শহীদ রাজু
আধুনিক বাংলা গানের অন্যতম জনপ্রিয় সঙ্গীতশিল্পী বাদশা বুলবুল। আধুনিক গানের পাশাপাশি তিনি ফোক গানে যথেষ্ট জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন। বেড়ে উঠেছেন সংস্কৃতিমনা পরিবার থেকে। তার মা ছিলেন প্রখ্যাত লালনগীতি, পল্লীগীতি, ভাওয়াইয়া ও মুর্শীদি গানের জন্য বিখ্যাত। মা থেকেই গানের হাতেখড়ি পেয়েছেন। গানের জন্য জাতীয় শিশু পুরস্কারসহ অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন বাদশা বুলবুল। সম্প্রতি এক বিকেলে পাক্ষিক প্রবাস মেলা অফিসে এসেছিলেন বাংলা সঙ্গীতের জনপ্রিয় এ সঙ্গীতশিল্পী। কথা বলেছেন কিভাবে গানে এসেছেন। বর্তমান সময়ের নানান বিষয় নিয়ে মুখোমুখি হয়েছিলেন প্রবাস মেলা’র নির্বাহী সম্পাদকের সাথে। আলাপচারিতার চুম্বক অংশ পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হল।
খুব ছোটবেলাতেই গান গাওয়া শুরু করেন বাদশা বুলবুল। কখন কিভাবে গান গাওয়া শুরু করলেন এমন প্রশ্নের জবাবে বাদশা বুলবুল বলেন, আমার মা মনোয়ারা বেগম গান গাইতেন। তিনি লোকসঙ্গীত করতেন। তিনি যখন গান গাইতেন তখন আমি শুনতাম এবং গুন গুন করে গাইতাম। তখন আমার বয়স ৫ কিংবা ৬ বছর হবে। একদিন আমার মা বলেলন বুলবুল তুমি দূর থেকে গুন গুন করে কেনো গাইছো- আসো, হারমোনিয়ামটা নিয়ে এসো। মা তখন আমাকে সা রে গা মা পা শুদ্ধ করে গাইতে শিখিয়ে দিলেন।

তিনি বলেন, সে সময় প্রতি বৃহস্পতিবারে আমাদের বাসায় গানের জলসা বসতো। রাজশাহী, কুষ্টিয়া পাবনার বিভিন্ন অঞ্চলের বাউলশিল্পী, লোকশিল্পীরা সে অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতেন। আমার মায়ের ওস্তাদ দেলোয়ার হোসেন তখন সবাইকে গান শিখাতেন।
বাদশা বুলবুল বলেন, আমার মা ১৯৬২ সালে রাজশাহী বেতারে প্রথম নারী শিল্পী হিসেবে লালনসঙ্গীত পরিবেশন করেছিলেন। তিনি দীর্ঘদিন নিয়মিত বাংলাদেশ বেতার, বাংলাদেশ টেলিভিশনে লালনগীতি ও পল্লীগীতি পরিবেশন করেছেন। বাংলা গানের অন্যতম জনপ্রিয় সঙ্গীতশিল্পী ডলি সায়ন্তনী ও পলি সায়ন্তনী বাদশা বুলবুলের বোন।
এক প্রশ্নের জবাবে বাদশা বুলবুল বলেন, ১৯৭৩ সালে মায়ের সাথে পাবনার ইশ্বরদীতে প্রথম স্টেজ শোতে গান করেছিলাম। ১৯৭৭ সালে বিশ্ব শিশু দিবসে বিটিভিতে গান গেয়ে সান্তনা পুরস্কার পেয়েছিলাম। এরপর ১৯৭৯ এবং ৮০ সালে শিশুশিল্পী হিসেবে জাতীয় পুরস্কার অর্জন করেন বাদশা বুলবুল। ৭৯ এর জাতীয় পুরস্কার অর্জনের পর তিনি দিতি, সাবেরী আলম, মলি, জাদুশিল্পী আহসান হাবীব সহ প্রায় ১২ জন সরকারিভাবে ভারত, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান এবং নেপাল ভ্রমণে যান বলে জানান।

