শরীফ মুহম্মদ রাশেদ:

১. রোম শুধু ইতালিতে নয়: যারা রোমের কথা ভাবেন তারা মনে করেন ইতালিতে অবস্থিত চিরন্তন শহর কিংবা রোম ইতালির রাজধানী। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ডে একই নামের একটি শহর রয়েছে। এর নাম রোমা, কুইন্সল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া। দক্ষিণ-মধ্য কুইন্সল্যানডের মারোনোয়া জেলার প্রধান বসতি। শহরটি ১৮৬২ সালে প্রতষ্ঠা করা হয়েছিল এবং ১৮৬৭ সালে একটি পৌরসভা হিসেব ঘোষণা করা হয়েছিল। কুইন্সল্যানডের রাজ্যের প্রথম গভর্নরের স্ত্রী ডায়ামান্টিনা রোমা বোয়েনের নামে এর নামকরণ করা হয়। ব্রিসবেনের সাথে ৫১০ কি:মি: পূর্ব-দক্ষিণপূর্ব রেল, বিমান এবং কার্নারভন ও ওয়ারেগো হাইওয়ে দ্বারা সংযুক্ত। এটি ভেড়া, গবাদি পশু, গম, ফল, আঙ্গুর এবং দুগ্ধ চাষের জন্য প্রসিধ্য। শহরে কসাইখানা, ময়দাকল এবং করাতকল, মাখন কারখানা, একটি ওয়াইনারি এবং একটি গবাদি পশুর বাজার রয়েছে। ১৯৬০-এর দশকে আবিষ্কৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের একটি বড় মজুদ স্থানীয় বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ব্যবহৃত হয় এবং ব্রিসবেনে সরবরাহ করা হয়। শহরটির এরিয়া ৭৮.১ বর্গ কি:মি:। জনসংখ্যা প্রায় ৭ হাজার।

২. বার্সেলোনা নামে বিশ্বে দুটি শহর রয়েছে: একটি স্পেনের কাতালোনিয়ায়, অন্যটি ইতালির সিসিলিতে। এর অফিসিয়াল নাম বার্সেলোনা পোজো ডি গোটো (Barcelona Poyyo di Gotto)। এটি সিসিলির প্রাদেশিক রাজধানী পালেরমর পরে মেসিনা প্রদেশের সবচেয়ে জনবহুল শহর। শহরটি সিসিলির উত্তর উপকূলে অবস্থিত এবং নামটির উৎপত্তি স্প্যানিশ শহর Barcelona থেকে এবং ১৮৩৫ সালে একে সিসিলির Poyyo di Gotto গ্রামের সাথে একীভূত করা হয়েছিল যেখানে সেন্ট সেবাস্টিয়ান মাদার চার্চ নামে একটি বিখ্যাত চার্চ ছিল। প্রকৃতপক্ষে, Poyyo di Gotto, ষোড়শ শতাব্দীতে বিদ্যমান ছিল এবং ফিলিপ গোট্টো দ্বারা খনন করা একটি কূপের চারপাশে নির্মিত হয়েছিল। সপ্তদশ শতাব্দীতে বার্সেলোনা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর এটি আঠারো শতাব্দীর মাঝামাঝি পর্যন্ত ক্যাস্ট্রোরেল অঞ্চলের অন্তর্গত ছিল। এর কৌশলগত অবস্থান বার্সেলোনা পোজো ডি গোটোকে নেব্রোডি এবং পেলোরিটানি পর্বত, এওলিয়ান দ্বীপপুঞ্জ এবং মাউন্ট এটনা অভিমুখে ভ্রমণের জন্য একটি আদর্শ সূচনা পয়েন্ট হিসেবে গড়ে তোলে। সেন্ট সেবাস্টিয়ান মাদার চার্চ সপ্তদশ শতাব্দীতে ফিরে যায়, ১৯৩৬ সালে ভেঙ্গে এর মূল কাঠামোর ধ্বংসাবশেষের উপর নিওক্লাসিক্যাল শৈলীতে পুনঃর্নির্মিত হয়েছিল। এর অভ্যন্তরে গ্যাস্পেয়ার কামার্দার ‘দ্য ভার্জিন এবং সেন্ট ফ্রান্সিস’ হিসাবে সূক্ষ্ম শিল্পকর্ম দ্বারা সংরক্ষণ করা হয়েছে। এটি আঠারো শতাব্দীর একটি সম্পদ এবং পঞ্চদশ শতাব্দীর একটি চিত্রকর্ম যা একজন অজানা লেখকের দ্বারা চিত্রিত হয়েছিলো। এছাড়াও এখানকার আঠারো শতাব্দীর ব্যাসিলিয়ানদের চার্চ, সিটি লাইব্রেরি এবং নৃতাত্ত্বিক যাদুঘর পর্যটকদের আকর্ষণীয় বস্তু। এর এরিয়া প্রায় ৬০ বর্গ কি:মি: এবং জনসংখ্যা প্রায় ৬০ হাজার।

