খাজা মঈন উদ্দীন, রিয়াদ, সৌদিআরব: স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশ থেকে মানুষ কাজের সন্ধানে পৃথিবীর নানা দেশে পাড়ি জমাতে শুরু করে। ছোট বেলায় শুনতাম, পাশ্ববর্তী কোন বাড়িতে কোন প্রবাসী আসলে বলতো দুবাইওয়ালা এসেছেন। তাকে দেখার হিড়িক পড়ে যেতো। তিনি কোন দেশে থাকেন তা দেখার বিষয় নয়, প্রবাসে থাকলেই দুবাইওয়ালা বলে প্রসিদ্ধি লাভ করতেন। সে সময় বিদেশ যাওয়াটা বেশ কঠিন ও কষ্টসাধ্য ছিলো যা এখন দুধভাত। এক সময় বাংলাদেশের মানুষ যেতেন রেঙ্গুন। পরবর্তীতে পাকিস্তানের করাচি সহ বিভিন্ন পাশ্ববর্তী দেশে আকাশ পথে বা পায়ে হেঁটে অনেকে পাড়ি জমিয়েছেন। স্বাধীনতা পরবর্তী পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে আমাদের দূতাবাসের সংখ্যা যত বৃদ্ধি পায় তত সেতুবন্ধন তৈরি হয় এবং বিদেশ যাত্রায় অনেক দেশের নাম যোগ হতে থাকে। তবে বিদেশগামীরা মূলত শ্রমিক হিসাবে, খেজুরগাছ পরিস্কার, উটের রাখাল, রাস্তায় ক্লিনার, নির্মাণ শ্রমিক বা এ জাতীয় কর্ম করতো যে কারণে আরবের লোকেরা ভাবতেন বাঙ্গালী ক্লিনারের কাজ বা ডাস্টবিন পরিস্কার ছাড়া কিছুই করতে পারে না। বর্তমানে শিক্ষিতের হার যেমন পাল্লা দিয়ে বাড়ছে তেমনি প্রবাসে বিভিন্ন অফিসিয়াল পর্যায়ে কর্ম করার সুযোগ বাড়ছে।
আমার লিখনীর মূল উদ্যেশ্য হলো বিশেষ করে আরব দেশগুলো নিয়ে। এককালে তারা ছিলো তেল নির্ভর, যার আয় দিয়ে তারা চলতো ও আরাম আয়েশী জিন্দেগী তাদের খুব পছন্দ ছিলো। বর্তমানে আরব দেশগুলোর সরকার আর তেল নির্ভর হয়ে থাকতে রাজী নন। বসিয়ে দিয়েছেন কর, তাও আবার ১০% থেকে ১৫%। বিদেশী শ্রমিক রাখলে প্রতি মাসে সৌদিতে প্রতি শ্রমিক বাবদ দিতে হবে ৯৫০ (লেবার অফিস+জাওয়াযাত+ইন্স্যুরেন্স) রিয়াল প্রায়। বিভিন্ন সেক্টরে সৌদি রাখা বাধ্যতামূলক করে দেয়া হয়েছে এবং তাদের মাসিক বেতনও কমপক্ষে ৪,০০০ রিয়াল নির্ধারিত করে দেয়া হয়েছে। এভাবে অন্যান্য আরব দেশও তেল নির্ভরতা কমিয়ে জনগণকে জনশক্তিতে পরিণত করার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন। এসব কারণে ধীরে ধীরে সৌদি আরব সহ অন্যান্য আরব দেশসমূহে প্রবাসীদের চাহিদা কমতে শুরু করেছে। ২০২০ সালে যেখানে সৌদিজেশন বা সৌদিকরণ এর পার্সেন্টেজ ছিলো ২০.৩৭ শতাংশ সেখানে ২০২১ সালের প্রথম চার মাসে হয়েছে ২২.৭৫ শতাংশ। বর্তমানে গাল্ফ দেশগুলোতে কর্ম সবচাইতে বিদেশী নির্ভর যার পার্সেন্টেজ হলো ৭৭ শতাংশ, আর সবচাইতে বেশী হলো কাতার যার পার্সেন্টেজ ৯৪ শতাংশ। ফাইন্যান্সিয়াল (ব্যাংকিং) ও ইন্স্যুরেন্স সেক্টর ৮৩.৬ শতাংশ পর্যন্ত সৌদিজেশন করা হয়েছে। এমনিতে বিদেশীরা দোকানের মালিক হওয়ার নিয়ম এদেশে নেই। তবে কেউ কেউ নিজ স্পন্সর সৌদির নামে দোকান নিয়ে নিজে ব্যবসা করতেন যা সৌদি আইনে অবৈধ ছিলো। বর্তমানে গুটি কয়েক দ্রব্যাদি ছাড়া বাকী সব দোকানদারীতে সৌদি রাখা বাধ্যতামূলক করে দেয়া হয়েছে। যারা অমান্য করবে তাদের গ্রেফতার করে স্থায়ী নো-এন্ট্রি দিয়ে দেশে পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে।
