আশরাফ মাসুদ, প্রবাস মেলা ডেস্ক: অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন এবং পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাত করেছেন ‘প্রবাস মেলা’ পত্রিকা’র উপদেষ্টা মামুন ইমতিয়াজ। সঙ্গে ছিলেন পত্রিকার রিপোর্টার আশরাফ মাসুদ। সম্প্রতি বাংলাদেশ সচিবালয়ে তাদের এ সৌজন্য সাক্ষাত হয়। এ সময় সমসাময়িক নানা বিষয়ে আলোচনার এক ফাঁকে সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের হাতে ‘সম্মাননা স্মারক’ ক্রেস্ট উপহার হিসেবে তুলে দেওয়া হয়। তিনি দীর্ঘদিন ধরে সাহসিকতার সাথে দেশের জলবায়ু ও পরিবেশ রক্ষায় কাজ করে চলেছেন। এমনকি ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের চোখ রাঙানিতেও তিনি তাঁর কর্ম থেকে থেমে থাকেন নি। এজন্যে তার ব্যক্তিগত এবং পারিবারিক জীবনেও অনেক মূল্য দিতে হয়েছে। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের সময়েও বীরত্বপূর্ণ সাহসী ভূমিকা রাখায় প্রবাস মেলা’র পক্ষ থেকে এ ‘সম্মাননা স্মারক’ প্রদান করা হয়।
সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বাংলাদেশের একজন খ্যাতিমান পরিবেশবাদী ও আইনজীবী। তিনি বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে পরিবেশ রক্ষায় কাজ করে আসছেন। ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট তিনি বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন এবং পরদিন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার দায়িত্ব নেন। একই বছরের ১৬ আগস্ট তিনি পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার দায়িত্বও লাভ করেন।
সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান একজন পরিবেশবিদ হিসেবে, বাংলাদেশের জাহাজ ভাঙা শিল্পের জন্য প্রবিধানের ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করেন। ২০০৯ সালে এ কাজের জন্য তিনি বাংলাদেশ সরকারের বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের ‘পরিবেশ পুরস্কার’ এবং প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে ‘গোল্ডম্যান পরিবেশ’ পুরস্কারে ভূষিত হন। ২০০৯ সালে তিনি টাইম সাময়িকীর ‘হিরোজ অব এনভায়রনমেন্ট’ খেতাব লাভ করেন। ২০১২ সালে তিনি ফিলিপাইনভিত্তিক ‘রামোন ম্যাগসেসে’ আন্তর্জাতিক পুরস্কারে ভূষিত হন।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের এই উপদেষ্টা ১৯৬৮ সালের ১৫ জানুয়ারি ঢাকার ধানমন্ডিতে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতৃনিবাস হবিগঞ্জের নরপতি হাভেলি নামক একটি বাঙালি মুসলিম জমিদার পরিবারে। তার বাবা সৈয়দ মহিবুল হাসান, মা সুরাইয়া হাসান।
সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে মাধ্যমিক পাস করেন। এরপর হলিক্রস কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। বিশ্ববিদ্যালয়ে লোকপ্রশাসন বিভাগে ভর্তি হলেও আইন বিষয়ের প্রতি আগ্রহ থেকে পরবর্তীতে বিভাগ পরিবর্তন করে আইন বিভাগে ভর্তি হন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে স্নাতক এবং ১৯৯৩ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৯৩ সালে এলএলএম সম্পন্ন করার পর বাংলাদেশের বাইরে বেশ কয়েকটি ফেলোশিপ কোর্স সম্পন্ন করেছেন। ২০০৭ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্র থেকে ‘আইজেনহাওয়ার ফেলোশিপ’ লাভ করেন।
