হাকিকুল ইসলাম খোকন, নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র প্রতিনিধি: নিউইয়র্কে ২৫ মার্চ ২০২৩ সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় জুইজ সেন্টার, জ্যাকসন হাইস্টস, নিউইয়র্কে জেনোসাইড ‘৭১ ফাউণ্ডেশন ইউএসএ এর উদ্যোগে জেনোসাইডে ভিকটিমদের স্মরণ, সম্মান, শ্রদ্ধা ও একাত্তুরের জেনোসাইডের বিশ্ব স্বীকৃতি অর্জন এবং জেনোসাইড প্রতিরোধের উদ্দেশ্য কর্মসূচির মাধ্যম পালিত হলো । ২৫ মার্চ জাতীয় জেনোসাইড দিবসের কর্মসূচির মধ্যে ছিল- ১) ভিকটিমদের স্মরণে ১ মিনিট নিরবতা ও ২৫ মার্চ এর বর্বরচিত হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে অন্ধকারে ১ মিনিট নিস্তব্ধতা, ২) একাত্তুরে বাংলাদেশে সংঘটিত জেনোসাইড (গণহত্যা) এর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি শীর্ষক সেমিনার ও আলোচনা, ৩) কবিতা আবৃত্তি, ৪) ডকুমেন্টারী ফ্লিম প্রদর্শন-‘মুক্তির নারী’ এবং ৫) জাতিসংঘের মহাসচিব বরাবর স্বারকলিপি প্রদান।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন- মুক্তিযোদ্ধা ড. প্রদীপ রঞ্জন কর, সভাপতি, জেনোসাইড ৭১ ফাউণ্ডেশন, ইউএসএ এবং সঞ্চালক ছিলেন- বিশিষ্ট আবৃত্তিকার- গোপন সাহা। প্রধান অতিথি ছিলেন- বাংলাদেশ নিউইয়র্কস্থ কনস্যুলেটের মিনিস্টার আয়েসা হক। বিশেষ অতিথিবৃন্দ- জাতিসংঘে বাংলাদেশ স্থায়ী মিশনের কাউন্সিলর মনাসির উদ্দিন, সাপ্তাহিক ঠিকানা পত্রিকার প্রধান সম্পাদক ফজলুর রহমান ও এক্সিভিস্ট রমেশ নাথ। আলোচক হিসাবে ছিলেন- ইঞ্জিঃ মোহম্মদ আলী সিদ্দিকী, এ্যাডঃ বকতিয়ার আলী ও খ. ম. জাহিদুল ইসলাম প্রমুখ। কবিতা আবৃতি করেন- গোপন সাহা, শুল্কা রায় ও শিবলী সাদেক। উদ্বোধনী সঙ্গীত পরিবেশন করেন- কণ্ঠশিল্পী- রেজা রহমান, জলি কর, মৌগন্ধা আচার্য্য, রূপালী ঘোষ, মৃনাল ঘোষ ও গোপন সাহা।
বক্তারা বলেন- একাত্তুরের ২৫শে মার্চ ভয়াল গণহত্যার সেই কালরাত্রি। মানবসভ্যতার ইতিহাসে এক কলঙ্কিত দিন। বাঙ্গালীর স্বাধীনতার ইতিহাসের নৃশংস, ভয়ঙ্কর ও বিভীষিকাময় সব ঘটনা ঘটেছিল সেই রাতে। দিবসটি বাঙ্গালীর মুক্তির ইতিহাসে কালরাত হিসাবে চিরজীবন রক্তের অক্ষরে লেখা থাকবে। পঁচিশে মার্চের সেই ভয়াল কালরাতে শুরু হওয়া গণহত্যায় যারা প্রাণ উৎসর্গ করেছিল তাঁদের স্মরণ, বিনম্র শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জানাই। একাত্তরের ২৫ মার্চ কালরাতে শুরু হওয়া গণহত্যার (জেনোসাইড) প্রায় ৪৬ বছর পর, বিগত ১১ মার্চ, ২০১৭ সালে জাতীয় সংসদে ২৫ মার্চ জাতীয় গণহত্যা দিবস হিসাবে স্বীকৃতি লাভ করে। ফলে দেশ ও বিদেশ জুড়ে এই দিনটি জাতীয় গণহত্যা (জেনোসাইড) দিবস হিসাবে পালিত হচ্ছে ভিন্ন মাত্রায়। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাক হানাদার বাহিনী যে গণহত্যা চালিয়েছিল তার নির্মম সাক্ষীও অনেক আন্তর্জাতিক সংস্থা ও মিডিয়া। কিন্তু দুঃখের বিষয় আন্তর্জাতিক সংস্থা ও মিডিয়া প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদের পরও একাত্তুরের এতবড় গণহত্যা (জেনোসাইড) আজও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি মিলেনি! ৭৫ এর পর সরকার গুলো রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এই গণহত্যা (জেনোসাইড) এর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়ার যে উদ্যোগ নেওয়া দরকার ছিল, তা নেওয়া হয়নি। বিশ্ব সম্প্রদায়ও চরম অবহেলা দেখিছে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এই অনীহা ও ব্যর্থতার ফলে বিশ্বে একের পর এক গণহত্যা (জেনোসাইড) অব্যাহত রয়েছে। আজকের এই দিনে প্রতিজ্ঞা হোক-যে কোন মূল্যে একাত্তুরের গণহত্যার (জেনোসাইড) আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ের লড়াইয়ে অবিচল থাকবো।
