ডালিয়া মারিন, মিউনিক, জার্মানি
জার্মানি পুনঃসামরিকীকরণের প্রতি তার দীর্ঘ কয়েক দশকের অনীহাকে বাতিল করে এখন সামরিক ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের জন্য ইউরোপের দীর্ঘস্থায়ী উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে নেতৃত্বের ভূমিকা গ্রহণ করেছে। কিন্তু এখন এমন একটি যুগের সূচনা হয়েছে যখন যুদ্ধের হুমকি মোকাবেলার চ্যালেঞ্জ সবসময়ই থাকে। ফলে জার্মানি এবং ইউরোপকে অবশ্যই সামরিক উদ্ভাবনে প্রচুর বিনিয়োগ করতে হবে।
রাশিয়া ইউক্রেন আক্রমণ করার তিন দিন পর ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২২ জার্মান চ্যান্সেলর ওলাফ শোলজ বুন্ডেস্ট্যাগের একটি বিশেষ অধিবেশনের সামনে দাঁড়িয়ে এই আক্রমণকে জার্মান ইতিহাসের একটি ‘টার্নিং পয়েন্ট’ বলে ঘোষণা করেছেন। তার বক্তৃতায় জার্মানির কয়েক দশক ধরে পুনঃসামরিকীকরণের প্রতি অনিচ্ছাকে পিছনে ফেলে শোলজ প্রতিরক্ষা ব্যয় ১০০ বিলিয়ন ইউরো (৯৮.৫ বিলিয়ন ডলার) বৃদ্ধি করার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন।
আগস্ট মাসে প্রাগের চার্লস ইউনিভার্সিটিতে এক ঘণ্টার বক্তৃতায় শোলজ ‘টার্নিং পয়েন্ট’ এর অর্থ আরও স্পষ্ট করেছেন। সেখানে তিনি জার্মান নেতৃত্বে ইউরোপের ‘সামরিকীকরণ’ এর জন্য তার দৃষ্টিভঙ্গির রূপরেখা তুলে ধরেন এবং একটি শক্তিশালী আরও ‘সার্বভৌম’ ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠার জন্য সদস্য দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানান যাতে নিজ দেশকে রক্ষা করার পাশাপাশি বিদেশী শক্তির প্রভাবের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে ইইউ আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

কয়েক দশক ধরে জার্মানি তার সামরিক বাহিনীর জন্য খুব কম খরচ করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য ন্যাটো অংশীদারদের মর্মবেদনার কারণে দেশটি সুরক্ষার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উপর নির্ভর করেছে। কিন্তু রাশিয়ার আগ্রাসনের পরিপ্রেক্ষিতে এটা স্পষ্ট যে, জার্মানি তার জিডিপি’র ২ শতাংশ ন্যাটোর জন্য সামরিক ব্যায়ের লক্ষ্যমাত্রা থেকে নিজেকে বিরত রাখতে পারে না। তাই নীতিনির্ধারকদের অবশ্যই দেশের সশস্ত্র বাহিনীকে শক্তিশালী করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হতে হবে।
কিন্তু জাতীয় প্রতিরক্ষা ব্যয়ে জার্মানির নতুন প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন কী অর্থ বোঝাবে? যদি এটি ইউরোপের পুনঃসামরিকীকরণে জার্মানিকে নেতৃস্থানীয় ভূমিকা গ্রহণ করতে হয়, তবে এটিকে একটি ভূ-রাজনৈতিক যুগের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় এর অর্থনীতিতে রূপান্তর ঘটাতে হবে। কারণ সেখানে যুদ্ধ একটি চির-বর্তমান হুমকি। জার্মান সরকার এই নতুন বাস্তবতার সাথে খাপ খাইয়ে নিতে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিতে পারে।
প্রথমত, জার্মানি এবং ইউরোপকে অবশ্যই ইউএস ডিফেন্স অ্যাডভান্সড রিসার্চ প্রজেক্টস এজেন্সি (DARPA) এর আদলে একটি ইইউ-স্তরের সামরিক গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যা উচ্চ প্রযুক্তি উদ্ভাবনে ইইউ অন্তত এক দশক ব্যাপী সামরিক গবেষণার রেকর্ড নিয়ে গর্ব করতে পারে। ইউরোপীয় (DARPA) তৈরিতে জার্মানির নেতৃত্ব দেওয়া উচিত, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতার সাথে তাল মিলিয়ে চলার জন্য অপরিহার্য।
দ্বিতীয়ত, গত তিন বছরে জার্মানি ইতিমধ্যেই এই দিকে ছোট ছোট পদক্ষেপে এগুচ্ছে। ২০১৯ সালে তার সরকার যুগান্তকারী উদ্ভাবনে অর্থায়নের জন্য একটি নতুন সংস্থা তৈরি করেছে। কিন্তু নতুন এজেন্সিটি খুবই ছোট এবং DARPA এর মতো সামরিক বাহিনীর সাথে যুক্ত নয়। ইইউ-স্তরের এজেন্সির তুলনায় এর যুগান্তকারী আবিষ্কার করার ক্ষমতা অনেক সীমিত যাতে এর উদ্ভাবকরা অনেক বড় পুলে অ্যাক্সেস নিতে পারে।