প্রফেশনালী ১৯৮১ সালে স্টেজ শো এর মাধ্যমে বাদশা বুলবুলের সঙ্গীত জীবন শুরু হয়। ১৯৮৮ সালে তার প্রথম অ্যালবাম মিল্টন খন্দকারের গানে ‘বুকের কাছাকাছি’ প্রকাশিত হয়। যদিও সে সময়ে দেশব্যাপি ৮৮’র বন্যার কারণে অ্যালবামটি তেমন জনপ্রিয়তা পায়নি। এরপর ১৯৯৫ সালে ‘সে যেনো চির সুখী হয়’ অ্যালবামটি প্রকাশিত হওয়ার পর ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। মূলত এই অ্যালবামের ‘সেই কৃষ্ণচূড়ার গাছ আজো মরেনি, মরেছে মনের যত আশা’ গানটির মাধ্যমেই তিনি লাইমলাইটে চলে আসেন। ২০১৭ সালে বাদশা বুলবুলের মিউজিক ভিডিও ‘চাদমুখে চাঁদনী হাসি’ প্রকাশিত হয় এটিও তুমুল জনপ্রিয়তা অর্জন করে।
এরপর থেকে তার প্রায় ১৮ টি একক অ্যালবাম, ১৫০ এর অধিক মিক্সড অ্যালবাম প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়াও তিনি অসংখ্য চলচ্চিত্রে গান করেছেন। আলাউদ্দিন আলী, শওকত আলী ইমন এর সাথে গানে কাজ করেছেন। ১০৮ টি ডিজিটাল মিডিয়ায় তার গান শুনা যায় বলে তিনি জানান।
১৯৯১ সালে বিটিভিতে তিনি শিল্পী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। এরপর থেকেই নিয়মিত বাদশা বুলবুল এককভাবে প্রোগ্রাম করছেন।
বাদশা বুলবুল অসংখ্য অ্যালবামে গান গেয়েছেন তার মধ্যে ‘সে ছিল আমার প্রিয়া’, ‘সে যেন চিরসুখী হয়’, ‘হৃদয়ের কবিতা’, ‘তবুও প্রেম আসে’, ‘ভাঙ্গা মন’, ‘যে আমায় দুঃখ দিল’, ‘অন্তরে’, ‘ভুলে যাবো আমি তোমাকে’, ‘মোহনা’, ‘ভুলতে চেয়েছিলাম’, ‘এক জনমে হইলোনা পিরীতি’, ‘একদিন সন্ধায়’, ‘পিরীতি আমার জন্য নয়’, ‘ব্যাথার শ্রাবণ’, ‘আমি আসবোই’ প্রভৃতি উল্লেখ্যযোগ্য।
বিভিন্ন দেশে স্টেজ শো করা নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে বাদশা বুলবুল বলেন, ‘আমি অনেক বছর ধরে বিভিন্ন দেশে প্রবাসী বাংলাদেশিদের আয়োজনে শোতে অংশ নিয়েছি। বিশেষ করে ওমান, দুবাই, কাতার, হংকং, জাপান, লন্ডন, ইতালি, ফ্রান্স, জার্মানি, গ্রীস, উজবেকিস্তান, আমেরিকা, কানাডা সহ অনেক দেশে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সামনে গান করেছি। তাদের সামনে গান গাইতে আমার অনেক ভালো লাগে, অনেক আনন্দ লাগে। তাদের সামনে গান গাওয়ার সময় মনে হয় নিজের বাড়িতেই গান করছি। সবাইকে অনেক আপন মনে হয়। তখন সবার যে ভালোবাসা ও আন্তরিকতা পাই তা ভাষায় প্রকাশ করার মত নয়।’

বর্তমানে প্রায় সব চ্যানেলেই গানের অনুষ্ঠান, মঞ্চ অনুষ্ঠানে তার সরব উপস্থিতি রয়েছে। ভবিষ্যত পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাইলে এই সঙ্গীতশিল্পী বলেন, আইয়ুব বাচ্চু, মিল্টন খন্দকার এবং প্রণব ঘোষের গানের রিমিক্সড করার পরিকল্পনা নিয়েছি। এছাড়া ভবিষ্যতে গান নিয়ে একটি বড় একাডেমি তৈরি করা তার জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন বলে জানান। সেজন্য কাজ শুরু করে দিয়েছেন বলেও জানান বাদশা বুলবুল।
জীবনের সেরা অর্জন কি এমন প্রশ্নের জবাবে গুণী এই শিল্পী জানান, শ্রোতাদের ভালোবাসাই আমরা জীবনের সেরা অর্জন। তাদের সমর্থন ও ভালোবাসা না থাকলে আজ আমি এই পর্যায়ে আসতে পারতাম না। সকল দর্শক-শ্রোতাদের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ।

বাংলাদেশের কিংবদন্তি অভিনেতা আব্দুর রাজ্জাক, হালের ঢালিউডের কিং খান খ্যাত শাকিব খান সহ অনেক জনপ্রিয় তারকাদের সাথে লন্ডন সহ বিভিন্ন দেশে স্টেজ শো করেছেন তিনি। কানাডা’র ফোবানা এবং আমেরিকা’র বিভিন্ন কমিউনিটির প্রোগ্রামে প্রায়ই বাদশা বুলবুল ‘শো’ করতে যান বলে জানান।