কামরুল আহসান:
বিলাত ফেরত ডাক্তার কথাটি ছোট বেলা থেকে শুনে আসছি উত্তম-সুচিত্রার ছবির কল্যাণে। বিলেতি ডিগ্রি না থাকলে আবার কিসের ডাক্তার! বড় হয়ে ডাক্তার হবো এমন মনোবাসনা কস্মিনকালেও ছিলো না। কোনদিন Aim in Life রচনাতেও লিখিনি বড় হয়ে ডাক্তার হবো। সেই আমি কি করে যেন ডাক্তার হয়ে গেলাম। কিন্তু বিলেতি ডিগ্রির কী হবে! খোঁজ নিয়ে দেখি ডিগ্রির জন্য এখন কেউ তেমন বিলেত টিলেত যায় না। দেশেই ভুরি ভুরি ডিগ্রি পাওয়া যায়। দেখে-শুনে আমিও একটা নিয়ে নিলাম। তিন যুগ বিদ্যাদেবীর কঠোর তত্ত্বাবধানে থেকে পড়াশোনার পাট না হয় চুকালাম, এখন চাকরি-বাকরি না হলে পেট চালাই কি করে। তাও একটা জোগাড় হলো। দিন যায়, মাস যায় চাকরির বয়স বাড়ে, সাথে নিজেরও। কিন্তু বুদ্ধিশুদ্ধি বাড়ে না – না বৈষয়িক না দাপ্তরিক। চারিদিকে সবাই কেমন বিলেত না হোক, বিদেশ যাচ্ছে সরকারি পয়সায়, জ্ঞানার্জন করছে দেদারসে আর আমি বসে বসে মশা-মাছি তাড়াই। মাত্র দেড় যুগ কলম পিষার পর আমার কপালেও জুটলো বিদেশ ভ্রমণ। বাক্সপেটরা গুছাচ্ছি এমন সময় ছেলে এসে বললো, আমার জন্য ফিজেট স্পিনার নিয়ে আসবা। বললাম, বাবা কী জিনিস এটা? উত্তর না দিয়ে চলে গেলো, ফিরেও এলো প্রায় সাথে সাথেই। দেখি হাতে একটা কাগজ, পেন্সিল দিয়ে কিছু একটা আঁকা। দেখিয়ে বললো এই জিনিস আনবা। নিজেই ব্যাগে ঢুকিয়ে দিলো, পাছে ভুলে যাই। বাবার অজ্ঞতায় মেয়ে মনে হয় আস্থা হারিয়েছে। তার আবদার করার ইচ্ছাই মনে হয় উবে গেছে। ওদিকে অর্ধাঙ্গিণী তো রেগে অগ্নিশর্মা, হিস্যাতো আধাআধি, তবে আমি একা কেন যাই!

দেশের ভ্রমণ পিপাসু আর বিনোদন পিয়াসীদের অনায়াসসাধ্য গন্তব্য দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ থাইল্যান্ড। অনেকে কেনাকাটা কিংবা ব্যবসার কারণেও এখানে আসেন। সংখ্যায় অল্প হলেও পড়াশোনা করতে আসেন কেউ কেউ। ইদানীং উল্লেখযোগ্য হারে আগমন ঘটে চিকিৎসা নিতে। দেশটা যেখানে থাইল্যান্ড, সেখানে চিকিৎসার পাশাপাশি ঘুরে বেড়ানো আর বিনোদনের উপায় খোঁজেন সবাই। ঠিক এ ব্যাপারটার বাণিজ্যিক রূপদানে সৃষ্টি হয়েছে মেডিকেল ট্যুরিজমের। ট্যুরিজমের বিভিন্ন শাখার মধ্যে এটি অন্যতম। আমাদের দেশের পরিপ্রেক্ষিতে মেডিকেল ট্যুরিজমে এগিয়ে আছে ভারত, থাইল্যান্ড ও সিংগাপুর। কালিনারি ট্যুরিজম বলে আরেকটি শাখা আছে ভোজনরসিকদের জন্য। কালিনারি ট্যুরিস্টরা পৃথিবীর তাবৎ দেশ ঘুরে বেড়ায় রসনাতৃপ্ত করতে। থাই খাবারের খ্যাতি বিশ্বজোড়া। হঠাৎ এক সুযোগ এলো আমার- থাইল্যান্ড ভ্রমণের সরকারি ব্যবস্থাপনায়। উদ্দেশ্য থাইল্যান্ডের বিভিন্ন হাসপাতাল পরিদর্শন এবং সে দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা সম্পর্কে জানা। কিন্তু কোনভাবেই এ সফরকে মেডিকেল ট্যুরিজম আর কালিনারি ট্যুরিজমের মিশেলে অন্য নাম দিতে পারলাম না। যাই হোক মাহেন্দ্রক্ষণ এল, উড়াল দিলাম।

