শরীফ মুহম্মদ রাশেদ:
যুক্তরাজ্যের নতুন প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন কনজারভেটিভ পার্টির পররাষ্ট্রমন্ত্রী লিজ ট্রাস। বেশ কিছু কেলেঙ্কারির কারণে গত জুলাই মাসে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরে যেতে বাধ্য হন বরিস জনসন। এরপরই কনজারভেটিভ দলের নতুন প্রধান নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। ২ সেপ্টেম্বর ২০২২, শুক্রবার পর্যন্ত ভোটগ্রহণ হয়েছে। ভোটে ট্রাস সাবেক অর্থমন্ত্রী ঋষি সুনাককে পরাজিত করে ৬ সেপ্টেম্বর ২০২২, মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এর মধ্য দিয়ে গত ছয় বছরে চার জন প্রধানমন্ত্রী পেয়েছে দেশটি। এছাড়া যুক্তরাজ্যের ইতিহাসে তৃতীয় নারী হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন লিজ ট্রাস।
স্বল্প পরিচিত রাজনীতিবিদ লিজ ট্রাসের রাজনৈতিক যাত্রা বেশ বৈচিত্র্যময়। বামপন্থী পরিবারে জন্ম নেয়া ট্রাস প্রথমে লিবারেল ডেমোক্র্যাট পার্টির সমর্থক ছিলেন, পরে ২০১০ সালে তিনি কনজারভেটিভ পার্টি থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। প্রথমে তিনি ব্রেক্সিটের বিপক্ষে ছিলেন। তবে ব্রিটিশরা ব্রেক্সিটের পক্ষে ভোট দিলে তিনি দ্রুতই ব্রেক্সিটের কট্টর সমর্থক হয়ে উঠেছিলেন, যা রাজনীতিতে তার উত্থানে বিরাট ভূমিকা রাখে। তিনজন প্রধানমন্ত্রীর মন্ত্রিসভায় আস্থাভাজন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন ট্রাস।
জন্ম ও শিশুকাল
পুরো নাম মেরি এলিজাবেথ ট্রাস। ১৯৭৫ সালের ২৬ জুলাই ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ডে জন কেনেথ এবং প্রিসিলা মেরি ট্রাসের ঘরে জন্মগ্রহণ করেন। ছোটবেলা থেকেই তিনি এলিজাবেথ নামে বেশি পরিচিত ছিলেন। তার বাবা লিডস বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশুদ্ধ গণিতের একজন এমেরিটাস অধ্যাপক, তখন তার মা ছিলেন একজন নার্স, শিক্ষক এবং পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ অভিযানের সদস্য। ট্রাসের বয়স যখন চার বছর, তখন তার পরিবার স্কটল্যান্ডে চলে যায়।

পড়াশোনা
শিক্ষাজীবনের শুরুতে ট্রাস পেসলি, রেনফ্রুশায়ারের ওয়েস্ট প্রাইমারি স্কুলে পড়াশোনা করেন। তারপর লিডসের রাউন্ডহে এলাকায় একটি সরকারি স্কুলে পড়াশোনা করেন। পরে অক্সফোর্ডের মেরটন কলেজে পড়াশোনা করেছেন ট্রাস। সেসময় লিবারেল ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে সক্রিয় ছিলেন তিনি। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি লিবারেল ডেমোক্র্যাটসের প্রেসিডেন্ট এবং লিবারেল ডেমোক্র্যাট যুব ও ছাত্রদের জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্যও ছিলেন লিজ ট্রাস। তবে ১৯৯৬ সালে স্নাতক হওয়ার পর যোগ দেন কনজারভেটিভ পার্টিতে।
রাজনীতি
আশির দশকের শেষের দিকে যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচারের বিরুদ্ধে রাজপথে নামা লিজ ট্রাস এখন নিজেকে থ্যাচারের আদর্শের মশালের একজন ধারক হিসেবে পরিচয় দেন। প্রথমে ব্রেক্সিটের বিরোধিতা করে পরে এর পক্ষে অবস্থান নেন লিজ ট্রাস, যা রাজনীতিতে তার উত্থানে বিরাট ভূমিকা রাখে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন।
রাজনৈতিক বিতর্ক
লিবারেল ডেমোক্র্যাটস পার্টির সদস্য থাকা অবস্থায় গাঁজা সেবনের বৈধতা এবং ব্রিটিশ রাজতন্ত্র বিলোপের দাবিতে সোচ্চার ছিলেন লিজ ট্রাস, যা তাঁর বর্তমান অবস্থানের পুরোপুরি বিপরীত। লিজ ট্রাসের ভাষ্যমতে, ১৯৯৬ সালে তিনি কনজারভেটিভ পার্টিতে যোগ দেন। এর মাত্র দুই বছর আগে লিবারেল ডেমোক্র্যাটস পার্টির এক সভায় বক্তব্যে ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের অবসানের দাবি তুলেছিলেন তিনি। কনজারভেটিভ পার্টিতে যোগ দেয়ার পর থেকেই লিজ ট্রাসের সততা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন লিবারেল ডেমোক্র্যাটস দলের সাবেক সহকর্মীরা। এখনও লিজ ট্রাসকে বিশ্বাসঘাতক হিসেবে চিত্রায়িত করেন করেন তারা। লিজ ট্রাস সব সময় আশপাশের মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করতে চাইতেন। কনজারভেটিভ পার্টিতে যোগ দিয়ে এমপি হওয়ার পর থেকে তিনি প্রায় প্রতিটি রক্ষণশীল মতকে জোরালো সমর্থন দিয়েছেন।

