। এই এ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ার সাথে সাথে বেড়েছে এর দর্শকও। এই অনুষ্ঠানটি এখন প্রচারিত হয় দেশ বিদেশের বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে। গত বছর প্রায় ৪৩ মিলিয়ন দর্শক পৃথিবীর নানাপ্রান্ত থেকে উপভোগ করে অনুষ্ঠানটি।
ব্রিটিশ কারি অ্যাওয়ার্ডের প্রতিষ্ঠাতা এনাম আলি এমবিই, তার মেয়ে বর্তমানে এ প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান জেস্টিন আলি এবং ছেলে জেফরী আলি একের পর এক আইডিয়া উদ্বোধন করে চলেছেন তাদের ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় নতুনত্ব সৃষ্টির জন্য।
২০০৫ সালে জনাব এনাম আলি এমবিই যখন প্রথম এই এ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানটি শুরু করতে চেয়েছিলেন তখন তিনি ছিলেন একেবারেই একা। এই অনুষ্ঠান নিয়ে তার অনেক স্বপ্ন ছিল কিন্তু আজ তা যে পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছে তা তখন তার একেবারেই কল্পনাতীত ছিল। রন্ধনশিল্পীদের সৃষ্টিশীলতা আর কঠোর পরিশ্রমকে সম্মান দিয়ে তাদের তারকাখ্যাতি এনে দেয়ার যে উদ্দেশ্য নিয়ে তিনি এই পথচলা শুরু করেছিলেন তা আজ সফল হয়েছে শুধুমাত্র তার চেষ্টা আর পরিশ্রমের ফলে। এজন্য তাকে বলা হয় আধুনিক কারি শিল্পের অগ্রদূত।

এনাম আলি প্রথম যখন এই আইডিয়া নিয়ে কাজ শুরু করেছিলনে তখন অনেক বাধার সম্মুখীন হতে হয় তাকে। অনেকেই মত দিয়েছিল এটি শুধুমাত্র ‘ভারতীয়’ কিংবা ‘বাংলাদেশিদের জন্য। সকল আইনি ঝামেলা মিটিয়েই অনুষ্ঠান আয়োজন করতে এনাম আলিকে অনেক অর্থও খরচ করতে হয়েছে। সব সমস্যার শেষে ২০০৫ সালে তিনি এই এ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠান প্রথম আয়োজন করেন যা আজ ব্রিটিশ কালিনারি জগতের শ্রেষ্ঠত্বের প্রতীক।
২০০৫ সালে শুরু হয়ে আজকে এই এ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠান এগিয়েছে অনেকটা পথ। মানুষের রসনা বিলাসকে যারা শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেছে সেই অন্তরালের মানুষদের তারকাখ্যাতিতে বরণ করতে এখন প্রতিবছরই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকে তারকাব্যক্তিত্বরা। বিগত আট বছর ধরে রাণী এলিজাবেথ তার শুভকামনা পাঠান এর সাথে জড়িত সবার উদ্দেশ্যে। যুক্তরাজ্যের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন ২০১২ সালে লন্ডনের মেয়র হিসেবে অংশ নিয়ে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তা কারি শিল্পের জন্য দারুণ কাজে দিয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরুন এর সাথে এনাম আলি’র সখ্যতা সর্বজনবিদিত। তিনি অনুষ্ঠানে এসে প্রশংসা করে বলেছিলেন এটি হচ্ছে কারি শিল্পের অস্কার। সালোয়ার কামিজ পরে অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে সকলকে চমকে দিয়েছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে। তাই বলা যায়- ২০০৫ সালে যারা এই অনুষ্ঠান সম্পর্কে পিছনে কথা বলেছিল, সন্দেহও করেছিল টিকে থাকতে পারবে কিনা তাদের সবার সন্দেহ অমূলক প্রমাণ করেই এখনও স্বমহিমায় টিকে আছে ‘ব্রিটিশ কারি এ্যাওয়ার্ড’।
শুধু জৌলুশ ছড়ানোই এই অনুষ্ঠানের উদ্দেশ্য নয়। বাংলাদেশিদের দাবিদাওয়া তুলে ধরার একটি প্ল্যাটফর্ম এটি। বিভিন্ন সময় ব্রিটিশ বাংলাদেশিরা যেসব সমস্যার সম্মুখীন হয়েছে সেগুলার কথা ছাড়াও রেস্টুরেন্ট ব্যবসায় তারা যেসব বাধার সম্মুখীন হচ্ছে তাও তুলে ধরা হয় এই অনুষ্ঠানে।
হসপিটালিটি ক্যালেন্ডারের সবচেয়ে জমকালো এ ইভেন্টে নানা সময় দ্যুতি ছড়িয়েছেন কনজারভেটিভ পার্টির চেয়ারম্যান ব্র্যান্ডন লুইস, লিব ডেম লিডার স্যার ভিন্স ক্যাবল ও সাবেক ইউকিপ লিডার নাইজেল ফারাজ, জনপ্রিয় কমেডিয়ান অ্যাক্টিভিস্ট রাসেল সহ অনেকে। এনাম আলি বিশ্বাস করেন যে, ভারতবর্ষের রন্ধনশিল্পীদের হাত ধরে ক্যারি শিল্পে ব্রিটিশ রন্ধশিল্পীরা ভিন্ন মাত্রা দিয়েছেন। আর ব্রিটিশ কারি এ্যাওয়ার্ড তাদের যোগ্য সম্মানটাই শুধু দিচ্ছে।