আমার মূল প্রতিপাদ্য হলো- বাস্তবতার নিরিখে ঘুমিয়ে না থেকে নিজ দেশে আমাদের কর্মমুখী হওয়া চাই। দিন দিন বিদেশ নামক সোনার হরিণ সংকুচিত হয়ে আসছে। শিক্ষিতের হার বাড়ার সাথে সাথে নিজেদের দেশে নিজেদেরকে কর্মমূখী হওয়া চাই। পরিবারের কর্মক্ষমদের সম্ভবপর কর্মে মনোযোগ দেয়া দরকার। নারীরা ঘরে বসেও সংসারের দৈনন্দিন দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ক্ষুদ্র শিল্প, কুটির শিল্পের কাজে মনোনিবেশ করতে পারেন। তা না করলেও অন্ততপক্ষে সেলাই কাজ করে নিজের পরিবারের প্রয়োজন মেটাতে পারেন। শিক্ষিত বেকারগণ উদ্যোক্তা হতে পারেন যা স্বল্প পূঁজিতে করা সম্ভব। সরকারের উচিৎ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করা।
বর্তমান উন্নত দেশের কিছু দেশ কৃষিখাতে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিশাল সফলতা অর্জন করতে পারে। প্রবাস নির্ভর হওয়ায় আমাদের কিছু কৃষি জমিগুলো সারা বছর খালি পড়ে থাকে, যেখানে দুই মৌসুম ধান এক মৌসুম শস্য ফলতো সেটা এখন পরিবারে অভাব না থাকার কারণে খালি পড়ে থাকে। বাংলাদেশের অনেক অঞ্চলে পাহাড় আছে। বৈদ্যুতিক সুবিধা ও যাতায়াতের সুব্যবস্থা নাই, সে কারণে উদ্যেক্তাগণ কিছু করার থাকলেও সাহস পান না। সরকারের উচিৎ দেশের সম্পদের সুব্যবহার নিশ্চিতের নিমিত্তে এসব স্থানে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা। তুরস্ক, নেপাল, শ্রীলঙ্কা সহ পাহাড় ঘেরা প্রায় দেশ টিলা ভিত্তিক চাষাবাদ সহ বিভিন্ন ফার্মিং এর মাধ্যমে দেশের উন্নয়নে ভূমিকার রাখছে।
বিদেশে কর্মী পাঠানো একেবারে বন্ধ হবে তা নয়, কিন্তু ওয়েজের হার দিন দিন কমে যাচ্ছে। সহজে বিদেশে আসা সম্ভব হচ্ছে বিধায় অনেকে অল্পতে লিখাপড়া ছেড়ে দেয়। ভাবে, লেখাপড়া যাই হোক বিদেশে গেলে তো টাকা ইনকাম হবে। হ্যাঁ যদি মান সম্মত বিদ্যার্জন করে প্রবাসে আসে তাহলে সে মানসম্মত কাজে নিয়োগপ্রাপ্ত হতে পারে। বিদেশ যে কত জিল্লতির জীবন তা আসার পর টের পায়। অন্যদিকে বাড়ির অন্যান্য পুরুষরা কর্মে অলস হয়ে যায়। কারণ মাস শেষে এক গোছা টাকা বিদেশী মজদুর তাদের জন্য পাঠায়। এমন মানসিকতা তৈরী হওয়ায় প্রবাসী ব্যক্তিটির ভবিষ্যত পুঁজি বলতে কিছু থাকে না। দিন শেষে কর্মক্ষমতা হারিয়ে তাকে নিঃস্ব হয়ে বাড়ি ফিরতে হয়। পরিবারের স্ট্যাটাস তৈরী হওয়ার কারণে পরিবারের অন্য সদস্য তার অতীতের সব কষ্টের ফল ভুলে মানসিক টর্চার শুরু করে, ফলে সে মানিসকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে এবং খুব সহসা মত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। এমতাবস্থায় প্রবাস নির্ভরতা কমিয়ে আত্মনির্ভরতা বাড়ানো উচিত।