বক্তারা আরো বলেন- একাত্তরের জেনোসাইডের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অত্যাবশক। স্বীকৃতি আদায়ে কূটনীতি আরো জোড়ালো করার ব্যাপারে মতামত ব্যক্ত করেন। আন্তর্জাতিক সংস্থা ও মিডিয়ার বিভিন্ন মতামতসহ একাত্তরের জেনোসাইডের যথেষ্ট দলিল, তথ্যচিত্রসহ বিভিন্ন সাক্ষ্য-প্রমাণ রয়েছে। মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারও চলছে। এসংক্রান্ত বিভিন্ন মামলায় জেনোসাইড বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে। একাত্তরের ৯ মাসে বাংলাদেশে যে হত্যাকাণ্ড ঘটেছে তা যেভাবেই সংজ্ঞায়িত করা হোক, তা ‘জেনোসাইড’ হিসেবেই চিহ্নিত হবে, তা নিয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাক হানাদার বাহিনী যে জেনোসাইড চালিয়েছিল তার নির্মম সাক্ষীও অনেক আন্তর্জাতিক সংস্থা ও মিডিয়া প্রকাশিত হয়েছিল, যার বিষদ বর্ণনা রয়েছে। ইতিমধ্যে অনেকগুলো বিষয়ের অগ্রগতি হয়েছে যেমন- ১) ২৫ মার্চকে জাতীয় গণহত্যা দিবসের স্বীকৃতি লাভ, ২) ৯ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক জেনোসাইড স্মরণ ও প্রতিরোধ দিবস হিসাবে জাতিসংঘের স্বীকৃতি লাভ, ৩) জেনোসাইড বিষয়ে কূটনৈতিক তৎপরতা আগের যে কোন সময়ের চেয়ে এখন অনেক বেশী। ৪) আমেরিকাসহ বিদেশে ৪ টি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশে সংঘটিত একাত্তুরের জেনোসাইড বিষয়ে পড়ানো হচ্ছে, ৫) জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৭২তম অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা তাঁর ভাষণে তিনি একাত্তরের জেনোসাইডের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি তোলেন এবং তিনি বিশ্ব সম্প্রদায়কে এ ধরনের ঘটনার বিরুদ্ধে সম্মিলিত পদক্ষেপ গ্রহণেরও আহ্বান জানান, ৬) ঢাকায় ইন্টার পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের (আইপিইউ) গত সম্মেলনে বাংলদেশের মূল এজেন্ডা ছিল ‘একাত্তুরের গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়’। সম্মেলনে অংশ নেওয়া আইপিইউভুক্ত ১৩২ দেশের এমপিদের সামনে একাত্তরে পাকিস্তানি বাহিনীর চালানো নৃশংস গণহত্যার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আইপিইউ সাধারণ অধিবেশন এবং সমাপনী সাধারণ অধিবেশনেও বিষয়টি উত্থাপিত হয়েছে। ফলে বাংলাদেশ অনেকটাই সফল হয়েছে বিশ্বের অধিকাংশ সংসদীয় গণতান্ত্রিক দেশকে বিষয়টি জানাতে পেরে।’ ইন্টার পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের এই সম্মেলনে একাত্তুরের গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির পথ অনেকখানি প্রশস্ত হয়েছে। এটাকে কুটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে আরো সামনে এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন, ৭) মার্কিন কংগ্রেসে ১৯৭১-এর জেনোসাইড স্বীকৃতির প্রস্তাব উত্থাপন-গত ১৫ অক্টোবর, ২০২২; দুই মার্কিন আইনপ্রণেতা, রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যান স্টিভ চ্যাবট এবং ডেমোক্র্যাট কংগ্রেসম্যান রো খান্না, মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে পাকিস্তানকে ১৯৭১ সালের জেনোসাইডের ভূমিকার জন্য বাংলাদেশের জনগণের কাছে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানিয়ে একটি প্রস্তাব (H.RES. 1430, 117 তম কংগ্রেস, ২য় অধিবেশন) পেশ করেন। বিলটির কিছু অংশে ভাষাগত ত্রুটি সংশোধন সাপেক্ষে বিলটি সমর্থন যোগ্য। বর্তমান এই বিলটিতে কংগ্রেসম্যানগণ অনেক গুরুত্বপূর্ণ কথা উল্লেখ করে বলেছেন যে ‘জেনোসাইডে ভিকটিম লক্ষ লক্ষ মানুষের স্মৃতি মুছে ফেলার জন্য আমাদের বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে দেওয়া উচিত নয়। তারা আরো উল্লেখ করেছেন-জেনোসাইড স্বীকার করা ঐতিহাসিক রেকর্ডকে শক্তিশালী করে, আমেরিকানদের শিক্ষিত করে এবং অপরাধীদের জানাতে দেয় যে, এই ধরনের অপরাধ হলে সহ্য করা হবে না। ৫১ বছর পর ১৯৭১ সালের সবচেয়ে নৃশংস জেনোসাইড, যা প্রায় বিস্মৃত