জাহাঙ্গীর আলম শিকদার, লন্ডন, যুক্তরাজ্য প্রতিনিধি: যুক্তরাজ্যে জমকালো আয়োজনে ১৫তম বিসিএ অ্যাওয়ার্ড সম্পন্ন হয়েছে। সম্প্রতি লন্ডনের বিখ্যাত ওটু ইন্টারকন্টিনাল (O2 Intercontinental)-এ ব্রিটেনের মূলধারার বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ, কারি ইন্ড্রাষ্ট্রিজের নানা শাখার বিশিষ্টজন এবং সেলিব্রেটি ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে ৩ ক্যাটাগরিতে বিসিএ পুরষ্কার প্রদান করা হয়। ক্যাটাগরিগুলো হলো- রেস্টুরেন্ট অব দ্যা ইয়ার, শেফ অফ দ্যা ইয়ার ও অনার অফ দ্যা ইয়ার।

এ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন ব্রিটিশ পার্লামেন্টের বিরোধীদলীয় নেতা স্যার কিয়ার স্টারমার এমপি। বিশেষ অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন মিনিস্টার ফর অল স্মোল বিজনেসেস, কনজুমার্স এন্ড লেবার মার্কেটস মিনিস্টার পল স্কলি এমপি, লর্ড করণ বিলিমারিয়া সিবিই, ডিএল, এফসিএ, লর্ড শেখ, লর্ড র্যামি র্যেনজার, স্যার স্টিফেন টিম এমপি, ব্রিটিশ বাংলাদেশি এমপি আফসানা বেগম, ব্রুথ ক্যাডবারি এমপি, রবার্ট হালফন এমপি, দাওন বাটলার এমপি, জেমস ম্যুরি এমপি, টাওয়ার হ্যামলেট কাউন্সিলের মেয়র জন বিগস, স্পিকার কাউন্সিলার আহবাব হোসেন, চ্যানেল এস এর ফাউন্ডার মাহি ফেরদৌস জলিল, এনটিভির সিইও সাবরিনা হোসেন, এটিএন বাংলার সিইও হাফিজুল আলম বকস এবং আইঅন টিভি’র সিইও আতাউল্লাহ ফারুক।

অনুষ্ঠানে ব্রিটিশ পালামেন্টের বিরোধীদলীয় নেতা স্যার কিয়ার স্টারমার তার বক্তব্যে কোভিড সংকট কাটিয়ে উঠতে ফ্রি বিজনেস রেইট, রেস্টুরেন্ট এর থ্রেশ হোল্ডকে আরও বর্ধিতকরণের জোর দাবী জানান।
স্যার কিয়ার স্টারমার তার বক্তব্যে করোনাকালীন সময়ে বিসিএ মেম্বারদের এনএইচএস ও ফ্রন্টলাইন ওয়ার্কারদের খাবার স্বেচ্ছাশ্রমে বিতরণ, ৫০% ডিসকাউন্টে খাবার কেনার সুযোগ ও করোনা ভ্যাকসিন বিষয়ে কমিউনিটিতে সচেতনতা সৃষ্টিতে অনন্য ভূমিকা রাখায় বিসিএ কে ধন্যবাদ জানান।

ব্রিটেনে ব্রিটিশ-বাংলাদেশিদের প্রতিনিধিত্বমূলক সংগঠন বিসিএ তাদের ডায়মন্ড জুবিল উদযাপন করছে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বছর উদযাপন বছরে এবং সেখানে আমাকে কথা বলার সুযোগ দেয়াকে গৌরবান্ধিত মনে করছি উল্লেখ করে স্যার কিয়ার স্টারমার বলেন, আমার বিশ্বাস- নিকট আগামীতে ব্রিটিশ-বাংলাদেশিরা ব্রিটেনের অর্থনীতি ও রাজনীতে লীডারশীপ অবস্থানে গিয়ে দেশের সেবা করবেন।

