শহিদুল ইসলাম
দর্শন আকাশের জ্যোতিষ্ক মহাগুরু সক্রেটিস জন্মেছিলেন গ্রিসের এথেন্স নগরীতে খ্রিষ্টপূর্ব ৪৭০ অব্দে। তার পিতা সফ্রনিস্কাস (Sophroniscus) একজন ভাস্কর এবং মাতা ফিনারিটি (Phaenarite) ধাত্রী ছিলেন। জীবনের প্রারম্ভে তিনি পৈতৃক পেশা হিসেবে ভাস্কর্য তৈরি করাকে গ্রহণ করেন। এথেন্সের অ্যাক্রোপলিসে (অপৎড়ঢ়ড়ষরং) তাৎকালীন প্রদর্শিত ভাস্কর্য শিল্প সক্রেটিসের বলে প্রমাণিত হয়। পরবর্তীতে তিনি দর্শন চর্চায় মনোযোগী হয়ে পড়েন এবং বিশ্বজগতের তথা এথেন্সের আকাশে দর্শনের ধূমকেতু হিসেবে আবির্ভূত হন।
সক্রেটিস মোটেও সুন্দর ছিলেন না। তিনি বেঁটে, মোটা, নাক প্রশস্ত, চ্যাপ্টা, জীর্ণশীর্ণ বস্ত্র, টাকওয়ালা ছিলেন। কিন্তু দার্শনিক জাদুকর সক্রেটিসের দর্শন প্রচার ছিল অসম্ভব আকর্ষণীয়। হাটে-ঘাটে গ্রামে এথেন্সের লোকজন তার কথা মন্ত্রমুগ্ধভাবে শুনতেই থাকতেন। তৎকালে থেলিস থেকে শুরু করে সফিস্টদের পূর্ব পর্যন্ত দার্শনিক আলোচনার মুখ্য বিষয় ছিল জগৎ, প্রকৃতি, বিশ্ব ব্রাহ্মন্ড ইত্যাদি ব্যাখ্যাদেয়া। তৎকালীন এথেন্সের রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক অবস্থার প্রেক্ষিতে বিশ্বতাত্তি¡ক আলোচনার চাইতে প্রায়োগিক জ্ঞানতত্ত¡ অপরিহার্য ছিল। তখন সক্রেটিস প্রাকৃতিক নিয়মনীতির বিশ্লেষণের চাইতে মানুষের অভ্যন্তরীণ দিক দিয়ে আচার-অনুষ্ঠান, মনন-মানবিকতার উন্নয়ন করতে প্রস্তুত ছিলেন। তার আদর্শ ও কর্মস্পৃহা নির্ধারিত হয়েছিল বাস্তব দ্ব›দ্বমুখর রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থার প্রতি বিতৃষ্ণা থেকে। সক্রেটিসের কোন গ্রন্থ ছিল না। তিনি তার আদর্শ ছাত্র প্লেটোকে রেখে যান।
তার রচনাবলি অ্যাপলজি, ইউনাইফ্রো, ল্যাভেস, ক্রিটো মেনো, প্রোটাগোরাস এবং জর্জিয়াস। জেনোফনের উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হচ্ছে অ্যাপলজি, সিম্পোজিয়াম ও মেমোরাবিলিয়া প্রভৃতি গ্রন্থের মাধ্যমে আমরা সক্রেটিসের নীতি-দর্শন সম্বন্ধে অবহিত হতে পারি।

ইমামে আজম আবু হানিফা (রহ.)-এর আমলে একদিন তার সাথিগণ তার জ্ঞানের গভীরতা ও পান্ডিত্য দেখে যখন বললেন আপনি বর্তমান জামানার সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ জ্ঞানী। তখন তিনি বললেন আমার এমন জ্ঞান নেই যা একজন মুচির আছে। তখন তার সাথিরা তার কথা শুনে অবাক হলো। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, একটা কুকুর কখন বালেগ হয় এ জ্ঞানটা আমার ছিল না কিন্তু একজন মুচির ছিল। তিনি নিজেকে জ্ঞানী পরিচয় দিতে কুণ্ঠাবোধ করতেন। সক্রেটিস তার বহু আগে এটা ঠিক অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। গ্রিসের লোকজন যখন সক্রেটিসকে সবচেয়ে জ্ঞানী বলে প্রচার করতেন তখন সক্রেটিস অনুতপ্ত হয়ে বলতেনÑ “আমাকে জ্ঞানী বলো না আমাকে জ্ঞান অনুরাগী বল।” সক্রেটিস বুঝতে পেরেছিলেন মানুষ যত জানতে থাকে ততই তার নিকট অজানা বিষয় এসে হাজির হয়। নিজের মূর্খতা সম্বন্ধে সে যত সচেতন হয় ততই সে সবচেয়ে বেশি পান্ডিত্যের অধিকারী বলে মানবমন্ডলীর নিকট পরিগণিত হয়। তিনি তার জ্ঞান এথেন্সের মানুষের মধ্যে বিচরণ করতেন উদারতার সঙ্গে। তিনি বুঝে ছিলেন নিজে জ্ঞানী হওয়ার চেয়ে দশ জনকে জ্ঞানী করা বড় কথা। তিনি তার প্রজ্ঞা ও অভিজ্ঞতার মাধ্যমে জ্ঞানভান্ডারকে করেছেন সমৃদ্ধ এবং অকৃপণভাবে সেটা বিতরণ করেছেন মানুষের কাছে। মহাবিজ্ঞানী নিউটন তার জ্ঞান সম্বন্ধে এক পর্যায়ে বলেছেন- আমি জ্ঞান সমুদ্রের বেলাভ‚মিতে দাঁড়িয়ে শামুক-ঝিনুক নিয়ে নাড়াচাড়া করছি, এখনো অথই দরিয়া আমার কাছে অজানা রয়ে গেল। “সক্রেটিস বহু আগে জ্ঞান সম্বন্ধে বলেছেন, I Knwo A Thing That I Knwo Nothing ” “আমি একটা জিনিসই জানি তা হলো আমি কিছুই জানি না।” সক্রেটিসের শ্রেষ্ঠ উক্তি- ‘KNOW THYSELF’ অর্থাৎ “নিজেকে জানো”। তিনি নিজের অবস্থান, পরিচিতি, পরিণতি, জগৎ এবং জীবন, নিজের অস্তিত্ব ও দায়-দায়িত্ব অর্থাৎ নিজকে জানার উপর গুরুত্ব দিয়েছেন অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে। আমি যদি না থাকি তাহলে এত বড় আকাশ, এত বাতাস, এত ফুল, এত ফল, এত সুর, এত ছন্দ, এত সৌন্দর্য কীসের জন্য। আমি আছি বলে এর মূল্য আছে, আমি নেই এর কোন মূল্য নেই।” যে নিজেকে জানতে পারেনি সে জগৎ জীবন, অধিকার ও দায়িত্ববোধ সম্পর্কে সজাগ হতে পারেনি। সে এমনকি ¯স্রষ্ট্রাকে পর্যন্ত জানতে পারেনি। এই বিষয়টিকে উপলক্ষ্য করে একজন দার্শনিক বলেছেন- Cogni“e Psyche ⊃ Being যে নিজেকে জানতে পেরেছে সে তার স্রষ্ট্রাকে জানতে পেরেছে। সক্রেটিসের knwo thyself -এর ওজন এত বেশি যে আমেরিকা মহাকাশে স্টেশন তৈরি করতে পারবে। সমুদ্রের তলদেশ থেকে মহাকাশ গবেষণা করে উথাল-পাতাল করতে পারবে, এমনকি নিজের জীবন পর্যন্ত জয় করতে পারবে। কিন্তু কেয়ামত পর্যন্ত সক্রেটিসের knwo thyself – এর মতো একটি Sentence আবিষ্কার করতে পারবে না।

