মুহম্মদ শামসুল হক, নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র:
মুখে রূপোর চামুচ নিয়ে জন্ম নিয়েছিলেন কি-না তা বিশ্ববাসীর অজানা হলেও বিড়ালের কপালে শিকা ছেঁড়ার মত নেহায়েত বরাত গুণে যুক্তরাষ্ট্রের ৮ প্রেসিডেন্ট সৌভাগ্যবানদের মধ্যে রয়েছেন:
১) জন টাইলর: নির্বাচিত নবম প্রেসিডেন্ট হিসেবে মাত্র ৩০ দিন দায়িত্ব পালনের পর ১৮৪১ সালের ৪ এপ্রিল উইলিয়াম হেনরী হ্যারিসন অকস্মাৎ মৃত্যুবরণ করায় ভাইস-প্রেসিডেন্ট জন টাইলর যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সর্বপ্রথম ৫১ বছর বয়সে দশম প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ গ্রহণ করেছিলেন। টাইলর ১৮৪১-১৮৪৫ কার্যকালে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেন। হুইগস পার্টী তাকে বহিষ্কার করায় আমেরিকার ইতিহাসে তাকে সর্বপ্রথম অভিসংশনের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। ১৮৬২ সালের ১৮ জানুয়ারি তিনি পরলোক গমণ করেন।
২) মিলার্ড ফিলমোর: ১৮৫০ সালের ৯ জুলাই নির্বাচিত দ্বাদশ প্রেসিডেন্ট জাচারি টেয়লর মৃত্যুবরণ করায় নিউইয়র্কের সামারহিলে ১৮০০ খ্রিস্টাব্দের ৭ জানুয়ারি জন্মগ্রহণকারী মিলার্ড ফিলমোর ৫০ বছর বয়সে আমেরিকার ত্রয়োদশ প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। প্রথিতযশা শিক্ষক ও বরেণ্য আইনজীবী মিলার্ড ইউনিটেরিয়ান ধর্মাবলম্বী এবং হুইগ অ্যাফিলেটেড ছিলেন। অ্যাম লুইস ফিলিপ ছদ্মনামে সমধিক খ্যাত ১৮৫০-১৮৫৩ কার্যকালের জন্য প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ গ্রহণকারী মিলার্ডের মধ্য দিয়ে ডেমক্র্যাটিক কিংবা রিপাবলিকান দল বহির্ভূত প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার প্রথার ইতি ঘটে। শপথ গ্রহণের অব্যবহিত পরপরই তিনি পুরো ক্যাবিনেট বাতিল করেন এবং হেনরী ক্লে সম্পাদিত ১৮৫০ সালের আপোষরফার পক্ষাবলম্বন করে অবধারিত গৃহযুদ্ধ বিলম্বিত করেছিলেন। সিনেটে পাশ হওয়া ১. অ্যাডমিট ক্যালিফোর্নিয়া অ্যাজ এ ফ্রী স্টেট (ক্যালিফোর্নিয়াকে স্বাধীন স্টেট হিসেবে স্বীকৃতি দান); ২. সেটেল দ্য টেক্সাস বাউন্ডারী অ্যান্ড কমপেনসেট হার (টেক্সাস সীমানা নির্ধারণ ও ক্ষতিপূরণ প্রদান); ৩. প্লেস ফেডারেল অফিসারস অ্যাট দ্য ডিসপোজাল অব স্লেভারীহোল্ডারস সীকিং ফিউগেটিভ (দাসপ্রভুদের আনীত আত্মগোপনকারী দাসদের খুঁজে বের করার অভিযোগের ফায়সালায় ফেডারেল কর্মকর্তা নিয়োগ) এবং ৪. অ্যাবলিশ স্লেভ ট্রেড ইন দ্য ডিস্ট্রিক্ট অব কলম্বিয়া (কলম্বিয়াতে দাস ব্যবসা বাতিল) প্রস্তাবে স্বাক্ষরদান পূর্বক এগুলোকে আইনে পরিণত করেন। ১৮৭৪ সালের ৮ মার্চ তার জীবনাবসান হয়।
৩: এন্ড্রু জনসন: গৃহযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী গণতন্ত্রের প্রবক্তা ষোড়শ প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিঙ্কন ১৮৬৫ সালের ১৫ এপ্রিল ৫২ বছর বয়সে আততায়ীর গুলিতে প্রাণ হারানোর পর ভাইস প্রেসিডেন্ট এন্ড্রু জনসন ৫৬ বছর বয়সে সপ্তদশ প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। দায়িত্ব গ্রহণের পরপর সাবেক ক্রীতদাসদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা না করেই জনসন বিচ্ছিন্ন স্টেটগুলোকে ইউনিয়নের আওতায় আনয়ন করেন। ফলে রিপাবলিকান নিয়ন্ত্রিত হাউজ ১৮৮৬ সালে তার বিরুদ্ধে অভিসংশন প্রস্তাব পাশ করেন। তবে মাত্র ১ ভোটে সিনেট তাকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেয়। জনসন নিজস্ব প্রেসিডেন্সিয়াল রিকন্সট্রাকশন কার্যকর করেছিলেন এবং ক্রীতদাসদের নাগরিকত্ব প্রদানকারী চতুর্দশ সংশোধনীর বিরোধিতা করেছিলেন। ছদ্মনামবিহীন ইউনিয়নিস্ট অ্যাফিলিয়েটেড ডেমক্র্যাট জনসন ১৮৬৫-১৮৬৯ কার্যকালে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেন এবং ১৮৭৫ সালের ৩১ জুলাই জনসন মারা যান।