তিনি ব্রিটেনের জাতীয় অর্থনীতিতে বাংলাদেশি কারি ইন্ড্রাষ্ট্রির ৯০ হাজারের বেশি রেস্টুরেন্ট ওয়ার্কাদের অবদানকে কৃতজ্ঞতায় স্বরণ করে বিসিএ অ্যাওয়ার্ড বিজয়ীদের ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন- ৬১ বছরে পা রাখা কারি ইন্ড্রাষ্ট্রির লিডিং সংগঠনের এই অ্যাওয়ার্ড আগামীতে আরও উজ্জ্বলভাবে সেবা ও অনুপ্রেরণায় কাজ করবে বলে বিশ্বাস করি।

বিবিসির জনপ্রিয় নিউজ প্রেজেন্টার সামানথা সায়মন্ড ও স্কাই স্পোটর্স প্রেজেন্টার গ্যারি নিউবন এর প্রাণবন্ত উপস্থাপনায় অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন, অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানের আহবায়ক জামাল উদ্দিন মকদ্দস। সংগঠনের পক্ষ থেকে বক্তব্য রাখেন- বিসিএর প্রেসিডেন্ট এম এ মুনিম, সেক্রেটারী জেনারেল মিটু চৌধুরী ও চিফ ট্রেজারার সাইদুর রহমান বিপুল।

প্রায় ১২,০০০ এরও অধিক ব্রিটিশ বাংলাদেশি রেস্টুরেন্ট এবং টেকওয়ে প্রতিনিধিত্বকারি শক্তিশালী সংগঠন বিসিএ -ব্রিটেনের অর্থনীতিতে বছরে প্রায় ৪.২ বিলিয়ন পাউন্ড অবদান রাখছে।
বিসিএ অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানে অতিথিরা তাদের বক্তব্যে বলেন – প্রায় প্রতি সপ্তাহে রেস্টুরেন্ট ও টেকওয়ে বন্ধ হওয়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে স্টাফ সংকট। এর আশু সমাধানের জন্য সংশ্লিষ্টদের প্রতি অনুরোধ জানান।

বিসিএ ১৯৬০ সাল থেকে এর ধারাবাহিক কাজের জন্য আজ অবধি এই কমিউনিটিতে তাদের নিজস্ব অবদান রেখে চলেছেন। গত কোভিড-১৯ মহামারীতে ব্রিটেনের বিভিন্ন সেক্টরে তারা যে সার্বিক সহযোগিতা করেছেন তা সময়ের ইতিহাসে সোনার অক্ষরে মানবতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে ব্রিটেনের ইতিহাসে।
বিসিএ’র সভাপতি এম এ মুনিম তার মূল্যবান বক্তব্যে বলেন, বিসিএ অ্যাওয়ার্ডকে ব্রিটেনে কারি শিল্পের অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ অ্যাওয়ার্ড। যুগে যুগে এই শিল্পটি ব্রিটেনের মাটিতে একটি শক্তিশালী ইন্ড্রাষ্টি হিসাবে কাজ করছে।
তিনি বিসিএ’র পক্ষ থেকে ব্রিটেনের কারি ইন্ড্রাষ্ট্রির সাথে জড়িতদের প্রতি শ্রদ্ধা এবং অভিনন্দন প্রকাশ করে বলেন- সকলের মেধা, শ্রম এবং উদ্ভাবিত অসংখ্য মৌলিক কারি ডিসগুলো ব্রিটেনের খাদ্য তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে। এই অর্জন আমাদের গৌরবের।