সক্রেটিস বলেছেন, knowledge is virtue and virtue is knowledge অর্থাৎ পুণ্যই জ্ঞান এবং জ্ঞানই পুণ্য। অজ্ঞানতা ও মূর্খতা হলো সব অন্যায় আচরণের ভিত্তি। বিদ্যার চেয়ে জ্ঞানের জোর বড়, তাই আমরা বলি knowledge is power তবে জ্ঞানটা হতে হবে সত্যের জ্ঞান। মিথ্যার আয়োজনে আড়ম্বরতা বেশি। বক্রতা ও কর্কশতা বেশি। কিন্তু সত্য সরল সহজ। সেখানে সকল সৌন্দর্য ও মুক্তির নিশ্চয়তা নিহিত। তাইতো সক্রেটিস বুঝেছিলেন মানুষের জীবনের পূর্ণতা আসতে পারে সত্য, সুন্দর ও মঙ্গলকে আত্মস্থ করার মধ্য দিয়ে। সত্য, সুন্দর ও মঙ্গল সম্বন্ধে যিনি জ্ঞান লাভ করবেন তিনি তার অনুশীলন করা থেকে বিরত থাকতে পারেন না। সত্য জ্ঞান যার ভিতর ঢুকেনি তিনি পূর্ণ মানুষ হতে পারেন নি। মানবজাতির ভিতর তিনিই শ্রেষ্ঠ যিনি সত্য জ্ঞানের আলোয় উদ্ভাসিত। সক্রেটিস নিজে ন্যায়ের এবং প্রজ্ঞার উপর প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। তিনি ছিলেন সত্যের সাধক এবং সৌন্দর্য্যরে পূজারী। জ্ঞান ও প্রজ্ঞার উপর জোর দিতে গিয়ে সক্রেটিস বলেন- “যদি একজন ইচ্ছা করে অন্যায় করেন তবে তিনি ঐ ব্যক্তির থেকে অধিকতর শ্রেয় যিনি অনিচ্ছাকৃতভাবে অন্যায় করেন। কারণ প্রথমজন মঙ্গলের সার্বিক এবং সাধারণ শর্তগুলো মেনে চলেন। কিন্তু অপরজন মঙ্গল সম্বন্ধে সম্পূর্ণ অজ্ঞাত, জ্ঞান অর্জন, নৈতিক জীব ও প্রজ্ঞার জ্ঞানে তিনি কতদূর অতিক্রম করেন তা তার গভীর দর্শন চর্চার উপলব্ধি থেকে জানা যায়। দর্শন চর্চার এক পর্যায়ে যেয়ে তিনি তার বন্ধু ক্রিটোকে বলেছিলেন- “তুমি যদি মনে কর দর্শন মানুষের অকল্যাণের হেতু তাহলে দর্শনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে ফেল। আর আমার মতো তুমিও যদি মনেপ্রাণে বিশ্বাস কর যে দর্শনের মূল লক্ষ্য মানব কল্যাণ তাহলে অযৌক্তিক কুসংস্কার ছেড়ে দর্শনানুরাগী হও এবং আমরণ দর্শনের সেবা কর।”

সক্রেটিসকে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে অলঙ্কৃত করেছে তার সত্য ও ন্যায়ের প্রতি কঠোর নিষ্ঠা থেকে। প্রকৃত মনুষ্যত্বের ভিত্তি নিঃস্বার্থ পরার্থপরতার ভিত্তিতে সম্পর্ক ও যিনি অন্তরে বাইরে ঘাঁটি একমাত্র তার পক্ষেই এ ধরণের সম্পর্ক গড়া সম্ভব। মুখোশধারী ব্যক্তিত্ব কোনদিন এ ধরনের সম্পর্ক গড়তে সক্ষম হয় না। সততা ও প্রজ্ঞার আলোকে যার জীবনচালিত তিনি সত্তর বছর বয়সে তিনটি অভিযোগ – এথেন্সের তৎকালীন রাষ্ট্র অধিনায়ক এবং বুদ্ধিজীবীদের দ্বারা অভিযুক্ত হন।