৩. প্যারিস শুধুমাত্র ফ্রান্সের রাজধানী নয়: প্যারিস ফ্রান্সের রাজধানী এটা আমরা সবাই জানি। কিন্তু একই নামে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের একটি শহরও যে আছে তা কি আমরা জানি? মজার ঘটনা হল প্রখ্যাত পরিচালক উইম ওয়েন্ডারস পরিচালিত প্যারিস, টেক্সাস নামে ১৯৮৪ সালে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করা হয়েছিল। প্যারিস টেক্সাস, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র লামার কাউন্টির উত্তর-পূর্ব টেক্সাস, ইউএস, ডালাসের প্রায় ১৭০ কি:মি: উত্তর-পূর্বে রেড এবং সালফার নদীর মধ্যবর্তী একটি শৈলশিরায় অবস্থিত। এর সূচনা হয় ১৮৪৫ সালে এবং ফ্রান্সের রাজধানী শহর প্যারিসের নামে এর নামকরণ করা হয়। এটি ১৮৭৬ সালে রেলপথ নির্মাণের পরে বিকশিত হয়েছিল। ১৯১৬ সালে একটি বিপর্যয়কর অগ্নিকা-ের পরে শহরটিকে পুণরায় পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা হয়।
১৯৮২ সালের এপ্রিল মাসে টর্নেডোয় ১৫০০টিরও বেশি বাড়ি এবং ভবন ধ্বংস হওয়ার পরেও শহরটি পুনঃনির্মাণ করা হয়েছিল। শহরটি তুলা, শস্য এবং গবাদি পশুর আবাদের জন্য বিখ্যাত। প্যারিস উত্তর-পশ্চিম টেক্সাস এবং দক্ষিণ-পূর্ব ওকলাহোমার জন্য একটি আঞ্চলিক চিকিৎসা কেন্দ্র হিসাবেও ব্যাপকভাবে পরিচিত। এখানকার নামকরা প্যারিস জুনিয়র কলেজ ১৯২৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৮৬৮ সালে নির্মিত স্যাম বেল ম্যাক্সি হাউস একটি রাষ্ট্রীয় ঐতিহাসিক স্থান হিসেবে সংরক্ষিত আছে। এছাড়াও শহরটিতে একটি ৬৫ ফুট আইফেল টাওয়ারের অনুরূপ টাওয়ার নির্মাণ করা হয় যার উপরে একটি কাউবয় টুপি রয়েছে। শহরটির এরিয়া ৯৬.০১ বর্গ কি:মি: এবং জনসংখ্যা ২৪ হাজার ১৭১ জন।

৪. ইতালির মিলান ছাড়া এ নামে বিশ্বের আরও একটি শহর রয়েছে: মিলান ইতালির একটি শহর, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইওতে মিলান নামে একটি বিখ্যাত শহর রয়েছে। ওহাইওর মিলান পর্যটকদের পরিচিত কারণ এটি টমাস এডিসনের জন্মস্থান। একসময় এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওহিও রাজ্যের এরি এবং হুরন কাউন্টির একটি গ্রাম ছিল। ১৮০৪ সালে মোরাভিয়ান মিশনারিরা সাইটে পেকোটিং নামে একটি ভারতীয় গ্রাম প্রতিষ্ঠা করেন। কানেক্টিকাট থেকে বসতি স্থাপনকারীরা কয়েক বছর পরে সেখানে এসেছিলেন এবং গ্রামটি ১৮১৬ সালে ইবেনেজার মেরি দ্বারা ইতালির মিলানের নামে নামকরণ করা হয়েছিল। সেখানে একটি খাল খনন করা হয়। ১৮৩৯ সালে গ্রামটিকে হুরন নদীর মাধ্যমে ইরি হ্রদের সাথে সংযুক্ত করে গম রপ্তানী এবং জাহাজ নির্মাণ কেন্দ্রে পরিণত করা হয়।