বিসিএ’র সেক্রেটারি জেনারেল মিঠু চৌধুরী তার বিসিএর ১৫তম অ্যাওয়ার্ডকে একটি অনুষ্ঠানকে কারি ইন্ড্রাষ্ট্রির জন্য ঐতিহাসিক মুহুর্ত উল্লেখ করে বলেন, বিসিএ কারি ইন্ড্রাষ্ট্রিতে প্রতিভাবানদের মধ্য থেকে অন্যতম সেরা বাংলাদেশি কারি ও রেস্টুরেন্টগুলোকে সফলভাবে তুলে ধরতে পেরেছে। তিনি বলেন, বিসিএ অ্যাওয়ার্ড মূলধারায় কারি ইন্ড্রাষ্ট্রির আলোকিত সাফল্য এবং সম্ভাবনাগুলো তুলে ধরার পাশাপাশি কারি শিল্পবান্ধব আমাদের কমিউনিটির বিশিষ্টজনদের কর্মের স্বীকৃতি ও বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির নানা দিক তুলে ধরেছে। আমরা কোভিড-১৯ এ অনেক সহযোদ্ধাকে হারিয়েছি, তাদেরকেও আমরা শ্রদ্ধায় স্বরণ করছি।
চিফ ট্রেজারার সাইদুর রহমান বিপুল বলেন, আজকের রাতটি বাংলাদেশি কারি শিল্পের জন্য ঐতিহাসিক কারণ একই সময়ে বিসিএ ডায়মন্ড জুবিলী উদযাপন করছে। অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানে বিশিষ্টজনদের উপস্থিতিতে সেরা রেস্টুরেন্ট, সেরা শেফ ও কারি শিল্পবান্ধব আলোকিতজনদের সম্মানিত করা হয়েছে।

বাংলাদেশি কারি শিল্পকে ব্রিটেনের মূলধারায় তুলে ধরতে বিসিএ’র ধারাবাহিক কাজ এবং বিশিষ্টজনদের উপস্থিতিতে তাদের স্বীকৃতি প্রদান রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ী ও স্টাফদের করোনার অতিমারি কাটিয়ে ঘুরে দাড়াতে অনুপ্রেরণা যোগাবে বলে বিশ্বাস করি।
বিসিএ শেফ অফ দ্যা ইয়ার-২০২১ বিজয়ীরা হলেন- বাসমতি ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্ট এর মোহাম্মদ আজহারুল ইসলাম (সাউথ ইস্ট রিজওন-৬), হান্নান স্পাইস ক্যুজিন রেস্টুরেন্ট এর আব্দুল হান্নান (ইস্ট মিডল্যান্ড রিজওন), প্যারাডাইজ বালতি হাউস এর মাহমুদ আলম (সাউথ ইস্ট রিজওন-৪), শুক্কুরস রেস্টুরেন্ট এর শাহ শহীদ (ওয়েস্ট মিডল্যান্ডস), গুরু তান্দুরী রেস্টুরেন্ট এর লিটন আহমদ (লন্ডন রিজওন), সামসারা রেস্টুরেন্ট এর আনোয়ার মিয়া (সাউথ ইস্ট রিজওন-২), ক্লাসিক স্পাইস রেস্টুরেন্ট এর হারুন মিয়া (ইস্ট অফ ইংল্যান্ড রিজওন-৩), তামারিন্ড রেস্টুরেন্ট এর জিলা মিয়া (ওয়েলস রিজওন) ওসিটি স্পাইস রেস্টুরেন্ট এর মো: শামসুল ইসলাম (লন্ডন রিজওন-১)।

