শহীদ রাজু
বাংলাদেশের টেবিল টেনিসের রানি। দীর্ঘ দুই যুগ নারীদের টেবিল টেনিসে রাজত্ব করেছেন। নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া এই ক্রীড়াবিদ দেশের নাম ছড়িয়েছেন বিশ্ব পরিম-লে। রেকর্ড ১৬ বার জাতীয় চ্যাম্পিয়নশীপ অর্জন করে গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ডের রেকর্ডস বুকে নাম লিখিয়েছেন। তিনি টেবিল টেনিসের সম্রাজ্ঞী জোবেরা রহমান লিনু। সম্প্রতি দেশের জনপ্রিয় এই ক্রড়াবিদ ঘুরে গেলেন পাক্ষিক প্রবাস মেলা কার্যালয়ে। তার মুখোমুখি হয়ে খেলোয়াড়ি জীবনের আদ্যোপান্ত সহ বর্তমান নানা বিষয়ে প্রবাস মেলা’র সাথে কথা বলেছেন। সে সবের চুম্বক অংশ পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হল।
ছোটবেলাতেই বেশ দুরন্তপনা ছিলেন জোবেরা রহমান লিনু। তার ছিল জয় করার অধম্য ইচ্ছা। কতটা দুরন্তপনা এবং জয় করার অধম্য ইচ্ছা ছিল এ বিষয়ে শুরুতেই শৈশবের একটি স্মৃতি শেয়ার করেন। লিনু বলেন, আমার বয়স কত বড়জোড় ৭ কিংবা ৮ হবে। ছোটবেলার খেলার বন্ধুদের সাথে বাজি ধরে সিলেটের লালখান বাজার এলাকায় প্রায় তিনতলা সমান উঁচু পাহাড় থেকে লাফ দিয়েছিলাম! ভাগ্য ভালো সেদিন কোন দুর্ঘটনা ঘটেনি।
চট্টগ্রামের কাপ্তাইয়ে জন্মগ্রহণ করা জোবেরা রহমান লিনুর জীবনের প্রথম ৫ বছর সেখানেই কাটে। এরপর বাবার চাকরির সুবাদে সিলেটের সাহাজির বাজার এলাকায় চলে আসেন।

কিভাবে টেবিল টেনিস খেলায় আসলেন এ প্রশ্নের জবাবে লিনু বলেন, ‘আমার বাবা সরকারি কর্মকর্তা হওয়ায় সিলেট অফিসার্স ক্লাবে প্রায়ই যাতায়াত ছিল। বাবার সঙ্গেই বড় বোন মুনিরা মোর্শেদ সহ অফিসার্স ক্লাবে মাঝেমধ্যে যেতাম। সেখানে একটা টেবিলে ছোট ছোট বল আর ব্যাট নিয়ে অনেকে খেলতেন। বাবা এবং বড় বোনও খেলতেন। তাদের খেলা দেখে আমারও আগ্রহ হত। মজার বিষয় তখন আমার উচ্চতা টেনিস খেলা টেবিলের চেয়েও কম ছিল! বাবাকে বলার পর তিনি বললেন, আগে তুমি আরো লম্বা হও, তারপরে খেলা শুরু করবে। কিন্তু আমি ছিলাম নাছোড়বান্দা, বাসায় বাবা আমাকে শ্যাডো প্র্যাক্টিস শুরু করালেন। এভাবে বাবা এবং বোনের কাছ থেকেই টেবিল টেনিস খেলায় আমার হাতেখড়ি শুরু।’
এরপর ১৯৭৩ সালে জোবেরা রহমান লিনু মাত্র ৮ বছর বয়সে প্রথম টেবিল টেনিস প্রতিযোগিতয় অংশ নেন। সে বছর ঢাকায় জাতীয় প্রেসক্লাব ওপেন টেবিল টেনিস টুর্নামেন্টে লিনু বড়দের সাথে প্রতিযোগিতা করে রানার্সআপ হন। চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলেন তার বড় বোন মুনিরা মোর্শেদ। পরের বছর একই প্রতিযোগিতায় তিনি রানার্সআপ হন। সে সময় তারা সিলেট থেকে প্রায় সময় ঢাকায় এসে খেলে যেতেন।
জাতীয় পর্যায়ে এই ক্রীড়াবিদের অর্জন