১. জাতীয় দেব-দেবীদের অস্বীকার করা।
২. মনগড়া নিজস্ব দেব-দেবীর সৃষ্টির জন্য।
৩. এথেন্সের যুব সম্প্রদায়কে ভ্রষ্ট করার জন্য।

তবে এ বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার দরকার যে তিনি তো অস্বীকার করেন নি বরং দেব-দেবীদের প্রতি তার আন্তরিক ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন করতে দেখা গেছে। এথেন্সের যুব সম্প্রদায়কে সৎ, সুন্দর ও রাষ্ট্র পরিচালনার উপযুক্ত করে গড়ে তুলতে চেয়েছেন। সক্রেটিসের জ্ঞান-গরিমার কথা প্রচারিত হলে তৎকালীন বুদ্ধিজীবী মালিটাস, লিকন এবং ইনিটাস ঈর্ষাপরায়ণ হয়ে সক্রেটিসের বিরুদ্ধাচারণ শুরু করেন। সক্রেটিসকে মিথ্যা অভিযোগে মৃত্যুদন্ডাদেশ দেয়া হয়। মৃত্যুপথের যাত্রী সক্রেটিসকে পেরিক্লিসের সাহায্যে অ্যানাক্সোগোরাস যেভাবে পালিয়ে গিয়েছিলেন সেইভাবে এথেন্স থেকে পালিয়ে যেতে বললেন। কিন্তু সক্রেটিস বললেন আমি তো সত্যের পথে আছি। তিনি কাপুরুষের মতো পালিয়ে যেতে পছন্দ করেন নি এবং জীবনের মায়া করে রাষ্ট্রনায়কদের কাছে আত্মসমর্পণ করেন নি। কারাগারে গোসল করানোর পর সক্রেটিসকে তার পরিবারের নিকট হাজির করা হয়। সক্রেটিস তাদের দুঃখের কথা জানতে পেরে বললেন- “তোমরা দুঃখ করো না। মনে রেখ মৃত্যু কেবল আমার দেহকেই বিনাশ করবে আত্মাকে নয়।” হেমলক গাছের পাতা দিয়ে তৈরি বিষের পেয়ালা পান করার পর তিনি ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে পড়লেন। যখন তার প্রাণ ওষ্ঠাগত তখন তিনি তার বন্ধু ক্রিটোকে বললেন- “ক্রিটো আমি সফিউল্লোর নিকট একটি মোরগের জন্য ঋণী; তা ফিরিয়ে দিও। এতে অবহেলা করো না যেন।” এই বক্তব্যের মাধ্যেমে বোঝা যায় যে তিনি কতটুকু সৎ ছিলেন। ধীরে ধীরে তার শরীর শক্ত হয়ে আসছে। হঠাৎ তার শরীর কম্পন দিয়ে খিচিয়ে ওঠার মাধ্যমে দর্শন আকাশের জ্যোতিষ্ক খসে পড়ল মানবতার মহান ভ‚মির উপর। সক্রেটিস মায়াবী পৃথিবীর মায়া থেকে চিরবিদায় নিলেন। তিনি যে কালোত্তীর্ণ দর্শন ও নৈতিক চিন্তা বিশ্ববাসীকে উপহার দিয়ে গেছেন তা একবিংশ শতাব্দীর দোরগোড়ায় এসেও তার উপযোগিতা উজ্জ্বল ও ভাস্কর হয়ে আছে। বিশ্ববাসী আজও তাকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে থাকে।
(লেখক, প্রাবন্ধিক, প্রভাষক
দর্শন বিভাগ
সরকারী ইস্পাহানি কলেজ
কেরাণীগঞ্জ, ঢাকা)।