শিক্ষাজীবন শেষে ১৯৯৩ সালের জুলাইয়ে তিনি বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতি’তে (বেলা) যোগ দেন। তার এক বছর আগে বেলা ১৯৯২ সালে মাত্র যাত্রা শুরু করেছিলো। এরপর ১৯৯৭ সালে বেলা’র সংগঠক ও প্রধান মহিউদ্দিন ফারুক মৃত্যুবরণ করলে রিজওয়ানা ‘কমনওয়েলথ বৃত্তি’র সুযোগ হাতছাড়া করে বেলা’র ‘প্রধান নির্বাহী’র দায়িত্ব নেন। বেলা’র হয়ে তিনি পরিবেশের ক্ষতিসাধনকারী নানা চক্র আর ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন। ১৯৯৪ সালে ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের মেয়র নির্বাচনের সময় প্রার্থীরা পুরান ঢাকায় অন্যায়ভাবে ১৮৬০ সালের পরিবেশ আইন লঙ্ঘন করে প্রচারকাজ চালাচ্ছিলেন। বেলা’র মাধ্যমে জনস্বার্থে আদালতে মামলা করে রিজওয়ানা একটি মাইলফলক তৈরি করেন। আদালত এই কাজকে জনস্বার্থের বিপরীত বলে তাঁর পক্ষে রায় দেন। তারপর থেকে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের নির্বাচনী প্রচারণায় পরিবেশের জন্য হুমকিস্বরূপ এজাতীয় কাজ বন্ধে উদ্যোগ নেয়া হয়। এরপর তিনি জাহাজ ভাঙা শিল্পের মাধ্যমে পরিবেশের বিপর্যয় ডেকে আনা ব্যবসায়ীদের বিপক্ষেও প্রতিবাদ করেন।
তিনি বেলা’র মাধ্যমে ২০০৩ সালে জাহাজ ভাঙা ইয়ার্ডগুলোর বিরুদ্ধে প্রথম মামলা করেন- এই শিল্পে নিয়োজিত শ্রমিকদের কর্মপরিবেশের নিরাপত্তাহীনতা, শ্রমিকদের স্বাস্থ্য নিরাপত্তাহীনতা, এ শিল্প থেকে যথেচ্ছ বর্জ্য নিঃসরণ ইত্যাদি কারণে। এরপর শ্রমিকদের অধিকার আদায়ে, বিষাক্ত পণ্যবাহী জাহাজ বাংলাদেশে প্রবেশ বন্ধে তিনি আরও তিনটি মামলা দায়ের করেন। ২০০৩ সালের মার্চে আদালতের রায়ে ‘পরিবেশগত ছাড়পত্র’ ছাড়া জাহাজ ভাঙার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা জারি হয়। এছাড়াও জলাশয় ভরাট করে আবাসন তৈরি, পলিথিনের যথেচ্ছ ব্যবহার, পাহাড় কাটা, বন ধ্বংস, চিংড়ির ঘের, সেন্টমার্টিনস দ্বীপে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ বন্ধ ইত্যাদি নানা ক্ষেত্রে যেখানেই পরিবেশের ক্ষতি সাধিত হচ্ছে বা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, সেখানেই তিনি এবং তার নেতৃত্বে বেলা পরিবেশ রক্ষায় আইনিভাবে এগিয়ে এসেছে।
সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বেলা’র প্রধান নির্বাহী ছাড়াও ফেডারেশন অব এনজিওস ইন বাংলাদেশের সহ-সভাপতি এবং এনজিও আরডিআরএস-এর সভাপতি। এছাড়া তিনি ‘নিজেরা করি’ সংগঠন ও অ্যাসোসিয়েশন অব ল্যান্ড রিফর্মস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টেরও একজন সদস্য। বেসরকারি এসব কাজ ছাড়াও তিনি সরকার কর্তৃক গঠিত বিভিন্ন কমিটির সদস্য। এছাড়া তিনি আন্তর্জাতিকভাবে ‘ফ্রেন্ডস অব আর্থ ইন্টারন্যাশনাল’র নির্বাহী সদস্য; এনভায়রনমেন্টাল ল অ্যালায়েন্স ওয়ার্ল্ডওয়াইড এবং এনভায়রনমেন্টাল ল কমিশন অব দ্য আইইউসিএনেরও সদস্য।