তানিজা খানম জেরিন, নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র থেকে: চারশো বছরের ঐতিহ্যবাহী থ্যাংকসগিভিং ডে পার্টি অদৃশ্য শত্রু করোনা ভাইরাসের কারণে এবার শুধু মাত্র নিজ ঘরে উৎসব পালনের জন্য সমগ্র আমেরিকায় স্বাস্থ্য বিভাগ কর্তৃক বিশেষ ফরমান জারি করা হয়েছে। নট নড়নচড়ন অর্থাৎ থ্যাংকসগিভিং ডে উপলক্ষে বড় কোন পার্টির আয়োজন করা যাবেনা; কারো বাসায় দাওয়াতে যাওয়া যাবেনা এবং নিজ বাসায় কাউকে টার্কি খাওয়ার জন্য নিমন্ত্রণও করা যাবেনা। সবচেয়ে কঠিন নিয়মের বেড়াজালে সমগ্র আমেরিকানবাসী এবার কোথাও ভ্রমণ করতে পারবেনা অথচ থ্যাংকসগিভিং ডে উপলক্ষে আমেরিকায় সবচেয়ে বেশী মানুষ ভ্রমণ করে থাকে। শেঁকড়ের সন্ধানে দূর-দূরান্ত থেকে পরিবারের সাথে দিনটি উদযাপনের জন্য সবাই ব্যাকুল থাকেন।
নভেম্বরের চতুর্থ বৃহস্পতিবার থ্যাংকসগিভিং ডে হওয়াতে এবং পরদিন ব্ল্যাক ফ্রাইডে ও উইকেন্ডসহ মোট চারদিন অফিস-আদালত স্কুল-কলেজ বন্ধ থাকাতে মহাসাড়ম্বরে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে আমেরিকায় বসবাসকারী প্রতিটি মানুষ এই দিনটি পালন করে থাকে। এদেশের মাটিতে ফসল ফলানো, বসবাস ও জীবনযাপন এবং কর্মসংস্থানের জন্য কৃতজ্ঞচিত্তে সকল মানুষই এই দিনে সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। বিধর্মী বা নাস্তিকরাও এদিবসটি পালন করে থাকে এবং প্রকৃতিকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে থাকে। আমরা যারা করোনা সঙ্কটের পরও বেঁচে আছি তারাও এবারের থ্যাংকসগিভিং ডে তে মহান সৃষ্টিকর্তাকে টার্কি খাই বা না খাই বেঁচে থাকার তাগিদে কোটি কোটি প্রণতিসহ ধন্যবাদ জানাবো।

চারশো বছর আগে ১৬২১ সালে আমেরিকার মাটিতে প্রথম ফসল তোলা উপলক্ষে প্রার্থনা ও ভোজের প্লিমিথ অভিযাত্রীরা যে আয়োজন করেছিলেন তারই ধারাবাহিকতায় প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াশিংটন ১৭৮৯ সালে ২৯শে নভেম্বর প্রথম জাতীয় পর্যায়ে থ্যাংকসগিভিং ডে কে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেন। পরবর্তীতে ১৮৬৩ সালে প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন থ্যাংকসগিভিং ডে কে বার্ষিক ছুটির দিন হিসেবে ঘোষণা করেন। নভেম্বর মাসের চতুর্থ বৃহস্পতিবার থ্যাংকসগিভিং ডে পালনের চূড়ান্তভাবে কংগ্রেসে অনুমোদন পায় ১৯৪১ সালে। সেই অনুযায়ী সমগ্র আমেরিকায় প্রতি বছরই নভেম্বরের চতুর্থ বৃহস্পতিবার সাড়ম্বরে থ্যাংকসগিভিং ডে বা দ্যা টার্কি ডে দিবস পালিত হয়ে আসছে। যদিও কানাডাতে অক্টোবর মাসের দ্বিতীয় সোমবার থ্যাংকসগিভিং ডে উদযাপিত হয়।