ব্রেক্সিটের পক্ষে-বিপক্ষে
২০১৬ সালে যখন ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে যুক্তরাজ্যের বের হওয়া নিয়ে আলোচনা তুঙ্গে, ঠিক ওই সময়ই লিজ ট্রাস ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকার পক্ষে অবস্থান নেন। তখন তাঁকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও বেশ সরব দেখা গেছে। সেসময় টুইটবার্তায় লিজ ট্রাস লেখেন, যাঁরা ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকতে চান তাঁদের সমর্থন করেন তিনি। এর কারণ হিসেবে বলেন, এটা যুক্তরাজ্যের অর্থনীতির জন্য খুব প্রয়োজন। এর মানে হলো, যুক্তরাজ্যের অর্থনীতি ও সামাজিক সংস্কারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এখন গুরুত্বারোপ করা সম্ভব হবে। এরপর ওই বছর গণভোটে ব্রেক্সিটের পক্ষে রায় আসার পর ট্রাস বোল পাল্টে ফেলেন। তখন নিজের অবস্থান পরিবর্তনের পক্ষে যুক্তি দিয়ে তিনি বলেন, ব্রেক্সিট বাস্তবায়ন হলে বিকৃঙ্খলা দেখা দিতে পারে বলে তিনি ধারণা করতেন, যেটি ভুল ছিল।

লিজ ট্রাসের চ্যালেঞ্জ:
জ্বালানি ও ট্যাক্স
যুক্তরাজ্যের প্রতিটি বাড়িতে বর্তমানে জ্বালানি বিল রেকর্ড ৮০ শতাংশ বেড়ে গেছে। এ খাতে যুক্ত বেশ কয়েকজন জানিয়েছেন ভর্তুকি না দিলে আগামী জানুয়ারিতে মাঝে মাঝেই ‘ব্ল্যাকআউট’ হতে পারে। তবে এ খাতে ভর্তুকি না দেয়ার কথা জানিয়েছেন ট্রাস। এর পরিবর্তে সরবরাহ বাড়াবেন বলে জানান তিনি। জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সংকটে থাকা পরিবারের পাশে দাঁড়াতে ধনীদের থেকে বাড়তি ট্যাক্স না নেয়ার কথাও জানান ট্রাস। এর পরিবর্তে তিনি কমিয়ে দিতে পারেন ট্যাক্সের পরিমাণ। ট্রাসের এ পরিকল্পনার কারণে ব্যাংকগুলো দ্রুত সুদের হার বাড়িয়ে দেবে বলে আভাস দিয়েছেন দেশটির বেশ কয়েকজন অর্থনীতিবিদ।

অভিবাসন
দেশের বাইরে থেকে আসা অভিবাসন প্রত্যাশীদের জন্য পরিকল্পনা গুছিয়ে রেখেছেন লিজ ট্রাস। এরই মধ্যে তিনি রুয়ান্ডা পরিকল্পনা বিস্তৃত করার কথা জানিয়েছেন। এতে যুক্ত করা হবে আরও কয়েকটি দেশ। সীমান্তে আরও জনবল বাড়াবেন তিনি। এছাড়া কৃষি খাতে ট্রাস নতুন কিছু স্কিম নিয়ে আসার ঘোষণা দিয়েছেন যাতে করে বিদেশিরা যুক্তরাজ্যে গিয়ে কাজ করতে আগ্রহী হন।

বৈদেশিক নীতি
শুধু দেশের অভ্যন্তরেই নয়, লিজ ট্রাস এমন সময় ব্রিটেনের হাল ধরলেন, যখন রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে সমগ্র বিশ্বেই চলছে অস্থিরতা। বরিস জনসনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে লিজ ট্রাসকে ‘বরিস জনসনই চালাচ্ছিলেন’। তবে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে, তিনি সম্ভবত ‘আক্রমণকারীদের বিরুদ্ধে আরও শক্তি প্রদর্শন করবেন’ বলেই বিশ্লেষকরা মনে করছেন। ইউক্রেন ইস্যুতে তিনি রাশিয়ার কড়া সমালোচক হিসেবে পরিচিত।
নিজ দলকে ঐক্যবদ্ধ করা
ট্রাসের আগের তিন টরি নেতাই তাঁদের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই পদত্যাগ করেন কিংবা সরে যেতে বাধ্য হন। এটা চলমান একটি সমস্যায় পরিণত হয়েছে। এটা এমন একটি সমস্যা, যা অন্য নেতাদের চেয়ে ট্রাসকে কনজারভেটিভ দলে আরও কঠিনভাবে মোকাবিলা করতে হবে।