৪) চেস্টার এলান আর্থার: আমেরিকার বিংশ ভাইস প্রেসিডেন্ট চেস্টার এলান আর্থার আপস্টেট নিউইয়র্ক ফেয়ারফিল্ডে জন্মগ্রহণ করেন। ১৮৮১ সালে যুক্তরাষ্ট্রে বিংশ প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ গ্রহণ করেছিলেন আবরার গারফিল্ড। শপথ গ্রহণের ৪ মাসের মাথায় জনৈক গুপ্তঘাতকের গুলিতে গারফিল্ড মারাত্মকভাবে আহত হন। দীর্ঘ ১১ সপ্তাহ মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে গারফিল্ড ১৯ সেপ্টেম্বর শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করার পর দ্য জেন্টেলম্যান বস ছদ্মনামে সারা বিশ্বে পরিচিত ভাইসপ্রেসিডেন্ট আর্থার একবিংশ প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। প্রথিতযশা আইনজীবী এবং দূরদৃষ্টিসম্পন্ন রাষ্ট্রনায়ক আর্থার দ্য পেন্ডেলটন সিভিল সার্ভিস রিফরম অ্যাক্ট কার্যকর করেছিলেন এবং ১৮৮২ চাইজিন এক্সক্লুসান অ্যাক্টের প্রথম ভার্সনের পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন। এলান আর্থার এপিসকোপালিয়ান ধর্মবিশ্বাসী এবং রিপাবলিকান অ্যাফিলেটেড ছিলেন। ১৮৮৬ সালের ১৮ নভেম্বর তার মহাপ্রয়াণ ঘটে।
৫) থিয়োডোর রুজভেল্ট: নিউইয়র্ক সিটিতে জন্মগ্রহণকারী থিয়োডোর রুজভেল্ট ১৮৯৯-১৯০০ সাল পর্যন্ত নিউইয়র্কের ৩৩তম গভর্নর এবং ১৯০১ সালের মার্চ থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের ভাইসপ্রেসিডেন্ট ছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চবিংশ প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম ম্যাককিনলী ১৯০১ সালের সেপ্টেম্বরে গুপ্তঘাতকের হাতে খুন হওয়ার পর তার টিআর. ট্রাস্ট বাস্টার ছদ্মনামে বিশ্বপরিচিত রুজভেল্ট ৪২ বছর বয়সে আমেরিকার ষষ্ঠবিংশ প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। রিপাবলিকান দলীয় সৃজনশীল ও দূরদর্শী নেতা রুজভেল্ট ১৯০৪ সালের নির্বাচনে ষষ্ঠবিংশ প্রেসিডেন্ট হিসেবে পূর্ণ মেয়াদের জন্য নির্বাচিত হন এবং ১৯০১ সাল থেকে ১৯০৯ সাল পর্যন্ত প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেন। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে অদ্যাবধি সর্বকনিষ্ঠ প্রেসিডেন্ট হিসেবে স্বীকৃত রুজভেল্ট ডাচ রিফরমড ধর্মাবলম্বী ও প্রথিতযশা আইনজীবী হিসেবে সর্বমহলে ব্যাপক পরিচিত ছিলেন। রাশিয়া-জাপান যুদ্ধের অবসানে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালনের স্বীকৃতি স্বরূপ ১৯০৬ সালে তাকে নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয়। ১৯১৯ সালের ৬ জানুয়ারি তার জীবনলীলার ইতি ঘটে।
৬) ক্যালভিন কুলিজ: ১৯২৩ সালের ২ আগস্ট ২৯তম প্রেসিডেন্ট ওয়ারেন হার্ডিং ৫৫ বছর বয়সে অকস্মাৎ মৃত্যুবরণ করলে ভারমন্টের প্লাইমাউথে জন্মগ্রহণকারী ক্যালভিন কুলিজ ৫১ বছর বয়সে ৩০তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। উদ্ভাবনী শক্তির অধীশ্বর রিপাবলিকান দলীয় ক্যালভিন কুলিজ ব্যক্তিগত দূরদর্শিতার সুবাদে ১৯২৪ সালের নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রের ৩০তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। স্মল-গভর্নমেন্ট কনজারভেটিভ হিসেবে সুখ্যাতি অর্জনকারী ক্যালভিন পূর্ববর্তী প্রেসিডেন্টদের অনাচারের দায়ভার থেকে হোয়াইট হাউজকে মুক্তি দেন এবং হোয়াইট হাউজের প্রতি সর্বসাধারণের আস্থা ফিরিয়ে আনেন। কংগ্রেশনালিস্ট ধর্মাবলম্বী সাইলেন্ট ক্যাল ছদ্মনামে পরিচিত ক্যালভিন কুলিজ দ্য ইন্ডিয়ান সিটিজেনশিপ অ্যাক্ট অব ১৯২৪-এ স্বাক্ষরদানের মাধ্যমে একে আইনে পরিণত করেন। ফলে লাখ লাখ লোক আমেরিকার নাগরিকত্ব লাভের সুযোগ পায়। তার কার্যকালে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির প্রাচুর্য সৃষ্টি হওয়ায় একে রোরিং টুয়েন্টিজ নামে অভিহিত করা হয়। ১৯৩৩ সালের ৫ জুন ক্যালভিন কুলিজ মারা যান।