৫. পৃথিবীর দুই বিপরীত অংশে দুটি সিডনি: অস্ট্রেলিয়ার সিডনি ছাড়াও একই নামে কানাডার নোভা স্কসিয়ায় একটি শহর আছে। এটি নোভা স্কসিয়ার কেপ ব্রেটন আঞ্চলিক পৌরসভার মধ্যে কেপ ব্রেটন দ্বীপের সিডনি নদীর মুখে সিডনি হারবারের দক্ষিণ-পূর্ব দিকে অবস্থিত একটি পুরনো শহর। ১৭৮৫ সালে ব্রিটিশরা শহরটির গোড়াপত্তন করেন এবং ১৯০৪ সালে একটি শহর হিসাবে স্বীকৃতি পায়। তৎকালীন ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সেক্রেটারি ব্যারন সিডনির নামে এর নামকরণ করা হয়। ১৮২০ সাল পর্যন্ত সিডনি কেপ ব্রেটন দ্বীপের রাজধানী ছিল। ১৯ শতকের গোড়ার দিকে বিশেষ করে স্কটল্যান্ডের হাইল্যান্ডস থেকে বিপুল সংখ্যক অভিবাসীর আগমন এবং ২০ শতকের প্রথম দিকে সেখানে একটি বড় ইস্পাত কারখানা খোলার পর সিডনির জনসংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। শহরটির এরিয়া ৩০৯১ বর্গ কি:মি: এবং সেখানে প্রায় ৩০ হাজার লোক বাস করে।

৬. লন্ডন নামে বিশ্বে দুইটি শহর আছে: লন্ডন শুধুমাত্র যুক্তরাজ্যের রাজধানী শহর নয়, কানাডার অন্টারিওতে লন্ডন নামে আরও একটি শহর আছে। এটি এরি লেক এবং মার্কিন সীমান্তের ঠিক উত্তরে, দক্ষিণ-পশ্চিম অন্টারিওর একটি কানাডিয়ান শহর যেখানে ওয়েস্টার্ন অন্টারিও বিশ্ববিদ্যালয় অবস্থিত। সেখানে লন্ডন যাদুঘর, আঞ্চলিক শিল্প এবং ঐতিহাসিক নিদর্শনের একটি প্রদর্শন কেন্দ্র এবং ইন্টারেক্টিভ চিলড্রেনস মিউজিয়াম রয়েছে। কানাডার লন্ডন শহর লেক অন্টারিও (পূর্ব), সেন্ট ক্লেয়ার (পশ্চিম, লেক হুরন (উত্তর) এবং লেক এরি (দক্ষিণ) এর মাঝখানে অবস্থিত। ১৭৯২ সালে এর নামকরণ করে কানাডায় ব্রিটিশ রাজধানীর অবস্থানের জন্য বেছে নেওয়া হয়েছিল। ১৯ শতকের মাঝামাঝি সময়ে এটি ব্রিটিশ গ্যারিসন শহর হিসাবে ব্যবহার করা হয়। অনেকগুলো লেকের অবস্থানের ফলে শহরটিকে গুরুত্বপূর্ণ পরিবহন এবং শিল্প কেন্দ্রে পরিণত করা হয়েছে। আজ এটি আশেপাশের কৃষি অঞ্চলে পণ্য পরিবহনের জন্য বিস্তৃত রেল এবং হাইওয়ে নেটওয়ার্কের কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয়েছে। এর এরিয়া ৪২০.৬ বর্গ কি:মি:, জনসংখ্যা প্রায় ৪ লাখ ৮ হাজার ৬৯৯ জন।

৭. বিশ্বে দুই লস অ্যাঞ্জেলেস আছে: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রর ক্যালিফোর্নিয়া ছাড়াও লস অ্যাঞ্জেলেস নামে চিলিরও একটি শহর আছে। এই শহরটি চিলির মধ্য-দক্ষিণাঞ্চলের বায়ো বায়ো প্রদেশের রাজধানী। এটি লাজা এবং বায়োবিও নদীর তীরে অবস্থিত। এটি ১৭৩৯ সালে নুয়েস্ট্রা সেনোরা দে লস অ্যাঞ্জেলেস (আওয়ার লেডি অফ দ্য অ্যাঞ্জেলেস) হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ১৮৫২ সালে শহরের মর্যাদায় উন্নীত হয়। ১৮২০ সালে লস অ্যাঞ্জেলেস আগুনে পুড়ে গিয়েছিল, বারবার ভূমিকম্পে ক্ষতি হয়েছে এবং দীর্ঘ সংগ্রামে বেশ কয়েকবার আরাকানিয়ান ভারতীয়দের সাথে যুদ্ধ করে ধ্বংস হয়েছিল। এটি এখন একটি কৃষি প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র যা মূলত উপত্যকায় উৎপাদিত দুগ্ধ, গম, সুগার, বিট, ফল এবং কাঠের ব্যবসার জন্য বিখ্যাত। ১৭৪৮ বর্গ কি:মি: এরিয়ার শহরটির জনসংখ্যা ১,৮,৬৭১ জন।