মনির হোসেন, মালে, মালদ্বীপ
‘রক্ষক যখন ভক্ষক’- কথাটি হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কর্মকর্তাদের বেলায় অনেকাংশে সত্য। সুন্দর ও নিরাপদ ভ্রমণ নিশ্চিত করা যাদের দায়িত্ব তারাই যাত্রী হয়রানির নায়কের ভূমিকা পালন করছেন।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্স দেশের অর্থনৈতিক অবস্থানকে যতটা ক্রমশ শক্তিশালী করে চলেছে, মূলত তার সমপর্যায়ে আর কোনো কিছুই হতে পারে না। অথচ সেই চরম দুর্ভাগা প্রবাসীরা দেশে ফেরত আসাকালীন সময় প্রতিনিয়ত বিমানবন্দরে কর্মরত কতিপয় কর্মকর্তাদের অসদাচারণ এবং দুর্নীতির মাধ্যমে নানান হয়রানির শিকার হচ্ছেন। অসংখ্য অভিযোগ, বছরের পর বছর সংবাদ প্রকাশ, মন্ত্রীপর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সিভিল এভিয়েশনের কড়া তদারকি, প্রশাসনিক নজরদারিসহ গোয়েন্দা বিভাগগুলোর নানামুখী তৎপরতার পরও বন্ধ হচ্ছে না হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রবাসী হয়রানি। বিমানবন্দরে আসা-যাওয়ার পথে প্রতিনিয়ত হয়রানি ও ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন প্রবাসীরা।

বিদেশের শ্রমবাজারে সুনাম ও দক্ষতার সাথে হাঁড়ভাঙা পরিশ্রমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে আসছেন প্রবাসীরা। সেখানে ইমিগ্রেশনের হাতে তাদের নিয়মিত হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। এ বিষয়টি দেখার জন্য কেউ নেই। এ বিষয়ে সৌদি আরব প্রবাসী সাইয়েদ হোসেন আক্ষেপ করে বলেন, আমি গত ২৬ বছর যাবত সৌদি আরবের রিয়াদে কর্মরত আছি, দুই বছর পর পর দেশে আসা-যাওয়া করছি। ৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯ আমি ছুটিতে মাতৃভূমির দেশে বিমানবন্দরে নামলে ৪৫ মিনিট দাঁড়িয়ে ইমিগ্রেশন কাজ শেষ করে যাই লাগেজ আনতে। সেখানেও খুঁজতে খুঁজতে ১ ঘন্টা পর তাও তিনটার মধ্যে দুইটা লাগেজ পাই, আরেকটা অনেক খোঁজাখুঁজির পর পাচ্ছিলাম না। বাহিরেও ফ্যামিলির লোকজন অপেক্ষায় আছে তাই বিমানবন্দরের এক পুলিশ কর্মকর্তা কে বিষয়টা বললাম সে উত্তরে বলল যে আমি আপনার চাকরি করি না দেখেন কোথাও পরে আছে কিনা, তা না হলে কিছু ডলার দেন খুঁজে দিব। আমি আর বেশি কথা না বাড়িয়ে আবার নিজেই খুঁজতে শুরু করলাম। দুই ঘন্টা পর দেখি বেল্টের বাহিরে এক কোনে আমার তিন নাম্বার লাগেজটা পরে আছে। তুলে নিয়ে তাড়াহুড়া করে বের হব ওখানে আবার চেক এবং বিভিন্ন প্রশ্ন, অন্যদিকে বাহিরে ফ্যামিলির অপেক্ষা আর সহ্য হচ্ছে না সব প্রশ্নের জবাব দিতে দিতে বিরক্ত হয়ে গেছি।

দেশের প্রতি ঘৃণা হয়ে গেছে। কিন্তু আমার কথা, আমরা প্রবাসীরা দেশ থেকে বিদেশে টাকা পাচার করি না, বিদেশ থেকে দেশে আমরা টাকা আনি। তাহলে কেন বিমানবন্দরে আমাদের এমন পরিস্থিতিতে পড়তে হয়। প্রবাসীরা বিদেশ থেকে টাকা এনে দেশের উপকার করে। প্রবাসীদের টাকায় দেশের উন্নয়ন হয়। তাহলে কেন প্রবাসীদেরকে এত অবহেলা করা হয়। এজন্য আমি দেশবাসীর কাছে বিচার চাই। ভুক্তভোগী প্রবাসীরা আরো বলছেন, গত ২০ বছরে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাত্রী ও বিমান ওঠানামার সংখ্যা বাড়লেও বাড়েনি যাত্রীসেবার মান। আগে লাগেজ পেতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিমানবন্দরে প্রবাসীদের অপেক্ষা করতে হতো। এখনো সেই পরিস্থিতি থেকে মুক্তি মেলেনি প্রবাসীদের। বিদেশগামী যাত্রীদের বিমানবন্দরের দোতলায় প্রবেশপথে দীর্ঘ সময় লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। নিরাপত্তা তল্লাশির নামে প্রবাসীদের এ ভোগান্তির মুখে পড়তে হচ্ছে প্রতিদিন।
স্বল্পশিক্ষিত প্রবাসীদের নানা প্রশ্ন করে তাদের পাসপোর্ট আটকে রেখে টাকা আদায় যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে। বিমানবন্দরে প্রবেশপথের মোড় থেকেই শুরু হয় হয়রানি। এরপর কনকর্স হল, ইমিগ্রেশন পুলিশ, কাস্টমস পোস্টসহ ঘাটে ঘাটে চলে হয়রানির মহোৎসব। প্রবাসীদের লাগেজ প্রদানের ক্ষেত্রে সময়ক্ষেপণ, প্রবাসীদের প্রতি সৌজন্যমূলক আচরণ না করা, হুমকি-ধমকিতে প্রবাসীদের আতঙ্কিত করে তোলাসহ নানা রকম ভয় দেখিয়ে তাদের টাকা-পয়সা, মূল্যবান জিনিসপত্র হাতিয়ে নিচ্ছে একশ্রেণীর অসাধু বিমান কর্মচারী। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সবচেয়ে বেশি নিগৃহীত ও নাজেহালের শিকার হচ্ছেন মধ্যপ্রাচ্যের দেশসমূহে কর্মরত বাংলাদেশিরা। ইমিগ্রেশন বিভাগে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা এসব প্রবাসী কর্মজীবীর সঙ্গে খুব দুর্ব্যবহার করেন। তুই-তুকারি করে কথা বলা, পেটে কলমের গুঁতা দেওয়া, ইয়ার্কির ছলে দুই হাতে গলা চেপে ধরে পাছায় লাথি মেরে হটিয়ে দেওয়া নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব অপমানজনক ঘটনায় ক্ষুব্ধ অনেক প্রবাসী রাগে-দুঃখে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন, অপমান-লজ্জায় বিমানবন্দরের মেঝেতে গড়াগড়ি পর্যন্ত দেন। অনেকে জীবনে আর কখনো দেশে না ফেরার শপথ পর্যন্ত করেন।
বিমানবন্দরে কাস্টমস চেকিং পয়েন্টে মধ্যপ্রাচ্যপ্রবাসী বাঙালিদের পাসপোর্ট হাতে নিয়েই লাগেজ টেপাটেপি শুরু করা হয়। দায়িত্বরত একশ্রেণির কর্মকর্তার প্রথম প্রশ্ন থাকে, কয় বছর পর দেশে আসলি? আমাদের জন্য কি আনছোস কিছু দিয়ে যা।’ মান-সম্মানের দিকে তাকিয়ে ভুক্তভোগী প্রবাসীরা বিদেশি মুদ্রা হাতে গুঁজে দিয়ে দ্রুত বেরিয়ে আসেন। বিমানবন্দরে পুলিশের দায়িত্ব হলো বহির্গমণ, পার্কিং লট, ক্যানোপি, কনকর্স হল, আগমনী কনভেয়ার বেল্ট, টারমাক, রানওয়ে, ড্রাইওয়ে ও অ্যাপ্রোন এলাকায় নিরাপত্তার কাজে নিয়োজিত থাকা। কিন্তু তারা অধিকাংশ সময়ই ব্যস্ত থাকে আগমনী আর কার পার্কিং এলাকায় প্রবাসীদের মালামাল তল্লাশির কাজে। বিদেশ থেকে আসা অনেক প্রবাসী বিমানবন্দরে সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে গাড়িতে ওঠার পরই এই আর্মড পুলিশের তল্লাশির মুখোমুখি হন। নানা প্রশ্নে বিব্রত করা হয় প্রবাসীদের। টানাহেঁচড়া করে আবার বিমানবন্দরের ভিতর নেওয়ারও চেষ্টা করা হয়। হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বাইরের তুলনায় ভেতরে বেশি হয়রানির শিকার হন প্রবাসীরা। যাত্রীসেবায় নিয়োজিত ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা, বিমানবন্দর পুলিশ, কাস্টমস, কেবিন ক্রুসহ বিভিন্ন বিভাগে দায়িত্বরতদের একটা বড় অংশই সংঘবদ্ধভাবেই যাত্রী হয়রানি করছেন।
