ইসরাত জেবিন
স্থাপত্য শিল্পের অদ্ভুত সুন্দর কিছু উদাহরণ হল মাইমেটিক ভবন। কোন কিছুর অনুকরণে তৈরি করা হয় বলেই এই ভবন বা বিল্ডিং গুলোকে মাইমেটিক ভবন বা মাইমেটিক বিল্ডিং বলা হয়। ইংরেজি শব্দ “Mimic” থেকে “Mimetic” শব্দ এসেছে। কাজের সাথে মিল রেখেই ডিজাইন করা হয় এই বিল্ডিং গুলোর। মাইমেটিক আর্কিটেকচার কে ‘Novelty’ বা ‘Programmatic’ আর্কিটেকচারও বলা হয়। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রে এ ধরনের বিল্ডিং বেশ জনপ্রিয়তা পায়। বিশেষ করে ১৯২০ সাল থেকে ১৯৫০ সালের মাঝে যখন যুক্তরাষ্ট্রে গাড়ির ব্যবহার বাড়ে। সেই সাথে বৃদ্ধি পায় গাড়ি চলাচলের উপযোগী রাস্তা। তখন বিভিন্ন ব্যস্ত রাস্তার পাশে গড়ে ওঠে নানা ডিজাইনের মাইমেটিক রেস্টুরেন্ট। ১৯৫০ সালের পর এ ধরনের আর্কিটেকচারের জনপ্রিয়তা কমতে শুরু করে ফলে অনেক মাইমেটিক বিল্ডিং তখন ভেঙ্গে ফেলা হয় বা নতুন করে সংস্কার করা হয়। তবে বিশ্বজুড়ে এখনও আছে নানা মাইমেটিক ভবন যা এখনও মানুষের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু।
মাইমেটিক বিল্ডিং নিয়ে করা প্রবাস মেলা’র ধারাবাহিক প্রতিবেদনের দ্বিতীয় পর্বে আপনাদের জানাবো বিশ্বের “সবচেয়ে বড় বুকশেলফ” সম্পর্কে নানা মজার তথ্য।
আমেরিকার অঙ্গরাজ্য মিসৌরির অন্যতম প্রধান শহর ক্যানসাসের রাস্তা দিয়ে চলতে চলতে হঠাৎ যদি দেখতে পান দানবাকৃতির অনেকগুলো বই বিশাল বুকশেলফে সাজানো আছে তাহলে কল্পনার জগতে হারিয়ে গেছেন ভেবে মোটেই বিচলিত হবেন না কিংবা এখান থেকে বই নিয়ে পড়ার চেষ্টা করতে যাবেন না। কারণ এই বইগুলো পড়া সম্ভব নয় তবে এগুলো আপনাকে নিয়ে যেতে পারে এমন একটি জায়গায় যেখানে লাখো বইপ্রেমির জন্য রাখা আছে হাজারো ধরনের বই। বলছিলাম ক্যানসাস সিটি লাইব্রেরির পার্কিং লট এর কথা। “বই মানুষের পরম বন্ধু”, বই জ্ঞানভান্ডার”, কিংবা “বই পুরো পৃথিবীকে নিয়ে আসতে পারে চোখের সামনে” এসব কথা আমরা সবাই জানি। কিন্তু বই আকৃতিতে বিশাল এক গাড়ি পার্কিং এরিয়া প্রথম তৈরি করে দেখিয়েছে এই শহরের সেন্ট্রাল লাইব্রেরি। বই এর রাজ্যে প্রবেশের জন্য বই দিয়ে তৈরি সম্পূর্ণ ভিন্নধরনের এই পার্কিং এরিয়া শুধু বইপ্রেমিদের কাছেই নয় সারা বিশ্বের কাছে ক্যানসাস কে তুলে ধরেছে একেবারে অন্যরূপে।
