ওয়াসীম আকরাম, বৈরুত, লেবানন প্রতিনিধি: দীর্ঘ সাড়ে চার বছর দায়িত্ব পালন শেষে দেশে ফিরে যাচ্ছেন “প্রবাসী বান্ধব” উপাধী পাওয়া রাষ্ট্রদূত আবদুল মোতালেব সরকার। এ উপলক্ষে রাষ্ট্রদূতকে বিদায় জানাতে এক বিশাল গণ- সংবর্ধনার আয়োজন করে লেবানন প্রবাসী বাংলাদেশিরা।
১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০, রবিবার লেবাননের রাজধানী বৈরুতে আল কোলায় হোটেল রেষ্ট প্যালেসে স্থানীয় সময় সকাল ১১টায় পবিত্র কুরআন তেলাওয়াতের মধ্য দিয়ে এই সংবর্ধনা অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হয়।
লেবাননের কমিউনিটি নেতা মশিউর রহমান টিটুর সঞ্চালনায় প্রধান অতিথি হিসেবে ছিলেন বাংলাদেশ সরকারের নিযুক্ত বৈরুত দূতাবাসের রাষ্ট্রদূত আব্দুল মোতালেব সরকার। এতে সভাপতিত্ব করেন আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার সিরাজুল ইসলাম।

বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, দুতাবাসের প্রধান সচিব (শ্রম) দূতালয় প্রধান আবদুল্লাহ আল মামুন, দূতাবাসের তৃতীয় সচিব আবদুল আল সাফি, আমেরিকান ইউনিভার্সিটির সহকারী অধ্যাপক ইয়াজ উদ্দিন আহম্মদ।
রাষ্ট্রদূতের বক্তব্য বলেন, বিগত সাড়ে চার বছরে আপনাদের মাঝে এখানে অনেক বক্তব্য রেখেছি। আজ শেষবারের মত আমি আপনাদের মাঝে হাজির হয়েছি। শেষ মূহুর্তে হলেও আপনাদের সবাইকে একত্রিত দেখে আমি খুবই আনন্দিত ও গর্বিত। আজকে সবাই আমাকে যেই সম্মান দেখিয়েছেন সেটা কোনদিন ভুলতে পারবনা। আমি সর্বাত্মক চেষ্টা করেছি আপনাদের সেবা দিতে জানিনা কতটুকু সেবা দিতে পেরেছি।
মানব সেবা করা সবার ভাগ্যে জুটেনা। আল্লাহর অশেষ মেহেরবানীতে আমি এ সুযোগটা পেয়েছিলাম। আমি সবর্দা চেষ্টা করেছি আপনাদের সমস্যা সমাধানের কিন্তু জানিনা সফল হতে পেরেছি কিনা। প্রতিদিন আমি কমপক্ষে একজনকে সাহায্য করার টার্গেট করে থাকি কারণ প্রতিদিন একজন করে সাহায্য করতে পারলে মাসে ৩০ জনকে আর সেই হিসাবে বছরে ৩৬৫ জনকে সেবা দিতে সক্ষম হবো।

পরিশেষে প্রবাসীদের প্রতি অনুরোধ করে তিনি বলেন, আপনারা অপরাধমূলক কাজ থেকে বিরত থেকে দেশের সম্মানটুকু অক্ষুন্ন রাখবেন। আমি দোয়া করি মহান আল্লাহতালা যেন সর্বদা আপনাদেরকে ভালো রাখেন। আপনারাও আমার জন্য ও আমার পরিবারের জন্য দোয়া করবেন। দীর্ঘ সাড়ে চার বছরের দায়িত্ব পালনকালে আমি যদি কারো মনে কষ্ট দিয়ে থাকি আমাকে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।