ছিল, তা মার্কিন কংগ্রেসে স্বীকৃতি পেতে উপস্থাপিত হয়েছে। এটাকে ইতিবাচক বিবেচনায় নিয়ে সামনে এগুনো বাঞ্ছনীয়। “The Genocide’71 Foundation, USA” দীর্ঘদিন ধরে এই বিষয়ে কাজ করে আসছে। দুই মার্কিন কংগ্রেসম্যানের উদ্যোগকে স্বাগত জানানো হয়। মার্কিন কংগ্রেসে এই সংশোদিত বিলটি পাসের জন্য এই সংগঠন সম্ভাব্য সব ধরনের সাহায্য ও সহযোগিতা প্রদানে স্বক্রীয় বিবেচনার রয়েছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় আন্তর্জাতিক সংস্থা ও মিডিয়া প্রকাশিত এত সব মতামত ও প্রতিবেদনের পরও একাত্তুরের এতবড় জেনোসাইড আজও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি মিলেনি! রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এই জেনোসাইডের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়ার যে উদ্যোগ নেওয়া দরকার ছিল। কিন্তু কখনোই তা জোড়াল হয়নি। বিশ্ব সম্প্রদায়ও চরম অবহেলা দেখিছে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এই অনীহা ও ব্যর্থতার ফলে বিশ্বে একের পর এক জেনোসাইড অব্যাহত রয়েছে। তার সর্বশেষ পরিনতি এ অঞ্চলের মায়ানমার রাষ্ট্রের রোহিংঙ্গা জেনোসাইড। আজকের এই দিনে প্রতিজ্ঞা হোক-যে কোন মূল্যে একাত্তুরের গণহত্যার (জেনোসাইড) আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ের লড়াইয়ে অবিচল থাকবো।
৮ দফা সুপারিশমালা:

১) আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়ার পথ বেশ দীর্ঘ হতে পারে। সে কারণে জেনোসাইড আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য স্বপ্ল ও দীর্ঘ মেয়াদী একটি সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ তৈরি করা।
২) একাত্তুরের জেনোসাইড ভয়াবহতা ও নৃশংসতা সম্পর্কে দেশে বিদেশে ব্যাপক জনমত তৈরী এবং এ উদ্দ্যেশে দেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সকল পর্যায়ের ‘বাংলাদেশ জেনোসাইড স্টাডিজ’ অন্তরভূক্ত করা।
৩) একাত্তরের জেনোসাইড আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ের যাবতীয় কাজ সম্পন্ন করার উদ্দেশ্যে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, তথ্য মন্ত্রণালয়ের সহ দেশের পথিতদশা গণহত্যা বিশেযজ্ঞ ও প্রবাসীদের সমন্বয়ে প্রয়োজনীয় লোকবল ও বাজেটসহ উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন শক্তিশালী জাতীয় কমিটি বা সেল গঠন করা।
৪) দেশী ও বিদেশী বিভিন্ন উৎস হতে একাত্তুরের জেনোসাইড নানাবিধ দালিলিক প্রমাণগুলো সংগ্রহের মাধ্যমে একটি ডকুমেন্ট প্রণয়ন করা। যাতে গণহত্যার যাবতীয় যথার্থ তথ্য ও চিত্র ছাড়াও তার সঙ্গে অডিও-ভিডিও থাকবে।
৫) হলোকস্ট ডিনাইল আইনের ন্যায় দেশে একটি আইন প্রনয়ন করতে যাতে জেনোসাইড প্রতিস্তিত ফ্যাক্ট নিয়ে বিতক তুলতে না পারে।
৬) কুটনীতিক পদক্ষেপ-প্রথমে বন্ধুপ্রতিম দেশসমুহের পার্লামেন্টে বাংলাদেশ জেনোসাইডের স্বীকৃতির আদায়। বিভিন্ন দেশের পার্লামেন্টের স্বীকৃতি আদায়ের পর সব দেশগুলো সম্মিলিত ভাবে জাতিসংঘ ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে স্বীকৃতির বিষয়টি উত্থাপিত করা। এ ক্ষেত্রে আরমানীয়া ও রুয়াণ্ডার অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো।
৭) জেনোসাইড আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি চাওয়ার পাশাপাশি এই জেনোসাইড মূল নায়কদের ও ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধী পাকিস্তানি সেনাদের আন্তর্জাতিক আদালতে বিচারের আওতায় আনার ব্যবস্থা করা।
৮) একাত্তরের জেনোসাইড আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির মাধ্যমে জেনোসাইড ইতিহাসের বিষয়ে পরিণত করা এবং যেখানে জেনোসাইড সেখানেই প্রতিরোধ এই নীতি গ্রহনের মাধ্যমে বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় আন্তর্জাতিক সংস্থা ও মানবাধিকার সংগঠনের সাথে কাজ করা।