টেকওয়ে অ্যাওয়ার্ড প্রদান করা হয়েছে-এ্যারোমা টেকওয়ে, ভাজি ইন্ডিয়ান টেকওয়ে ও সিনামন ট্রি বিসিএ রেস্টুরেন্ট অব দ্যা ইয়ার ২০২১বিজয়ীরা হলেন- জারা ইন্ডিয়ান ক্যুজিন (ইস্ট অফ ইংল্যান্ড রিজওন-৩), টাইগাস গার্ডেন (সাউথ ইস্ট রিজওন-৬), স্পাইস লাউঞ্চ (সাইথ ইস্ট রিজওন -২), মুম্বাই লাউঞ্জ (ইয়র্ক শায়ার এন্ড হ্যাম্বার সাইড রিজওন), বাবুলস (নর্থ ইস্ট রিজওন) সিনামন স্পাইস (সাউথ ইস্ট রিজওন-৫) , ইনথো রাজ (ওয়েস্ট মিডল্যান্ড রিজওন-১) , ইন্ডিয়া গার্ডেন (ইস্ট অফ ইংল্যান্ড রিজওন -১), তামারিন (ওয়েলস রিজওন) ও নিউ হালদি( সাইথ ইস্ট রিজওন -১)।
এছাড়াও বিসিএ অনার অব দ্যা ইয়ার ২০২১ প্রদান করা হয়েছে – ব্রিটেনের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস (এনএইচএস) প্রতিষ্ঠান কে। এনএইচএস এর পক্ষে সম্মানজনক এই এওযার্ড গ্রহণ করেন- এনএইচএস এর মেডিকেল ডাইরেক্টার ফর প্রাইমারি কেয়ার ডক্টর নিকি কানানী। এবং কোভিড স্প্রে- ভ্যলটিক – এর উদ্ভাবক ব্রিটিশ-বাংলাদেশি বিজ্ঞানী সাদিয়া খামনকে।
ব্রিটিশ কারি ইন্ড্রাষ্টিতে বিশেষ অবদান রাখা কোভিড-১৯ আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণকারি বিসি এ‘র সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট এনামুল হককে মরনোত্তর অ্যাওয়ার্ড প্রদান করা হয়েছে।
অনুষ্ঠানের সার্বিক সহযোগিতায় ছিলেন বিসিএ অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানের আহ্ববায়ক জামাল উদ্দিন মকদ্দস, যুগ্ম আহবায়ক সাইফুল আলম, ফাইজুল হক, বিসিএ এর সাবেক সভাপতি কামাল ইয়াকুব ও পাশা খন্দকার এমবিই, রেস্টুরেন্ট অফ দ্যা ইয়ার এর হেড মুজিবুর রহমান ঝুনু ও কমিটির সদস্যবৃন্দ, শেফ অফ দ্যা ইয়ার এর হেড আতিকুর রহমান ও সদস্যবৃন্দ, বিসিএ পাবলিকেশন কমিটির হেড ফরহাদ হোসেন টিপু ও সদস্যবৃন্দ, মেম্বারশীপ সেক্রেটারী ইয়ামিন দিদার, কালচারাল সেক্রেটারী নাসির উদ্দিন, শামসুল আলম খান শাহীন ও অফিস ম্যানেজার আলী বাবর প্রমুখ।

১৫তম বিসিএ অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানের স্পন্সর হচ্ছে- কোবরা বিয়ার, কিংফিশার বিয়ার, ইবকো, কেবক্স, স্কয়ার মাইল ইন্সুরেন্স, গান্ধি ওরিয়েন্টাল ফুডস লিমিটেড, কানসারাস, পেটাপ, রাধুনী, রেভ্যুলেশন ফাইনেন্স ব্রকার লিমিটেড, টোটাল ফুড, ওকস্যোর, ডবলিয়্যু পিসি, এ্যারোমা আইসক্রীম এবং ওইয়া। অনুষ্ঠানে বিসিএ সকল স্পন্সরদের আন্তরিক ধন্যবাদ জানিয়েছে।

প্রসঙ্গত, ১৯৬০ সালে প্রতিষ্ঠিত ব্রিটেনে রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ ক্যাটারার্স এসোসিয়েশন (বিসিএ) ১২,০০০ এর অধিক রেস্টুরেন্ট, টেকওয়ে ব্যাবসায়ী ও ক্যাটারার্সদের প্রতিনিধিত্ব করে আসছে।১৫তম বিসিএ অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানে বিসিএ তাদের ডায়মন্ড জুবিলিও উদযাপন করেছে। সংগঠনটি বাংলাদেশি রেস্টুরেন্ট এর দক্ষ ও অদক্ষ কর্মী সংকট নিরসন এবং ব্রিটেনে আন ডকুমেন্টধারী কর্মীদের বিধিসম্মত এবং স্থায়ীভাবে কাজ করার দাবীসহ ক্যাটারার্স ও ষ্টাফদের বিভিন্ন সমস্যা, প্রতিবন্ধকতা ও সম্ভাবনা নিয়ে ধারাবাহিকভাবে কাজ করছে। বাংলাদেশিদের কারি শিল্পের সম্মিলিত এই প্রচেষ্টা এবং গৌরবের প্লাটফর্ম ছাড়াও অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশেকে আরও এগিয়ে নিবে এটাই প্রত্যাশা সকলের।