এছাড়া সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে বলেন, সাংবাদিকেরা হচ্ছে জাতির বিবেক। আপনাদের বস্তুনিষ্ঠ লিখনির মাধ্যমে প্রবাসীসহ দূতাবাস এবং দেশ-জাতি সম্মান পাবে। দূতাবাসে সীমিত স্টাফ আপনারা লেবাননের প্রত্যেক এলাকার প্রবাসীদের সুখ-দুঃখ দূতাবাসকে জানিয়ে সহযোগিতা করার অনুরোধ জানান।
এসময় বক্তব্য রাখেন, কমিউনিটির নেতা বাবুল মুন্সি, সুফিয়া আক্তার বেবী, মানিক মোল্লা, রুবেল আহমেদ, আবদুল করিম, শরিফ খান, ইমাম হোসেন মিলন, হাবিবুর রহমান হাবিব, মনির হোসেন জয়, শামিম আহমেদ, আলমগীর ইসলাম সহ আরো অনেকে।
কমিউনিটির নেতারা বলেন, রাষ্ট্রদূত আবদুল মোতালেব সরকার এর মত পৃথিবীর কোথাও আরেকটি রাষ্ট্রদূত খোঁজে পাওয়া যাবেনা। লেবাননে ১ লক্ষ ৬০ হাজার প্রবাসী বাংলাদেশির মাথার ছায়া ছিলেন রাষ্ট্রদূত। তিনি সর্বদা অসহায় প্রবাসী বাংলাদেশিদের অবিভাবক হিসাবে লেবাননের উত্তর থেকে দক্ষিণ, পূর্ব থেকে পশ্চিমে বসবাসকারী প্রবাসীর সুখে-দুঃখে পাশে ছিলেন। এছাড়া কখনো কখনো লেবাননের জেলে বন্দী প্রবাসীদের সুখ-দুঃখ জানার জন্য উপস্থিত হতেন কারাগারে। লেবানিজদের কাছে বাংলাদেশকে পরিচিত করতে নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন। যদিও বাংলাদেশকে লেবার সাপ্লায়ার দেশ হিসেবে জানতেন লেবানিজরা। তিনি যোগদানের পর বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে সভা-সমাবেশের মাধ্যমে ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে লেবানিজদেরকে বুঝাতে সক্ষম হন বাংলাদেশ শুধু লেবার সাপ্লায়ার দেশ নয় ব্যবসা-বিনিয়োগ ও মধ্যম আয়ের একটি দেশ।
তারা আরও বলেন, রাষ্ট্রদূত দায়িত্ব পালনকালে নীতি ও আর্দশে ছিলেন অটল এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে ছিলেন সবসময়। অসাধু দালালদের কঠোর হাতে দমন করা ছাড়াও তাদের কাছে কোনদিন আপোষ করেন নাই। তিনি আসার আগে যেখানে দুই হাজার মার্কিন ডলার লাগতো একটি লাশ প্রেরণ করতে সেখানে বিনা খরচে এবং দ্রুত ও অল্প সময়ের মধ্যে মৃতদেহ দেশে প্রেরণ করতে সক্ষম হন। সরকারি এবং সাপ্তাহিক ছুটি প্রবাসীদের থাকলেও দীর্ঘ সাড়ে চার বছর দায়িত্ব পালনকালে ছুটি বা রেষ্টের প্রয়োজন মনে করেননি এই প্রবাসী বান্ধব রাষ্ট্রদূত আবদুল মোতালেব সরকার।
এসময়ে লেবানন প্রবাসীদের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রদূতকে “সম্মাননা মানপত্র” প্রদানসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন থেকে ক্রেষ্ট প্রদান করা হয়। মশিউর রহমান টিটু কমিউনিটির পক্ষ থেকে দেয়া মানপত্র পাঠ করে শুনান।
এসময় আরও উপস্থিত ছিলেন, দূতাবাসের কর্মকর্তাবৃন্দ, লেবাননে দায়িত্বে থাকা বিভিন্ন ইলেকট্রনিকস ও প্রিন্ট মিডিয়ার সাংবাদিকবৃন্দ সহ হাজার হাজার প্রবাসী বাংলাদেশিরা।