৭) হেরী ট্রুম্যান: আমেরিকার ৩২ তম প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্ট প্রেসিডেন্ট হিসেবে শেষ মেয়াদের কার্যকালের মাত্র ৩ মাসের মাথায় ৫১ বছর ১৯৪৫ সালের ১২ এপ্রিল অকস্মাৎ পরলোক গমণ করায় ভাইসপ্রেসিডেন্ট হেরী ট্রুম্যান তার স্থলাভিষিক্ত হন এবং বিশেষ ও পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনে ১৯৪৫ থেকে ১৯৫৩ সালের জন্য ৬০ বছর বয়সে যুক্তরাষ্ট্রের ৩৩তম প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেন। ট্রুম্যান সর্বপ্রথম এবং একমাত্র প্রেসিডেন্ট হিসেবে যুদ্ধে পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যবহারের অনুমতি দিয়ে সারা জগতে আলোচনার ঝড় তুলেছিলেন। গিভ এম হেল হেরী ছদ্মনামে পরিচিত ডেমক্র্যাট হেরী ট্রুম্যান নিজস্ব ট্রুম্যান ডক্ট্রাইন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টে বিশেষ ভূমিকা এবং বার্লিন এয়ারলিফট ও কোরিয়ার যুদ্ধে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য আমেরিকানদের বিশেষ শ্রদ্ধা অর্জন করেছিলেন। ১৯৭২ সালের ২৬ ডিসেম্বর হেরী ট্রুম্যানের ভবলীলা সাঙ্গ হয়।
৮) লিন্ডন বেইনস জনসন: টেক্সাসের নিকটবর্তী স্টোনওয়ালে ১৯০৮ সালের ২৭ আগস্ট জন্মগ্রহণকারী লিন্ড বেইনস জনসন ১৯৬০ সালের নির্বাচনে জন ফিটজগারলড কেনেডির রানিংমেট হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস-প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। আমেরিকার ৩৫তম প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি ৪৩ বছর বয়সে ১৯৬৩ সালের ২২ নভেম্বর গুপ্ত ঘাতকের গুলিতে প্রাণ হারালে প্রেসিডেন্ট কেনেডির কার্যকালের বাদবাকি মেয়াদের জন্য লিন্ডন টু বিল্ড গ্রেট সোসাইটি ফর দ্য আমেরিকান পিপল ভিশন (আমেরিকার জনগণের জন্য উন্নততর সমাজ নির্মাণের দৃষ্টিভঙ্গিকে) সামনে রেখে প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। ১৯৬৪ সালে অনুষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ৫৬ বছর বয়সী লিন্ডন জয়ী হন এবং ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত ৩৬তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে নৈপুণ্যের সাথে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেন। স্বদেশে ও বহির্বিশ্বে এলবিজে ছদ্মনামে পরিচিত বেইনস জনসন ডিসিপলস অব খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বী এবং ডেমক্র্যাটিক রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। লিন্ডন হায়ার এডুকেশন অ্যাক্ট অব ১৯৮৫ কার্যকর; ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ন্যাশানালিটি অ্যাক্টে স্বাক্ষরদান, সিভিল রাইটস অ্যাক্ট অব ১৯৬৪ এবং ভোটিং রাইট অ্যাক্টস অব ১৯৬৫ ইত্যাদি কর্মকান্ডের জন্য সর্বমহলের ব্যাপক আস্থা অর্জন করেন। তার কার্যকালে চন্দ্র এবং মহাশূন্য অভিযানে আমেরিকা বহু দূর এগিয়ে যায়। ১৯৭৩ সালের ২২ জানুয়ারি তার বর্ণাঢ্য জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে।