কামরুল হাসান, লসএঞ্জেলস্, যুক্তরাষ্ট্র
প্রশাসনিকভাবে মাদকবিরোধী অভিযান চালানোর পরও এর বিস্তার কমেনি বরং বেড়েছে। অভিযোগ রয়েছে প্রশাসনের নাকের ডগায় বসে দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিদিন হেরোইন, আফিম, প্যাথেডিন, ফেনসিডিল, গাঁজাসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক বিক্রি হয়। এ ছাড়া ভারত থেকে প্রতিদিন বাংলাদেশে আসছে প্রায় ১০ লাখ বোতল ফেনসিডিলসহ অন্য মাদকদ্রব্য। আর দেশে প্রায় ৩০ লাখ মানুষ নিয়মিত ইয়াবা সেবন করছে। শুধুমাত্র ভারত থেকেই দেশে আসে শত কোটি টাকার মাদকদ্রব্য। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আসে ফেনসিডিল। এছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে অনেকটা খোলামেলা ভাবেই মাদকদ্রব্য বিক্রি হচ্ছে। তাই মাদকের এই অপব্যবহার রোধে করণীয় সর্ম্পকে নীতি-নির্ধারণী পর্যায় থেকে এসব বন্ধ করতে হবে। সরকারের পাশাপাশি ব্যক্তি পর্যায়ে উদ্যোগী হয়েও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। তবে সবচেয়ে আগে পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার পদক্ষেপ নিতে হবে। এক্ষেত্রে পদক্ষেপ নিতে হবে প্রতিটি ঘর, অভিভাবক এবং শুভাকাংখীদের পক্ষ থেকে। তাছাড়া মাদকাসক্তি প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হচ্ছে মাদকদ্রব্য ও মাদকাসক্তির বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতা গড়ে তোলা। আমাদের এই মুহূর্তে উচিত মাদকদ্রব্যের অনুপ্রবেশ সম্পূর্ণ বন্ধ করা, মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা, বেকারদের কর্মসংস্থান ও স্কুল-কলেজে সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি মাদকাসক্তির কুফল সর্ম্পকে শিক্ষা প্রদান এবং মাদকাসক্তদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা।

বর্তমানে দেশে তথ্য-প্রযুক্তি খাতে শিক্ষিত যুব সমাজের অফুরন্ত সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে আউটসোর্সিংয়ে আমাদের রয়েছে অপার সম্ভাবনা। কোটি কোটি টাকার বাজার আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। এ জন্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বিভিন্ন রকম সচেতনতামূলক কার্যক্রমে এগিয়ে আসা প্রয়োজন। সেক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে কাজে লাগানো যেতে পারে। কেননা যুব সমাজ যেভাবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রতি আকৃষ্ট টেকসই পদক্ষেপ নেওয়া গেলে মাদকের করালগ্রাস কিছুটা হলেও কমিয়ে আনা সম্ভব।
বাংলাদেশে মিয়ানমার থেকে ইয়াবাসহ যেসব মাদকদ্রব্য আসে তার সিংহভাগ আসে নাফ নদ ডিঙ্গিয়ে। জেলেরা মাদক পাচারের সঙ্গে জড়িত। নাফ নদে মাছ ধরা নিষিদ্ধ হলে নদীপথে মিয়ানমার থেকে ইয়াবা আসা অনেকাংশে বন্ধ হবে। পাশাপাশি মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গাদের অবৈধ অনুপ্রবেশে বাদ সাধা সম্ভব হবে। মিয়ানমার থেকে চোরাইপথে ব্যাপক হারে ইয়াবার অনুপ্রবেশ যুবসমাজের একাংশকে সর্বনাশের পথে ঠেলে দিচ্ছে। স্থলপথে মাদক চোরাচালান অনেকাংশে ঠেকানো গেলেও জলপথের অনুপ্রবেশ ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়ছে। অনুমান করা হয়, মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে মাদক চোরাচালানে জেলেরা জড়িত। তারা মাদক চোরাচালানের পাশাপাশি অস্ত্র চোরাচালানে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। দেশের আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার জন্য যা হুমকি সৃষ্টি করছে নাফ নদে জেলেদের মাছ ধরা বন্ধ হলে তা আর্থিক দিক থেকে খুব বেশি ক্ষতিগ্রস্থ করবে না। কারণ নাফ নদে যারা মাছ ধরেন, তারা সমুদ্র এলাকায়ও মাছ ধরার সঙ্গে জড়িত। মাছ ধরার পাশাপাশি মাদক পাচারের মাধ্যমে বাড়তি অর্থ আয়ের লোভে অনেকে নাফ নদে মাছ ধরার ব্যাপারে উৎসাহী। এ ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ হলে ইয়াবা চোরাচালান অন্তত ৫০ শতাংশ কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশও হ্রাস পাবে। আমরা আশা করব, মাদক আগ্রাসন শূণ্য পর্যায়ে নিয়ে আসতে শুধু নাফ নদে মাছ ধরা নিষিদ্ধ নয়, ইয়াবা চোরাচালানের সঙ্গে সীমান্ত এলাকার যেসব রথী-মহারথী জড়িত তাদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে। নিষিদ্ধ জগতে অস্ত্রের পর মাদকই সবচেয়ে লাভবান ব্যবসা। বিশেষ করে ফেনসিডিল ও ইয়াবা সহজলভ্য এবং বহনযোগ্য বলে এর বিস্তার দেশজুড়ে। সত্যি বলতে কী, দেশের এমন কোনো এলাকা খুঁজে পাওয়া যাবে না যেখানে মাদকের থাবা নেই। সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তারা বিভিন্ন কলাকৌশলে এ ব্যবসা পরিচালনা করে। যেখানে এদের কৌশলের কাছে অদৃশ্য কারণে সরকার বারবার ব্যর্থ। বিষয়টি আমাদের জন্য লজ্জাজনক।
দেশজুড়ে এক বিশাল জাল বিস্তার করে আছে এ মরণ নেশার ভয়াবহ সিন্ডিকেট। আন্তর্জাতিক অপরাধ চক্র মাফিয়াদের সঙ্গে রয়েছে এদের শক্ত ও গভীর যোগাযোগ। মাদকের রয়েছে বিভিন্ন রুট। বিমানবন্দর থেকে শুরু করে স্থলবন্দর, সমুদ্রবন্দর, সীমান্ত এলাকায় মাদকের ছড়াছড়ি। এর কিছু ধরা পড়ে। বাকিটা চলে যায় মাদকসেবী ও ব্যবসায়ীদের কাছে। শুধু শহরেই নয়, গ্রামেও ছড়িয়ে পড়েছে মাদক। তার বিষাক্ত ছোবল শেষ করে দিচ্ছে তারুণ্যের শক্তি ও অমিত সম্ভাবনা। ব্যক্তি ও পারিবারিক জীবনের অবক্ষয়, প্রত্যাশার সঙ্গে প্রাপ্তির অসামঞ্জস্যতা, হতাশা এবং মূল্যবোধের অভাবের সুযোগ নিয়ে মাদক তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে তরুণ সমাজের প্রতি। বেকারত্বও মাদকের বিস্তারে সহায়ক। এ মরণ নেশার বিস্তারে সমাজে একদিকে যেমন অপরাধ বাড়ছে, তেমনিভাবে নষ্ট হচ্ছে সামাজিক শৃংখলা। এ অবস্থা চলতে থাকলে একটি সমাজের অন্ধকারের অতল গহŸরে হারিয়ে যেতে খুব বেশি সময় লাগবে না।
মাদকমুক্ত সমাজ গড়তে হলে মাদকদ্রব্যের প্রাপ্তি সহজলভ্য যাতে না হয়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। যে কোনো মূল্যে ঠেকাতে হবে মাদকের অনুপ্রবেশ। দেশেও যাতে মাদকদ্রব্য উৎপাদন হতে না পারে, সে ব্যাপারেও পদক্ষেপ নিতে হবে। দুঃখজনক হচ্ছে, মাঝেমধ্যে ছোটখাটো মাদক ব্যবসায়ী ও মাদকের চালান ধরা পড়লেও তাদের মূল কুশীলরা থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে। অভিযোগ রয়েছে, সমাজের প্রভাবশালী অনেক ব্যক্তি এসব সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত থাকায় তাদের টিকিটি স্পর্শ করতে পারে না আইনশৃংখলা বাহিনী। এ অবস্থার পরিবর্তন জরুরি। মাদকের ভয়াল থাবা থেকে দেশটাকে বাঁচাতে হলে মাদক সিন্ডিকেট যতই শক্তিশালী হোক, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। এ ব্যাপারে সামাজিক সচেতনতারও কোনো বিকল্প নেই। ধর্মীয় মূল্যবোধ ও নীতিনৈতিকতার উন্মেষ ঘটাতে হবে। যারা এরই মধ্যে মাদকাসক্ত হয়েছে, তাদেরও সহানুভূতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে সুস্থ ধারায় ফিরিয়ে আনতে হবে। বাড়াতে হবে মাদক নিরাময় কেন্দ্রের সংখ্যাও। সর্বোপরি সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি করে যার যার অবস্থান থেকে মাদকের বিরুদ্ধে লড়াই করে এ যুদ্ধে জয়ী হতেই হবে।

একই সঙ্গে এই অবৈধ ব্যবসার ফলে সরকার প্রতিবছর পাঁচ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে। তাছাড়া মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেশে বর্তমানে মাদকসেবীর সংখ্যা অন্তত দেড় কোটি। মাদকসেবীরা গড়ে প্রতিদিন অন্তত ২০ কোটি টাকার মাদক সেবন করে থাকে। হিসাব অনুযায়ী মাসে ৬০০ কোটি টাকা। অন্যদিকে সারা দেশে প্রায় ৩০ লাখ মাদক ব্যবসায়ী প্রতিদিন কমপক্ষে প্রায় ২০০ কোটি টাকার মাদক কেনাবেচা করে। আরো একটি ভয়ঙ্কর চিত্র হচ্ছে, সারা দেশের ছড়িয়ে পড়া ইয়াবার শতকরা ৮৫ ভাগই ভেজাল। যার ফলে এসব ইয়াবা গ্রহণকারী মাদকাসক্তরা নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। তার মধ্যে কিডনি, লিভার ছাড়াও মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কাজকর্ম নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। স¤প্রতি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, শতকরা ৮০ ভাগ খুনের সঙ্গে মাদকাসক্তরাও কোনো না কোনোভাবে জড়িত।
মাদক নির্ভরশীল ব্যক্তির চিকিৎসার সব পর্যায়ে পরিবারের অংশগ্রহণ ও সহযোগিতা প্রয়োজন। মাদক নির্ভরশীল ব্যক্তি স্বভাবতই চিকিৎসা নিতে চায় না। কারণ সে বুঝতেই পারে না, তার চিকিৎসার প্রয়োজন। আবার অনেকেই শারীরিক যন্ত্রণার ভয়ে মাদক চিকিৎসায় অনীহা পোষণ করে। এ ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যদের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত সহমর্মিতামূলক আচরণের মাধ্যমে তাকে চিকিৎসা নিতে আগ্রহী করে তুলতে হবে। মাদক নির্ভরশীল ব্যক্তিকে সঠিকভাবে পরিচর্যা করতে না পারলে যে কোনো সময় তার পূর্বের অবস্থায় ফিরে যাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা থাকে। মাদকাসক্তি চিকিৎসায় ব্যক্তির নিজ ও তার পরিবারের সার্বিক সহযোগিতাসহ সেবা প্রদানকারী সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ভালো করা যেতে পারে। তবে এক্ষেত্রে পরিবারের ভূমিকাই সবচেয়ে বেশি তবে সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই, আমাদের এই সচেতনতা এবং সহযোগিতা যুবসমাজকে যুব শক্তিতে পরিণত করবে।
দিন দিন ইয়াবা আসক্তের সংখ্যা অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে। আসক্ত তরুণ-তরুণীরা অধিকাংশ উচ্চ ও মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। মাদকাসক্তি প্রতিরোধের সর্বাপেক্ষা কার্যকর উপায় হচ্ছে মাদকদ্রব্য ও মাদকাসক্তির বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতা গড়ে তোলা। মাদকদ্রব্যের অনুপ্রবেশ সম্পূর্ণ বন্ধ করা, মাদক ব্যবসার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িতদের গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা, বেকারদের কর্মসংস্থান ও স্কুল-কলেজে সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি মাদকাসক্তির কুফল সম্পর্কে শিক্ষা প্রদান এবং মাদকাসক্তদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা। মাদক বন্ধে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টার বিকল্প নেই।
তাই আসুন- আজই, এখনই, আমি-আপনি-আমরা, আমাদের সন্তানদের জন্য হলেও মাদককে না বলি।