১৯৭৭ সালে লিনু যখন মাত্র ১২ বছরের মেয়ে সেবছরই জাতীয় টেবিল টেনিস প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হন। এরপর ৭৯, ৮২, ৮৩, ৮৪, ৮৫, ৮৬, ৮৮, ৯০, ৯১, ৯৪, ৯৫, ৯৬, ৯৭, ৯৯, ২০১১ সালে রেকর্ড ১৬ বার মেয়েদের টেবিল টেনিসে চ্যাম্পিয়নশীপ অর্জন করেন। এছাড়াও বাংলদেশ গেমসের অধীনে টেবিল টেনিস প্রতিযোগিতায় লিনু ১৯৮৮, ৯২ এবং ৯৬ সালে চ্যাম্পিয়ন হন। তিনি ১৯৭৮, ৭৯ এবং ৮০ সালে জাতীয় সাইক্লিং চ্যাম্পিয়নশীপ অর্জন করেন। এছাড়াও জোবেরা রহমান লিনু ১৯৯৩ সালে বাংলাদেশ জাতীয় এ্যাওয়ার্ড, ১৯৮০ ও ৯১ সালে বাংলাদেশ স্পোটর্স এসোসিয়েশন এ্যাওয়ার্ড, ১৯৯১ সালে বাংলাদেশ স্পোর্টস জার্নালিজম এসোসিয়েশন এ্যাওয়ার্ড, ২০১৮ সালে ইউনিসেফ গুডউইল এ্যাম্বাসেডর সহ প্রভৃতি পুরস্কারে ভূষিত হন। লিনু জানান, সবমিলিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় একক এবং দৈ¦ত সহ ১৫০ এরও অধিক টেবিল টেনিসের চ্যাম্পিয়ন এ্যাওয়ার্ড তার ঝুলিতে রয়েছে।

আন্তর্জাতিক অর্জন
দেশের বাইরে অনেক আন্তর্জাতিক টেবিল টেনিস প্রতিযোগিতায় জোবেরা রহমান লিনু অংশগ্রহণ করেছেন। এর মধ্যে চীন, যুক্তরাজ্য, উত্তর কোরিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত, নেপাল, পাকিস্তান, সিঙ্গাপুর, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, ফ্রান্স, জামার্ন, সুইজারল্যান্ড, ইতালি, স্পেন, পর্তুগাল, নেদারল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, মালয়েশিয়া, ভিয়েনা, স্লোভেনিয়া, ইউএই, ভূটান, মিশর সহ প্রভৃতি দেশে তিনি আন্তজার্তিক টেবিল টেনিস প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেছেন। এর মধ্যে ১৯৮০ সালে কলকাতায় অনুষ্ঠিত এশিয়ান টেবিল টেনিস চ্যাম্পিয়নশীপে তিনি ৫ম স্থান অর্জন করেন। ১৯৮২ সালে ভারতের হায়দ্রাবাদে পেন্টানগুলার টেবিল টেনিস চ্যাম্পিয়নশীপ প্রতিযোগিতায় জোবেরা রহমান দ্বৈত এবং দলগত রানার্সআপ হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। এছাড়াও তিনি ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার রজতজয়ন্তী উপলক্ষে বাংলাদেশ ট্যোবাকো কোম্পানি (ইঞঈ) আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হন।
এত অর্জনের পরও লিনুর পথচলা কিন্তু সহজ ছিল না। ১৯৯৬ সালের দিকে একবার খেলা ছেড়ে দিতে চেয়েছিলেন। নতুন প্রজন্মের খেলোয়াড়দের সাথে প্রতিযোগিতা সহ নানা কারণে আর পেরে উঠছিলেন না তিনি। কিন্তু তারই এক সহকর্মী ইশতিয়াক আহমেদের পরামর্শে খেলায় থেকে গেলেন। লিনু জানান, ইশতিয়াক আহমেদ বলেছিলেন, লিনু তুমি আর একবার চ্যাম্পিয়ন হলে গিনেস বুক ওয়ার্ল্ডে তোমার নাম উঠবে, এটা তোমার জন্য যেমন গৌরবের তেমনি দেশের জন্যও অনেক সম্মানের। এ প্রসঙ্গে কৃতি এ ক্রীড়াবিদ বলেন, তার অনুপ্রেরণায় আমি খেলায় আবার পূর্ণ মনোযোগ দেই। ২০০১ সাল পর্যন্ত আমি রেকর্ড ১৬ বার জাতীয় টেবিল টেনিস প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করি। পরে আমারই এক সহকর্মী হেলাল উদ্দিন আহমেদ আমার রেকর্ডগুলো গিনেজ বুক কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠালেন। এরপর তো তারা আমাকে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে ২০০২ সালে গিনেস বুক ওয়ার্ল্ডের স্বীকৃতি দেয়।