এ সফরে আমাদের নলেজ পার্টনার এশিয়ান ইন্সটিটিউট অফ টেকনোলজি যা AIT নামে বেশি পরিচিত। নলেজ পার্টনার কথাটা এক্ষেত্রে যুক্তিযুক্ত না হলেও, কর্পোরেট কালচারের গ্যাঁড়াকলে পড়ে এটাই মাথায় এলো। আসলে বলা উচিত ছিলো কোর্স পরিচালনার দায়িত্বভার ছিলো AIT এর উপর। পেশাদারিত্বের চরম পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছিলো তারা পুরোটা সময় জুড়ে। একটি পাবলিক মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (কিং চুলালংক্রন মেডিকেল ইউনিভার্সিটি), একটি বেসরকারি মেডিকেল ইউনিভার্সিটি (থামাসার্ট মেডিকেল ইউনিভার্সিটি), একটি প্রাইভেট হাসপাতাল (সামিতিভেজ শ্রীরাচা জাপানিজ হাসপাতাল), একটি জেলা পর্যায়ের হাসপাতাল (ডোয়েমবাং নাং বুয়াট হাসপাতাল) এবং একটি ইউনিয়ন পর্যায়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্র পরিদর্শন করার সুযোগ হয়েছিলো। মাঝে মাঝে তাত্ত্বিক ক্লাস। এমন টাইট শিডিউল যে দিনের বেলা অন্য কিছু করার সুযোগ নেই।
কিন্তু দেশটা যে থাইল্যান্ড। আর কিছু না হোক কেনাকাটা আর পেটপূজায় নিজে সঁপে না দিলে কিসের কী! কী বলবো দেশে গিয়ে! দশদিনের সফরে গিয়ে তো আর ডিগ্রি পাবো না। তায় যদি ঘুরেফিরে না দেখি আর অথেনটিক থাই খাবারে না মজি, তো বৃথাই বুঝি এলাম। কপালের নাম গোপাল। কেন বলছি! শুনুন তবে।
সফর সময়টা পড়েছে মে-জুন জুড়ে। বিদেশ ভ্রমণে সময় নির্বাচনটা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ভ্রমণস্থানের আবহাওয়া পর্যটকবান্ধব কি না, সেটা বিবেচনায় রাখতে হয়। দক্ষিণ এশিয়ার দেশ থাইল্যান্ড চরমভাবাপন্ন নয়। এ কারণে বছরের যেকোন সময় ঘুরতে যাওয়ার পরিকল্পনা করা যায়। বাংলাদেশের মে-জুন আর থাইল্যান্ডের মে-জুন বরাবর। তাপমাত্রা-আর্দ্রতা কাছাকাছি। পৃথিবীর সব দেশেই গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ঋতু একই থাকে, অর্থাৎ বাংলাদেশের ডিসেম্বর-জানুয়ারি সব সময়েই শীতকাল। কিন্তু হিজরি সালের মাসগুলো চাঁদ দেখার উপর নির্ভরশীল। তাই হিজরি মাসগুলো ঋতু পরিবর্তনের সাথে পরিবর্তিত হয়। অর্থাৎ হিজরি মাসগুলো গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের মাসের সাথে একই রকম থাকে না। আমরা যেবার গেলাম, সেবার জুন-জুলাইতে রমজান মাস পড়েছে। তাও আবার রমজানের প্রথম দিন। সংযমের মাসে বিনোদন আর কালিনারি স্বর্গরাজ্য থাইল্যান্ডে পা রাখলাম। কোথায় রইলো অথেনটিক থাই খাবার আর কোথায় রইলো বিনোদন!