উল্লেখ্য, শীতের আগমণ ও শীতবস্ত্র কেনা-কাটা শুরু হয়ে যায়, থ্যাংকসগিভিং ডে বা পরদিন ব্ল্যাক ফ্রাইডের ঐতিহাসিক মূল্যহ্রাসের সুযোগে মানুষের প্রয়োজনীয় সামগ্রীসহ শীতের জামা কাপড় কেনা ও উপহার আদান প্রদানের হিড়িক পড়ে যায়। থ্যাংকসগিভিং ডে পালনে ঐতিহাসিকদের মধ্যে সামান্য মতবিরোধ থাকলেও প্লিমিথ অভিযাত্রীরাই আমেরিকার মাটিতে নতুন ফসল ফলানোর পর সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ জানানোর জন্য প্রথম থ্যাংকসগিভিং ডে পালন করে থাকেন এবং সর্বজন স্বীকৃত যে- প্লিমিথ অভিযাত্রীরাই এই দিনটির প্রথিকৃত। যদিও ১৫৬৫ সালে ফ্লোরিডাতে প্রথম ফসল তোলা বা নবান্ন উৎসবের আয়োজন হয়েছিল বলে জানা যায় তবে সে উৎসবে টার্কি রোস্ট হয়েছিল কি না নিশ্চিত জানা যায়নি।
টার্কি খাওয়া বা থ্যাংকসগিভিং ডে পালনের অনুষ্ঠান দেশে থাকতে আমরা কোন দিনও পালন করিনি টার্কি সদৃশ্য কালো বনমোরগ আমাদের দেশেও পাওয়া যায় কিন্তু সাধারণ মোরগ সাদৃশ্য টার্কি আমাদের দেশে নেই। পঁচিশ বছর আগে থ্যাংকসগিভিং ডে পালনের টার্কি খাওয়ার কথা আজো ভুলতে পারিনা এতো টার্কি দিবস না মনে হয়ছিল এক বিশাল ভোজের মহা-আয়োজন। পরবর্তীতে পরিচিত কয়েকটি ফ্যামেলির উদ্যোগে পর পর কয়েকজনের বাসায় থ্যাংকসগিভিং ডে পালনের উৎসব আয়োজন করি কিন্তু থ্যাংকসগিভিং ডের উৎসবটি রূপ নেয় একটি মিলনমেলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে; বাধ্য হয়ে একদশক ধরে শতাধিক লোকের উপস্থিতিতে নিউইয়র্কের বড় বড় রেস্টুরেন্ট
ও হল রুমগুলিতে উদযাপন করি। আমাদের থ্যাংকসগিভিং ডের অনুষ্ঠানে টার্কি ভোজনের পাশাপাশি স্থানীয় শিল্পীদের নিয়ে রাতব্যাপী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশিত হয়। কিন্তু এবার করোনা সঙ্কটের কারণে অনুষ্ঠানের কোন অতিরিক্ত ঝামেলা নেই। আজ থ্যাংকসগিভিং ডে ২৬ নভেম্বর ২০২০, বৃহস্পতিবার ঘরেই ছোট আকারের টার্কি পার্টি করবো টার্কি পার্টির মেইন ডিশ হিসেবে সাথে অবশ্যই থাকবে ম্যাসপটেটো, ক্যানবেরী সস ও পাম্পকিন পাই এবং সাথে আরো পিঠা, পায়েস ও বাঙালীয়ানার হরেক রকমের মুখরোচক খাবার। ১৮১৭ সালে নিউইয়র্কে সর্বপ্রথম থ্যাংকসগিভিং ডে আনুষ্ঠানিকভাবে পালনের সরকারি স্বীকৃতি পায় এবং ১৯২৪ সালে ম্যাসির উদ্যোগে নিউইয়র্কে সর্বপ্রথম ছয়মাইল ব্যাপী প্যারেড অনুষ্ঠিত হয়। এবার করোনা সঙ্কটের কারণে দৃষ্টিনন্দিত প্যারেডটি অনুষ্ঠিত হবেনা।
উল্লেখ্য, ডেট্রয়েট অঙ্গরাজ্যে আর্ট ভ্যানের আয়োজনে চুরানব্বইতম বার্ষিক থ্যাংকসগিভিং ডে প্যারেড করোনা সংক্রমণের কারণে বাতিল করা হয়েছে। এবার করোনা সঙ্কটের কারণে ব্ল্যাক ফ্রাইডের বেচা-কেনাও তেমন হওয়ার লক্ষণ নেই। ব্ল্যাক ফ্রাইডের কেনা-বেচা আমেরিকার অর্থনীতিতে প্রতিবছরই চাঙ্গা ভাব এনে দেয়। কনকনে শীতের মধ্যে অর্ধরাত ঠাঁই দাড়িয়ে থেকে জীবনে কয়েকবারই ব্ল্যাক ফ্রাইডের শপিং করেছি এবং প্রতিবারই অসুস্থ্য হয়েছি করোনাকালে এবার আর শপিংয়ে যাওয়ারতো প্রশ্নই উঠেনা।
