মার্ক রায়, তুলুজ, ফ্রান্স:
ইউরোপের দেশগুলো থেকে অভিবাসন প্রত্যাশীদের আবার ফেরানো হচ্ছে ইউরোস্ট্যাট -এর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মে থেকে আগস্ট পর্যন্ত ইইউ-এর ২৭ সদস্য দেশ থেকে প্রায় এক লাখ অভিবাসনপ্রত্যাশীকে দেশে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সম্প্রতি প্রকাশিত ইউরোস্ট্যাট-এর পরিসংখ্যান আরো জানাচ্ছে, ওই চার মাসে ইইউভুক্ত দেশগুলো থেকে প্রত্যাবর্তনের নির্দেশ জারির হারও আগের তুলনায় বেড়েছে। মে থেকে আগস্ট মাসের মধ্যে ইউরোপের বাইরে থেকে আসা মোট ৯৬ হাজার ৫৫০ জনকে দেশে ফেরার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে ২৩ হাজার ১১০ জনকে ইতিমধ্যে নিজের দেশ, অথবা ইউরোপের অন্য একটি দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। ২০২১ সালে এর চেয়ে শতকরা ১৫ ভাগ কম মানুষকে প্রত্যাবর্তনের নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। ফেরত পাঠানো মানুষের সংখা তখন চলতি বছরের তুলনায় ১১ ভাগ কম ছিল। সবচেয়ে বেশি অভিবাসনপ্রত্যাশীকে নিজ নিজ দেশে ফেরার নির্দেশ দিয়েছে ফ্রান্স। মোট ৩৩ হাজার ৪৫০ জনকে এ নির্দেশ দিয়েছে তারা। ফ্রান্সের পরে রয়েছে যথাক্রমে গ্রিস (৮ হাজার ৭৫০ জন), জার্মানি (৮ হাজার ২৭৫ জন) এবং ইতালি (৬ হাজার ২০ জন)। এ সময়ে ফ্রান্স থেকে দেশে ফিরতে বাধ্য হয়েছেন ৩ হাজার ৫৯০ জন অভিবাসনপ্রত্যাশী। জার্মানি থেকেও ওই চার মাসে ২ হাজার ৭৬৫ এবং গ্রিস থেকে ১ হাজার ৭৭০ জনকে ফিরে যেতে হয়েছে। ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের মে থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত ইউরোপ থেকে সবচেয়ে বেশি ফেরানো হয়েছে আলবেনীয়দের। তাদের পর রয়েছে যথাক্রমে জর্জিয়া, রাশিয়া এবং তুরস্কের নাগরিকেরা। বিশ্লেষকরা মনে করেন, মূলত করোনা মহামারি পরিস্থিতির উন্নতির কারণেই অভিবাসনপ্রত্যাশীদের দেশে ফেরানোর উদ্যোগ বাড়ছে। ২০২০ সাল, অর্থাৎ করোনা মহামারি শুরুর বছরের মে থেকে আগস্টের মধ্যে মাত্র ৭৬০ জনকে দেশে ফিরিয়েছিল জার্মানি। তবে তার আগের বছর একই সময়কালে ফেরানো হয়েছিল ৯ হাজার ৯২০ জনকে। এ তালিকায় অভিবাসনপ্রত্যাশী বাংলাদেশিরাও রয়েছেন।
একটি সূত্র জানায় আনডকুমেন্টেট বা বৈধ কাগজবিহীন অভিবাসীদের ফেরাতে যথাযথ ব্যবস্থা না নেয়ায় বাংলাদেশের উপর নাখোশ ইউরোপীয় ইউনিয়ন। এজন্য বাংলাদেশিদের ভিসা প্রক্রিয়ায় সাময়িক কড়াকড়ি আরোপের প্রস্তাব করেছে ইউরোপীয় কমিশন। গত বছরের ১৫ জুলাই ইউরোপীয় কাউন্সিলের কাছে পাঠানো এই প্রস্তাবে বাংলাদেশ ছাড়াও ইরাক এবং গাম্বিয়াকেও যুক্ত করা হয়েছে। ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এ সংক্রান্ত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, বৈধ কাগজবিহীন (আনডকুমেন্টেড) অভিবাসীদের ফেরত নেয়ার (রিঅ্যাডমিশন) ব্যাপারে দেশগুলোর সহাযোগিতা আরো জোরদার করতে এই সিদ্ধান্ত নেয়া প্রয়োজন বলে মনে করছে ইইউ। উল্লেখ্য, ২০১৭ সালের আগস্ট মাসে বৈধ কাগজবিহীন অভিবাসীদের ফেরত নেয়ার ব্যাপারে বাংলাদেশের সঙ্গে ইইউর স্ট্যান্ডার্ড অব প্রসিডিউর (এসওপি) চুক্তি হয়। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, তা বাস্তবায়নে বাংলাদেশের আরো দ্রুত সহযোগিতা চায় ইইউ। এ সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আদান-প্রদান এবং জবাব দেয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের দিক থেকে আরো তৎপর পদক্ষেপের প্রত্যাশা ছিল তাদের। ইইউ অভিযোগ করেছে, বাংলাদেশ সরকার অনেক চিঠির জবাব দেয় না বা দিতে অনেক দেরি করে। ২০১৭ সালে চুক্তির পর তালিকা ও কাগজপত্র ম্যানুয়ালি বা সনাতন পদ্ধতিতে হস্তান্তর করা হতো। কিন্তু ২০২০ সালের নভেম্বরে এই ব্যবস্থা ডিজিটাল করা হয়। ডিজিটাল হওয়ার পর এখন পর্যন্ত এক হাজার ৫০০ ‘আনডকুমেন্টেড’ বাংলাদেশির তালিকা ও কাগজপত্র হস্তান্তর করে তারা। সেগুলো এখনও নিষ্পত্তির অপেক্ষায় আছে। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি রয়েছে জার্মানিতে। ইউরোপের এ দেশটিতে এমন ৮০০ জন বাংলাদেশি রয়েছেন। বৈধ কাগজপত্র ছাড়া বাংলাদেশির তালিকায় তারপরে রয়েছে ইতালি, গ্রিস ও মাল্টা। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ইইউ তাদের ভিসা নীতিতে পরিবর্তন আনে। তাতে বলা হয় যেসব দেশ রিঅ্যাডমিশন প্রক্রিয়ায় সহায়তা করবে না তাদের ভিসা প্রক্রিয়া কড়াকড়ি করা হবে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, জার্মানিতে আনডকুমেন্টেড তালিকার মধ্যে বাংলাদেশ ১৫০ জনের সাক্ষাৎকার নেয়। তার মধ্যে মাত্র একজনকে ‘বাংলাদেশি আনডকুমেন্টেড’ হিসেবে চিহ্নিত করে তারা, যা জার্মানি ভালোভাবে নেয়নি। এসব কারণে ইইউ অভিবাসনপ্রত্যাশীদের আবার নিজ দেশে ফেরৎ পাঠানো শুরু করেছে।
সূত্র: ডয়েচে ভেলে।