তৃতীয়ত, যুদ্ধকালীন সময়ে একটি সামরিক গবেষণা সংস্থা প্রতিষ্ঠা করা অপরিহার্য। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইস্রায়েলের মতো দেশে প্রতিরক্ষা খাত উদ্ভাবনের একটি প্রধান চালক হিসেবে কাজ করে। উভয় দেশেই সামরিক-অর্থায়নকৃত গবেষণা খাতে আমাদের কাছে জিপিএস, সিরি এবং টাচস্ক্রিনের মতো প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন আনতে সাহায্য করতে পারে। কিন্তু যুদ্ধের জন্য একটি ভিন্ন ধরনের উদ্ভাবন প্রয়োজন এবং ইউরোপকে তার নিজস্ব অত্যাধুনিক সামরিক সরঞ্জাম তৈরি করতে সক্ষম হতে হবে।
চতুর্থত, সেমিকন্ডাক্টর এবং সবুজ ব্যাটারির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ডাটা সরবরাহ সুরক্ষিত করার ক্ষেত্রেও জার্মানিকে নেতৃত্ব দিতে হবে। দুটোই ইউরোপীয় নিরাপত্তার জন্য অত্যাবশ্যক। আন্তর্জাতিক বাজার তার নিজস্ব ডিভাইস ছড়িয়ে দিয়েছে কিন্তু এটি বিশ্বব্যাপী সরবরাহ চেইনকে আরও স্থিতিস্থাপক করে গড়ে তুলবে না। সুতরাং উভয় মহাদেশে বিকল্প সরবরাহকারী পাওয়া যায় কিনা তা নিশ্চিত করতে হবে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় সরকারগুলোকে এশিয়া থেকে দূরে থাকতে হবে। একইভাবে এটা নিশ্চিত করতে হবে যে, তাইওয়ান থেকে সেমিকন্ডাক্টর ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানির সরবরাহ ব্যাহত হয়, তাহলে বিশ্বজুড়ে গাড়ি বা যন্ত্রপাতি উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাবে না, যেমনটি কোভিড-১৯ মহামারীর সময় হয়েছিল।
এখন যুদ্ধের সময়। এখন শুধুমাত্র বিশ্বব্যাপী সরবরাহ চেইন শক্তিশালী করাই যথেষ্ট নয়। উদাহরণস্বরূপ, চীন যদি আগামীকাল তাইওয়ান আক্রমণ করে, তাহলে জার্মানি এবং ইউরোপ কীভাবে ব্যাটারি এবং চিপের চাহিদা মেটাবে? চীন বর্তমানে বিশ্বের ৮০% ব্যাটারি উৎপাদন করে এবং এর মূল খনিজ এবং ধাতুগুলির প্রক্রিয়াকরণ নিয়ন্ত্রণ করে। যার মধ্যে ৮০% বিরল আর্থ-উপাদান এবং প্রায় ৬০% লিথিয়াম এবং কোবাল্ট রয়েছে। অন্যদিকে তাইওয়ান (দক্ষিণ কোরিয়ার সাথে) সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনে আধিপত্য করে। ভবিষ্যতে সম্ভাব্য সাপ্লাই-চেইন শক থেকে নিজেকে রক্ষা করতে হলে ইউরোপকে অবশ্যই বৃহত্তর কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের লক্ষ্যের সাথে সরবরাহ চেইনগুলিকে জোটাবদ্ধ করতে হবে।

অধিকন্তু, ইউক্রেন আক্রমণ করার সময় রাশিয়া যে ফাঁদে পা দিয়েছিল তা এড়াতে ইউরোপের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন অর্জন খুবই জরুরি। বছরের পর বছর ধরে রাশিয়া তার সামরিক প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিক ভিত্তি তৈরি করতে অবহেলা করেছিল এবং এর পরিবর্তে জার্মানির রাইনমেটাল থেকে আমদানির উপর প্রচুর নির্ভর করেছিল। গত সাত মাসে রাশিয়ার উপর আরোপিত বহুপাক্ষিক নিষেধাজ্ঞাগুলি তার অস্ত্রাগারকে খুব দ্রুত হ্রাস করেছে এবং এর সক্ষমতা পুনঃর্নিমাণে প্রায় অক্ষম করে ফেলেছে। রাশিয়ার প্রযুক্তিগত দুর্বলতা জার্মানি এবং বাকি ইউরোপের জন্য একটি সতর্ক বার্তা হিসাবে দেখা উচিত।
যুদ্ধকালীন অর্থনীতিতে ইউরোপীয় সরকারগুলিকে জনসাধারণের জন্য অর্থায়নের পাশাপাশি সামরিক গবেষণা ও উন্নয়ন খাতেও অর্থায়ন বাড়াতে হবে। এজন্য প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে পাবলিক-প্রাইভেট অংশীদারিত্ব এবং স্টার্টআপগুলিকে উৎসাহিত করতে হবে এবং কাঁচামালের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ সুরক্ষিত করতে হবে। ২০৩০ সালের মধ্যে ইউরোপে বিশ্বের ২০% চিপ উৎপাদন করার একটি উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করে প্রস্তাবিত ইইউ চিপস আইন প্রণয়ন এবং ইউরোপীয় ব্যাটারি অ্যালায়েন্স গঠনকে সঠিক পদক্ষেপ বলে মনে করা হচ্ছে। কিন্তু এই অন্ধকার সময়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আরও অনেক কিছু করতে হবে।
ডালিয়া মারিন: মিউনিখের টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটির স্কুল অফ ম্যানেজমেন্টের আন্তর্জাতিক অর্থনীতির অধ্যাপক, সেন্টার ফর ইকোনমিক পলিসি রিসার্চের একজন গবেষণা ফেলো এবং BRUEGEL এর অনাবাসিক ফেলো।
স্বত্ত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
অনুবাদ: শহীদ রাজু।