ল্যান্ড অব ইমিগ্রান্ট দেশ হিসেবে আমেরিকাই সর্ব প্রথম দেশের তালিকায়। অভিযাত্রী বা ইমিগ্র্যান্ট হিসেবে যারাই এদেশে আগত সবাইকে অনেক প্রতিকূল অবস্থার সন্মুখীন হতে হয়; তারপরও বাকস্বাধীনতা, কর্মসংস্থান, উচ্চশিক্ষা, সুচিকিৎসা, ধর্মপালনের স্বাধীনতা সর্বোপরি নারীদের স্বাধীনভাবে চলাফেরা এবং চাকুরীর সুযোগ থাকাতেই ল্যান্ড অব ইমিগ্রান্ট খ্যাত আমেরিকাই বিশ্বের সব প্রান্ত থেকে মানুষ আমেরিকায় আসছেন এবং এদেশকে আপন করে নিচ্ছেন এবং ধীরে ধীরে সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক বলয়ে প্রবেশ করে সবাই থ্যাংকসগিভিং ডে উদযাপনে শরীক হচ্ছে।
আমার মতে শুধু আমেরিকা বা কানাডাতেই থ্যাংকসগিভিং ডে উৎসব পালিত না হয়ে পৃথিবীর সকল দেশেই পালিত হতে পারে। সৃষ্টিকর্তাকেতো প্রতিনিয়তই ধন্যবাদ জানানো যায় এই সুন্দর পৃথিবী সৃষ্টির জন্য, ধন্যবাদ দেওয়া উচিত নানা ধন-সম্পদে ভরপুর বিশ্বে আমাদেরকে সৃষ্টি করার জন্য এবং বেঁচে থাকার জন্য। বর্তমানে সমগ্র বিশ্ববাসী আছি এক অদৃশ্য অণুজীবের সংক্রমণের আতঙ্কে, বিশ্বের অনেক দেশেই গোলার আঘাতে নিহত হচ্ছে নারী, পুরুষ ও শিশু। একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক বিশ্বেও মানুষ হয়ে উঠেছে স্বার্থপর, নিষ্ঠুর ও অমানবিক। আশ্রয়হীন, সম্বলহীন, অসহায় মানুষ খাদ্য, বাসস্থান, কর্মসংস্থান ও নিরাপত্তার আশায় ঘুরছে নিজ দেশ থেকে অন্যদেশে। থ্যাংকসগিভিং ডের মূল উদ্দেশ্য পরিবার, প্রতিবেশী, বন্ধু বান্ধবসহ সবাই একত্রিত হয়ে সবার জীবনে প্রতিটি সাফল্যের জন্য দেশ ও জাতির সাফল্যের জন্য সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ জানানো। থ্যাংকসগিভিং ডে শুধুমাত্র প্রতিকী দিবস হিসেবে পালিত না হয়ে আক্ষরিক অর্থে পারস্পরিক বন্ধুত্ব কাজের স্বীকৃতি সহযোগিতা, সহমর্মিতা ও উদারতায় পরিপূর্ণ হোক। বন্ধ হোক যুদ্ধ বিগ্রহ হানাহানি, মারামারি, লাঞ্ছনা ও বঞ্চনার ইতিহাস।
বিশ্বব্যাপী সুদৃঢ় হোক বন্ধুত্বের-ভ্রাতৃত্বের অটুট বন্ধন। শান্তি চাই এই পৃথিবীতে- শান্তি আসুক সবক্ষেত্রে, সুন্দর ও কল্যাণের জন্য সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ জানাতে চাই। জাতিগত, ধর্মগত, বর্ণগত, সর্ববিদ্বেষ ও ভেদাভেদ ভুলে সবাইকে ভালোবাসতে প্রশংসা করতে ও যত বেশী ধন্যবাদ জানাতে পারবো ততই আগামী পৃথিবী শান্তিময় হবে। আমাদের আগামী প্রজন্ম করোনামুক্ত বিশ্বে শান্তিতে বসবাস করুক সেই উদ্দেশ্যে সৃষ্টিকর্তাকে অগ্রিম অজস্র ধন্যবাদ। সবাইকে হ্যাপী থ্যাংকসগিভিং ডে।