ভোর রাতে সেহেরি খেয়ে আর ঘুমালাম না। সকাল ১১টায় ফ্লাইট। একটা উবার নিয়ে ৭টায় রওনা হলাম এয়ারপোর্টে। পারিবারিক গাড়ি নিজে চালাই। আমাকে চালিয়ে নেবে কে? তাই ভাড়ার গাড়িই ভরসা। রমজান মাসের প্রথম দিন যাবে যাতায়াতে। পুরো ১০ দিন কাটাতে হবে কালিনারি স্বর্গ থাইল্যান্ডে। এ না হলে কপাল! প্লেনে কত কী খেতে দেয়। আশেপাশের এ খায়, ও খায়। আমরা সংযমের কথা ভেবে পেটে পাথর বাঁধি। খাবার দাবার যা দিলো, বগলদাবা করে নিলাম- এছাড়া উপায় কী! ফ্লাইট ডিলের চূড়ান্ত বদনাম থাকা সত্ত্বেও, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ঠিকঠাক উড়াল দিয়ে সঠিক সময়ে নামিয়ে দিলো সুবর্ণভূমিতে। কিছু ডলার পরিবর্তন করে থাই বাথ নিতে চাইলাম। মোহাম্মদ আলী ভাইয়ের পরামর্শ চাইলাম। বললেন, এখানকার এক্সচেঞ্জ রেট ভালো নিতে পারেন। দ্বিধান্বিত মনে কিছু পরিবর্তন করলাম। পরে বুঝেছিলাম এখানকার রেট বেশ কম। থাই ভ্রমণে বেশ কয়েকবার ডলার পরিবর্তন করতে হয়েছে। এখানকার মানি চেঞ্জারগুলোতে একেক ধরনের রেট। এমনকি কাছাকাছি দুটি চেঞ্জারে রেটের বিস্তর ফারাক। যদিও ভালো রেট দেয় এমন একটি চেঞ্জারের খোঁজ পেয়েছিলাম এবং তার স্যুতা পেয়েছিলাম পরেরবারের ভ্রমণেও।
এয়ারপোর্টের মুসাবিদার সময়ক্ষেপন শেষে যখন গন্তব্যে পৌঁছলাম, সূর্য তখন অস্তাচলে। দ্রাঘিমান্তর হওয়ায় দুই ঘন্টার সুবিধা পেলাম। সন্ধ্যা গড়াতে গাড়ি থামলো হোটেলের পোর্টিকোতে। হোটেল অ্যাম্বাসেডর। থাই ফেরতাদের মুখে এ হোটেলের নাম এতো শুনেছি যে, এক সময় মনে হয়েছিলো সারা ব্যাংককে আমাদের (বাংলাদেশিদের) জন্য একটা হোটেলই বরাদ্দ। আর এর সাথে অবধারিতভাবে সুকুমভিতের কথা চলে আসে। সুকুমভিত কী তা বুঝি বা আলাদা করে না বললেও চলবে। কেউ কেউ তো হোটেলের পুরো ঠিকানাই মুখস্থ বলতে পারে। হোটেল লবিতে AIT কর্তৃপক্ষ আমদের স্বাগত জানালেন। এখানকার থাই কর্তৃপক্ষের সাথে একটা বাংলাদেশি ছেলে ছিলো আমাদের পরিচয় পর্ব সহজ করার জন্য। বুঝতে পারলাম সে AIT এর এমপ্লয়ি। প্রথম এবং শেষ দিনে কয়েক ঘন্টার জন্য তার দেখা পেয়েছিলাম আমরা। কথা বলতে গিয়ে টের পেলাম সে কিছুটা নাক উঁচু স্বভাবের। বিদেশ বিভূঁয়ে কোথায় মানুষ দেশি কাউকে পেলে উল্লসিত হয়, সে দেখলাম বেশ বিরক্ত। তবে একটা কাজের জন্য তার বিরক্তিপূর্ণ আচরণ গায়ে মাখিনি। সেটা হলো একটা ভালো মানি এক্সচেঞ্জারের সন্ধান দেয়া। সে নিজে আমাকে নিয়ে জায়গাটা দেখিয়ে দিয়েছিল। বাসু এন্ড কোং, সুকুমভিতের নানা স্টেশন লাগোয়া। এখানকার এক্সচেঞ্জ রেট আসলেই বেশ ভালো। তাই বেশ ভীড় এখানে। রীতিমতো লম্বা লাইনে দাড়িয়ে মুদ্রা পরিবর্তন করতে হয়।
