ইসরাত জেবিন
স্থাপত্য শিল্পের অদ্ভুত সুন্দর কিছু উদাহরণ হল মাইমেটিক ভবন। কোন কিছুর অনুকরণে তৈরি করা হয় বলেই এই ভবন বা বিল্ডিংগুলোকে মাইমেটিক ভবন বা মাইমেটিক বিল্ডিং বলা হয়। ইংরেজি শব্দ “গরসরপ” থেকে “Mimetic” শব্দ এসেছে। কাজের সাথে মিল রেখেই ডিজাইন করা হয় এই বিল্ডিংগুলোর। মাইমেটিক আর্কিটেকচার কে ‘Novelty’ বা ‘Programmatic’ আর্কিটেকচারও বলা হয়। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রে এ ধরনের বিল্ডিং বেশ জনপ্রিয়তা পায়। বিশেষ করে ১৯২০ সাল থেকে ১৯৫০ সালের মাঝে যখন যুক্তরাষ্ট্রে গাড়ির ব্যবহার বাড়ে। সেই সাথে বৃদ্ধি পায় গাড়ি চলাচলের উপযোগী রাস্তা। তখন বিভিন্ন ব্যস্ত রাস্তার পাশে গড়ে ওঠে নানা ডিজাইনের মাইমেটিক রেস্টুরেন্ট। ১৯৫০ সালের পর এ ধরনের আর্কিটেকচারের জনপ্রিয়তা কমতে শুরু করে ফলে অনেক মাইমেটিক বিল্ডিং তখন ভেঙ্গে ফেলা হয় বা নতুন করে সংস্কার করা হয়। তবে বিশ্বজুড়ে এখনও আছে নানা মাইমেটিক ভবন যা এখনও মানুষের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু।
মাইমেটিক বিল্ডিং নিয়ে করা প্রবাস মেলা’র ধারাবাহিক প্রতিবেদনের প্রথম পর্বে আপনাদের জানাবো “বাস্কেট বিল্ডিং” বা “ঝুড়ি বিল্ডিং” এর নানা মজার তথ্য।
দি লঙ্গাবার্গার কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা জে ডব্লিউ লঙ্গাবার্গার ১৯১৯ সালে শিক্ষানবিশ হিসেবে ঝুড়ি বানানোর কাজ শুরু করে দি ড্রেসডেন বাস্কেট ফ্যাক্টরিতে। সেখানে কাজের পাশাপাশি ঘরে বসেও ঝুড়ি তৈরি করতেন তিনি। এ কাজে তাকে সাহায্য করতেন স্ত্রী বনি জিন লঙ্গাবার্গার। এ থেকে প্রাপ্ত আয় আর নিজেদের জমানো অর্থ দিয়ে তারা শুরু করেন তাদের নিজস্ব ব্যবসা। ঝুড়ি আর নানা ধরনের গৃহস্থালি পণ্য তৈরি করতেন তারা। তাদের এই পারিবারিক ব্যবসা আরও বৃদ্ধি পায় তাদের সন্তান ডেভ লঙ্গাবার্গারের হাতে। যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও অঙ্গরাজ্যের নিয়ার্কে ছিল কোম্পানির প্রধান কার্যালয়। লঙ্গারবার্গ কোম্পানির সবচেয়ে জনপ্রিয় পণ্য হল মিডিয়াম মার্কেট বাস্কেট; সবচেয়ে বেশি বিক্রিও হত এটি। তাই ডেভ ঠিক করেন লঙ্গাবার্গার হেডকোয়ার্টার হবে ঝুড়ি আকৃতির। যেমন ভাবা তেমনি কাজ। ১৯৯৭ সালে দি লঙ্গাবার্গার কোম্পানি উদ্বোধন করে তাদের ঝুড়ি আকৃতির হেডকোয়ার্টার।
দি লঙ্গারবার্গ এর হেডকোয়ার্টারের আকার-আকৃতি আসলেই হুবহু তাদের পণ্য ‘মিডিয়াম মার্কেট বাস্কেট’ এর মত। দূর থেকে দেখলে মনে হয় বড়সড় একটা ঝুড়ি বুঝি কেউ ওখানে রেখে গেছে। তবে সাত তলা এই ভবনটি আয়তনে সত্যিকার ঝুড়ির তুলনায় প্রায় ১৬০ গুণ বড়। ‘দ্য বাস্কেট বিল্ডিং’ নামে পরিচিত এ ভবনটি স্টিল কাঠামোতে তৈরি। ভবনটির উপরের ছাদটি কাচের। উপর তলা থেকে ঝুড়ির হাতলগুলোও দেখা যায়। শুধুমাত্র এর হাতল দুটির ওজনই ১৫০ টন। শীতকালে হাতলদুটিকে বৈদ্যুতিক উপায়ে গরম করার ব্যবস্থা আছে, যেন এতে তুষার জমতে না পারে। ১৮৫,০০০ স্কয়ার ফুট আয়তনের এই বিল্ডিংটি ডিজাইন করে NBBJ এবং Korda/Nemeth Engineering।
বিশাল ভবন জুড়ে একসময় চলত ঝুড়ি তৈরি, বিপণন আর হিসাবনিকাশের কাজ। এছাড়াও চলতো কোম্পানির প্রচারের কার্যক্রম, দেয়াল জুড়ে টানানো থাকতো বিভিন্ন পেইন্টিং; ছিল একটি লাইফ স্টাইল ম্যাগাজিনের অফিস আর পরিবেশকদের জন্য নির্ধারিত কার্যক্রম। তবে এসবই এখন অতীত। বিগত কয়েক বছরে তাদের পণ্য বিক্রির হার কমে যাওয়ায় আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হওয়ায় ২০১৬ তারা তাদের হেডকোয়ার্টার সরিয়ে নিয়ে যায় ওহাইও এর Frayeyburg এ। সেই থেকে খালি পড়ে ছিল বিশাল এই ঝুড়ি বিল্ডিং। এরপর থেকে এর দায়িত্বে ছিল ডালাসের JRJR Networks। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরের শেষ দিকে এটি কিনে নেয় ওহাইও এক ডেভেলপার কোম্পানির মালিক স্টিভ কুন। ১.২ মিলিয়ন ডলারে তিনি কিনে নেন এই বিশাল বাস্কেট বিল্ডিং। এর ২১ একর প্রোপ্রার্টি Coon Restoration and Sealants এবং Sandvick Architects এখন এক সাথে কাজ করছে নতুন করে এই বিল্ডিংটি সাজিয়ে তোলার জন্য। তাদের এই প্রজেক্ট সম্পর্কে বিস্তারিত জানা না গেলেও এটুকু নিশ্চিত হওয়া গেছে বিল্ডিংটির “ঝুড়ি আকৃতি” অক্ষুন্ন রেখে নতুন করে ঢেলে সাজানো হবে সব কিছু। হয়তো খুব দ্রুতই আবার প্রাণচাঞ্চল্যে ভরে উঠবে “বাস্কেট বিল্ডিং” তবে নতুন ধাঁচে, ভিন্ন আঙ্গিকে।
(তথ্যসূত্র, ইন্টারনেট)