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মনোবিজ্ঞানে মাস্টার্স করা জোবেরা রহমান লিনু জীবনে এ পর্যায়ে আসতে তার বাবাকেই অনুপ্রেরণা হিসেবে পেয়েছেন। তার বাবা ইঞ্জিনিয়ার মরহুম শেখ আব্দুর রহমান তাকে সবসময় খেলার জন্য অনুপ্রেরণা যোগাতেন, খেলায় নিয়ে যেতেন, খেলাটা শিখাতেন। তিনি বলেন, আমার পরিবারই ছিল একটি স্কুল। সেখানে বাবা এবং মায়ের কাছ থেকেই অনেক কিছু শেখতাম।
জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এত সম্মাননা, এত অর্জন পেলেও তাঁর বিশাল অভিজ্ঞতাকে বাংলাদেশ জাতীয় টেবিল টেনিস ফেডারশনে কাজে লাগাতে পারেন নি বলে অভিযোগ করেন দেশের অন্যতম সেরা এই ক্রীড়াবিদ। ২০১৩-১৪ সালের দিকে ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পেলেও কোন এক অজানা কারণে কয়েকমাসের মধ্যে নতুন এক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সে কমিটিতেও সমঝোতার ভিত্তিতে তার পছন্দনীয় পদ না দেয়ায় অভিমান করে ফেডারেশন থেকে পদত্যাগ পত্র জমা দিয়ে দেন। এরপর থেকে তার ভালোবাসার এই জায়গাটিতে খুব একটা যোগাযোগ নেই বলে জানান দেশের বিখ্যাত এই টেবিল টেনিস খেলোয়াড়।
আলাপচারিতার এক প্রশ্নের জবাবে জোবেরা রহমান লিনু বলেন, প্রবাসী বাংলাদেশিরা আমাদের অনেক বড় সম্পদ। কষ্ট করে তারা যে ডলার, রিয়াল দেশে পাঠান তা তাদের পরিবারের যেমন উপকার করছে তেমনি আমাদের অর্থনীতিতেও অনেক বড় ভূমিকা রাখছে। তিনি বলেন, আমি অনেক দেশ ঘুরেছি, কাছ থেকে প্রবাসীদের কষ্ট দেখেছি। তাই প্রবাসীদের স্বার্থ রক্ষায় আমাদের কাজ করা উচিত।
বর্তমানে আপনার সময় কিভাবে কাটছে? এর জবাবে লিনু জানান- পত্রিকা পড়া, বই পড়া, লেখালেখি এবং কিছু স্বেচ্ছাসেবীমূলক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাথে বিভিন্ন কাজে সময় কাটে আমার। তিনি জানান, তার লেখা ৪ টি বই প্রকাশিত হয়েছে। তিনটি উপন্যাস একটি কবিতাগুচ্ছ। ইতিমধ্যে তার লেখা ৫টি নাটক নিজের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান লিনুস ড্রিমের ব্যানারে অনএয়ার হয়েছে বলেও জানান।
ভ্রমণপ্রিয় এই গুণী ক্রীড়াবিদ জানান, দেশে এবং দেশের বাইরে ঘুরতে অনেক ভালোবাসেন। ক্যারিয়ার জীবনে অনেক দেশে খেলতে গেলেও বর্তমানেও সময় পেলেই তিনি এশিয়া, আমেরিকা এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ঘুরতে চলে যান।