‘ক্যানসাস সিটি পাবলিক লাইব্রেরি’ ক্যানসাস সিটির একেবারে প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত। অত্যন্ত সমৃদ্ধ লাইব্রেরির রয়েছে ৯টি শাখা। এই লাইব্রেরী প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৭৩ সালে ৫ ডিসেম্বর। তখন এর নাম ছিল ‘পাবলিক স্কুল লাইব্রেরি অব ক্যানসাস সিটি’। সে সময় এটি শহরের সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হতো। এখানে এখনও সংরক্ষিত আছে এই শহরের নানা সময়ে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনার খবর, ছবি, মানচিত্র ইত্যাদি। এমনকি তৎকালীন সময়ের বহু পুরানো সিটি ডিরেক্টরি ও সযত্নে তোলা আছে এখনো। বইপ্রেমিদের স্বর্গ এই লাইব্রেরিতে আছে নানা ধরনের বই, জার্নাল এবং আর্টিকেল। এছাড়াও আছে আফ্রিকান-আমেরিকান ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতি বিষয়ক নানা লেখা।
১৮৭৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর বিভিন্ন সময়ে নানা ধরনের সংস্কারের মধ্য দিয়ে গেছে এই ঐতিহাসিক লাইব্রেরিটি। লাইব্রেরিতে আসা পাঠক, পৃষ্ঠপোষক এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ক্রমবর্ধমান গাড়ির চাপ সামলাতে ২০০৪ সালে সংস্কার করা গাড়ি পার্কিং এরিয়া। পার্কিং এরিয়ার সম্মুখভাগ আরও দৃষ্টিনন্দন করার জন্য এখানে তৈরি করা হয় বিশাল এক বুকশেলফ আর তাতে সাজানো হয় শহরের বাসিন্দারের পছন্দের বই এর ম্যুরাল। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বুকশেলফে সাজানো ২২ টি বই এর এক একটির উচ্চতা প্রায় ২৫ ফিট এবং প্রস্থ ৯ ফিট। এর উপর একধরনের তাপরোধক প্লাস্টিক লাগিয়ে এগুলোকে সম্পূর্ণ বই এর আকৃতি দেয়া হয়েছে। বিশাল এই সব বই এর তালিকায় রয়েছে Ray Bradbury এর Fahrenheit 451, Lao Tyu এর লেখা Tao Te Ching থেকে শুরু করে J. R. R. Tolkien এর লেখা বিখ্যাত “The Lord of the Rings” সহ আরও নানা ধরনের বিখ্যাত বই। এই সম্পূর্ণ প্রজেক্টটি শেষ করতে খরচ হয়েছিল প্রায় ৫০ মিলিয়ন ইউএস ডলার!
সিটি লাইব্রেরির দক্ষিণ দেয়াল ঘেঁষে তৈরি বুকশেলফটি Wyandotte Street এবং Baltimore Avenue এর মাঝে 10th Street এ অবস্থিত। কাছে থেকে দেখলে বুঝা যায় অসংখ্য ছোট ছোট ব্লক একসাথে জোড়া দিয়ে তৈরি হয়েছে এক একটি বই যার কিছু কিছু সময়ের সাথে নষ্ট হয়ে গেছে। বই এর মলাট হিসেবে যে তাপ নিরোধক প্লাস্টিক ব্যবহার করা হয়েছে দীর্ঘ সময় ধরে নানা ধরনের আবহাওয়ার সাথে যুদ্ধ করে সেগুলোও এখন খানিকটা ক্ষতিগ্রস্থ।
কখনও ক্যানসাস সিটি তে গেলে সময় নিয়ে একবার ঘুরে দেখে আসতে পারেন বিশাল এই বুকশেলফ যা শুধুমাত্র মাইমেটিক স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শনই না, এই শহরের মানুষের পছন্দের বহিঃপ্রকাশও বটে। নিদেনপক্ষে একটা সেলফি তো নেয়া যেতেই পারে এর সামনে দাড়িয়ে! তাই না!