বিমানবন্দর অভ্যন্তরের অন্তত ১০টি ধাপে প্রবাসীদের কাছ থেকে চাহিদামাফিক টাকা হাতানো হয় বলে ভুক্তভোগী প্রবাসীরা জানিয়েছেন। পাশের দেশগুলোর বিমানবন্দরে একেকজন যাত্রীর সব কাগজপত্র পরীক্ষা করতে সময় লাগে পাঁচ-সাত মিনিট। আর শাহজালাল বিমানবন্দরে একেকজন যাত্রীকে ইমিগ্রেশন কাউন্টারে ১৫-২০ মিনিট ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। এরপর সবচেয়ে বড় হয়রানি বোধহয় লাগেজ সংগ্রহের সময় পোহাতে হয়। লাগেজ সংগ্রহের জন্য বেল্টের সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা প্রবাসীদের অপেক্ষা করানো হয়। আবার দেখা যায় বেল্ট ছাড়াও অন্য কোথাও লাগেজ দেখা যায় এই সুযোগে সংঘবদ্ধ চক্র লাগেজ কেটে ভিতরের মালামাল চুরি, দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের দুর্ব্যবহারের অবমাননাকর অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন প্রবাসীরা। লাগেজ পাওয়ার ভোগান্তির কারণে দীর্ঘদিন পর দেশে আসার আনন্দ অনেক সময় ম্লান হয়ে যায়। বিমান থেকে নামার কয়েক ঘণ্টা পরও মেলে না লাগেজ। মাঝে মধ্যে মূল্যবান জিনিসপত্র খোয়া যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। যত্নের সঙ্গে না রাখার কারণে লাগেজের অনেক জিনিসই নষ্ট হয়ে যায়। অন্য দেশের লাগেজ কত সুন্দর করে বেল্টে রাখা হয় কিন্তু শাহজালাল বিমানবন্দরে লাগেজগুলো আছড়ে রাখার কারণে অনেক প্রবাসীর পরিবারের জন্য আনা শখের জিনিষটি নষ্ট হয়ে যায় কিংবা ভেঙ্গে যায়। অনেক সময় তো প্রবাসীদের সামেনই তার লাগেজটি সজোরে আছড়ে ফেলার মতো ঘটনাও ঘটে। কিন্তু কিছুই বলা যায় না এসবের বিরুদ্ধে। এ নিয়ে অনেক সময় অভিযোগ করেও কোনো সমাধান পাননি ভুক্তভোগী প্রবাসীরা।
বিমানবন্দরের কর্মকর্তাদের এ ধরনের ন্যাক্কারজনক ঘটনার প্রতিবাদ করতে গেলে উল্টো ভুক্তভোগীকেই ফাঁসানোর চেষ্টা করা হয়। দুঃখজনক হলেও সত্য, হাত তোলা হয় প্রবাসীদের গায়েও! কিন্তু এই কথা বলতে বাধা নেই যে প্রবাসীর ঘামের টাকা সচল রাখছে দেশের চাকা’। বিমানবন্দরের ভেতর ব্যাংকের বুথে মুদ্রা সংগ্রহ করতে গিয়েও হয়রানির শিকার হন প্রবাসীরা। মুদ্রা সংগ্রহে গেলে ব্যাংক থেকে জানানো হয়, সংশ্লিøষ্ট দেশের মুদ্রা নেই। অবশেষে বাধ্য হয়েই ব্যাংকের আশপাশে অবস্থানকারী অবৈধ মুদ্রা ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় দেশের মুদ্রা মাত্রাতিরিক্ত দামে সংগ্রহ করতে হয়।
বিমান বন্দরের মতো জায়গায় আইন-শৃংখলা পরিস্থিতির ভয়াবহ অবনতি কোনভাবেই মেনে নেয়া যায় না। মনে রাখতে হবে, বিমানবন্দর একটি দেশের রুচি-সভ্যতার অনেক বড় পরিচয় বহন করে। তাই মানবিক কারণেও প্রবাসীদের নানাভাবে হয়রানি বন্ধের জন্য সরকারের নিশ্চয়তা প্রদান করা উচিত। অনেক প্রবাসী আছে দেশে বিনিয়োগ করতে ইচ্ছুক। শুধুমাত্র হয়রানি জীবনের অনিশ্চয়তায় ভোগার কারণে বিনিয়োগে এগিয়ে আসছেন না প্রবাসীরা। তাই প্রবাসীদের জন্য সরকার সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা গ্রহণ করলে দেশের উন্নয়নের ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকবে।