প্রবাস মেলা ডেস্ক: সম্মানিত অতিথি হিসেবে বাংলাদেশ জাসদের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য নাজমুল হক প্রধান প্রবাস মেলা অফিস ভিজিট করেছেন। ২৯ নভেম্বর ২০২২, মঙ্গলবার সন্ধ্যায় প্রবাস মেলার কলাকুশলীদের সাথে তিনি চা-চক্রে অংশ নিয়ে দেশের বর্তমান রাজনীতিসহ নানা বিষয়ে কথা বলেন। আলোচনার এক ফাঁকে সাবেক এই সংসদ সদস্যের হাতে প্রবাস মেলা’র সৌজন্য কপি তুলে দেন পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক শহীদ রাজু।
জন্ম ও বেড়ে উঠা: নাজমুল হক প্রধান ১৯৫৭ সালে বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় জেলা পঞ্চগড়ে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা মরহুম বাছির উদ্দিন প্রধান ও মাতা নাজমা খাতুন। তারা ১০ ভাই-বোন। নাজমুল হক প্রধানের শৈশব-কৈশোর পঞ্চগড়েই কেটেছে।
শিক্ষাজীবন: স্থানীয় দেবত্তর বসুনিয়া পাড়া প্রি প্রাইমারি স্কুলে তার লেখাপড়া হাতেখড়ি। এখান থেকে প্রাথমিকের পাঠ চুকিয়ে জগদল হাইস্কুল থেকে ১৯৭১ সালে এসএসসি পরীক্ষা দেন (১৯৭২ সালে অনুষ্ঠিতব্য)। এরপর ১৯৭৪ সালে পঞ্চগড়ের মকবুলার রহমান সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করেন। ১৯৭৬ সালে দিনাজপুর সরকারি মহাবিদ্যালয় থেকে বিএসসি ফাইনাল পরীক্ষা দেয়ার সময় দেশের টালমাটাল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে মার্শাল সামরিক আইনে তিনি গ্রেপ্তার হয়ে কারাবরণ করেন। প্রায় ২০ মাস পর মুক্তি পেয়ে তিনি বিএসসি পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেননি। ১৯৭৯ সালের দিকে বিএ প্রাইভেট পরীক্ষা দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ভর্তি হন নাজমুল হক।

ছাত্ররাজনীতিতে নাজমুল হক প্রধান: ১৯৬৭ সালে ক্লাস সেভেনে পড়া অবস্থা দিনাজপুরে বড় বোনের বাসায় গেলে সেখানে এক বড় ভাই (ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে যুক্ত) নাজমুল হক প্রধানকে রাজনীতিতে আসতে উৎসাহিত করেন। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ১৯৬৯ সালে বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা হলে স্থানীয়ভাবে আমরা মিছিল করে প্রতিবাদ করি। তখন থেকেই ধীরে ধীরে রাজনীতিতে আসক্ত হয়ে পড়ি।
সাংগঠনিক কার্যক্রম: দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২-৭৩ সালে পঞ্চগড় জেলা ছাত্রলীগের সম্মেলনে সহ-সম্পাদক নির্বাচিত হন নাজমুল হক প্রধান। ১৯৭৪ সালে জেলা ফোরামের সদস্য (সাত জনের মধ্যে একজন)। এই ফোরামের কাজের মধ্য দিয়েই গণবাহিনী তৈরি হয়। ১৯৭৬ সালে মার্শাল আইনে গ্রেপ্তার হন তিনি। মুক্তির পর ১৯৭৮ সালে জেলা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক (গোপনে)। ১৯৭৯ সালে জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি নির্বাচিত হন নাজমুল হক। একই সময়ে তিনি কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সদস্যও হন। ১৯৮০ সালে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির প্রচার সম্পাদক এবং ৮৩ সালে ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হন নাজমুল। ১৯৮৫ সালে সাধারণ সম্পাদক এবং ১৯৮৮ সালে তিনি ছাত্রলীগের সভাপতি নির্বাচিত হন (জাসদপন্থী)। নাজমুল হক প্রধান বর্তমানে বাংলাদেশ জাসদের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এর সভাপতির দায়িত্বে রয়েছেন শরীফ নুরুল আম্বিয়া।
ছাত্ররাজনীতি নিয়ে মূল্যায়ন: দেশের বর্তমান ছাত্ররাজনীতি নিয়ে নাজমুল হক প্রধান বলেন, ৯০ সালের দিকে এরশাদ সরকারে পতনের পর পরবর্তী শাসকরা ছাত্ররাজনীতিকে গলাটিপে হত্যা করেছে। তারা নিজেদের স্বার্থে ছাত্ররাজনীতিকে ক্ষমতার লাঠিয়াল বাহিনীতে পরিণত করেছে।

এ প্রসঙ্গে সাবেক এই সংসদ সদস্য বলেন, যে ছাত্ররা ১৯৫২, ৬২, ৬৯ এবং ৯০ তৈরি করলো সেই ছাত্ররা এখন কিছু করতে পারছে না, তার মূল কারণ তাদের গলাটিপে হত্যা করা হয়েছে। ফলে রাশেদ খান মেনন কিংবা তোফায়েল আহমেদের মতো রাজনৈতিক নেতা তৈরি হচ্ছে না।
তিনি বলেন, ছাত্ররাজনীতি ধ্বংস করা মানে গণতন্ত্রকেও ধ্বংস করে দেয়া। বর্তমান শাসকরা ছাত্রদের মাধ্যমে ভিন্ন মত চর্চা করার জায়গাও শেষ করে দিয়েছে।
সংসদ সদস্য: নাজমুল হক প্রধান ২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পঞ্চগড়-১ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ‘মশাল’ প্রতীক নিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
দেশ নিয়ে ভাবনা: প্রিয় মাতৃভূমি নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে নাজমুল হক বলেন, অনেক হতাশা থাকলেও আমরা এগিয়ে যাব। আমাদের যে বিশাল মানবসম্পদ রয়েছে, তাদের দক্ষ করে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে আমরা উন্নত বিশ্বের কাতারে যেতে পারবো। তবে সরকার পরিচালনায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং গণতন্ত্র নিশ্চিত করতে হবে।
প্রবাসী বাংলাদেশি: বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রবাসী বাংলাদেশিদের দেশে রেমিটেন্স পাঠানো বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে নাজমুল হক প্রধান বলেন, এটা আমাদের জন্য দুর্ভাগ্য যে, যে মানুষগুলো মাথার ঘাম পায়ে ফেলে অনেক শ্রম দিয়ে অর্থ উপার্জন করে, তাদের ভিআইপি ট্রিটমেন্ট দেয়া উচিত। বিশেষ করে বিমানবন্দরে আসা যাওয়ার পথে তাদের জন্য আলাদা রুট করা দরকার। এতে তারা বৈধভাবে দেশে রেমিটেন্স পাঠাতে আরও উৎসাহিত হবে, অর্থনৈতিকভাবে আমাদের দেশ আরও সমৃদ্ধ হবে। এ বিষয়ে বিশেষ পদক্ষে নেয়া উচিত বলে আমি মনে করি।
পারিবারিক জীবন: ব্যক্তিগত জীবনে নাজমুল হক প্রধান দুই ছেলের পিতা। তার বড় ছেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করে গ্রামে পারিবারিক ব্যবসা দেখাশোনা করছেন। আর ছোট ছেলে ঢাকায় বাবার সঙ্গে থাকেন। তার স্ত্রীর নাম জাহানারা বেগম।