ইফতারের দেশের সময়ের দুই ঘন্টা আগে পৌঁছালেও, পেটে তখন ছুঁচো নাচছে। AIT কর্তৃপক্ষ জানতো আমরা রোজা। ইফতারের আয়োজন করাই ছিলো- শুধু আমাদের খাওয়ার অপেক্ষা। লম্বা টেবিলে খাবার সাজানো ১৫ জনের জন্য। হোটেলের যে রেস্টুরেন্টটিতে ইফতারের করা হয়েছে, সেটা ব্যুফে স্টাইলের। এখানে হালাল খাবার সার্ভ করা হয়। ঠিক এর পাশেই সুশিবার- জাপানী ক্যুইজিনের আয়োজন আর বিপরীত দিকে নন হালাল খাবারের ব্যবস্থা। আমাদের জন্য আলাদা চেয়ার টেবিলে বসে খাবার ব্যবস্থা করা হয়েছে ইফতার বলে। দূরদর্শী আয়োজক কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনায় মুগ্ধ হলাম। খাবারের আইটেমে আমাদের ইফতারে প্রচলিত কিছু নেই। আবার অথেনটিক থাই খাবারও না। পাঁচ তারকা হোটেলের খাবারের থাই ভার্সন। অভুক্ত বলে অমৃতই লাগলো। আবার টের পেলাম Hunger is the best appetizer. মনকে প্রবোধ দিলাম, কালিনারি রাজ্যে উপোষী থাকার খেদ রাখিস না মনা। ইফতার আর সেহেরি তো আছেই, তখন পেট পুরে খাইস।
ইফতার শেষে আগে থেকে নির্ধারিত রুমে বাক্স-পেটরা সমেত চলে এলাম। প্রতিটি রুমে দু’জন করে। আমার রুমমেট দিদার ভাই। আমাদের এ ভ্রমণের বয়োজেষ্ঠ ব্যক্তি এবং টিম লিডার। দিদার ভাই কার্ডিওলজিস্ট, নিপাট ভদ্রলোক, চুপচাপ এবং রসিক। আমরা একই মেডিকেল কলেজের ছাত্র। বয়সে উনি ৮ বছরের বড়, পরিচয়ও দীর্ঘ দিনের কিন্তু কখনো তুমি করে বলেন নি। দশদিনের ভ্রমণে মাঝে একবার হোটেল পরিবর্তন করতে হয়েছিলো পাতায়াতে। সেখানেও দিদার ভাই ছিলেন আমার রুম মেট। আমাদের ভ্রমণসঙ্গী হিসেবে যারা ছিলেন, তাদের কয়েকজনের থাইল্যান্ড ভ্রমণের অভিজ্ঞতা থাকলেও মোহাম্মদ আলী ভাইয়ের অভিজ্ঞতা ভিন্ন। উনি এদেশে পোস্ট গ্রাজুয়েশন করেছেন ডারমাটোলজিতে। সে হিসেবে এক বছরের অধিক সময় উনি এখানে কাটিয়েছেন। এক সময় থাই ভাষা পারলেও সময়ের ফেরে বেশির ভাগই ভুলেছেন। পথ চলতে লাগে এমন দু একটা শব্দ আমরা সুযোগমতো জেনে নিতুম।
(বাকী অংশ আগামী সংখ্যায়…)
লেখক: সহকারি অধ্যাপক, শহীদ তাজউদ্দিন আহমেদ মেডিকেল কলেজ, গাজীপুর।