প্রবাস মেলা ডেস্ক: ভেনেজুয়েলায় আঘাত হানা প্রলয়ঙ্করী জোড়া ভূমিকম্পের পর কেটে গেছে দীর্ঘ ৭২ ঘণ্টা। সময় পেরিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকাদের জীবিত উদ্ধারের আশাও দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। শনিবার (২৭ জুন) পাওয়া সর্বশেষ সরকারি তথ্য অনুযায়ী, মৃতের সংখ্যা এক লাফে বেড়ে ১ হাজার ৪৩০ জনে দাঁড়িয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন ৫০ হাজারেরও বেশি মানুষ।
এদিকে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটে জর্জরিত দেশটিতে এই মুহূর্তে প্রায় ৬৭ লাখ মানুষ তীব্র স্যানিটেশন সংকট, নিরাপদ পানি ও মৌলিক চাহিদার অভাবে চরম মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন। খবর এএফপির।
দুর্যোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, যেকোনো বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর প্রথম ৭২ ঘণ্টা হলো জীবিত মানুষ খুঁজে পাওয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় (গোল্ডেন আওয়ার)। এই সময় পার হয়ে যাওয়ার পর উদ্ধারকাজ মূলত মরদেহ উদ্ধারের প্রক্রিয়ায় রূপ নেয়। উদ্ধারকাজে অংশ নেওয়া অস্ট্রেলিয়ার ফায়ার ফাইটার ক্রেইগ ডেমিলন বলেন, পুরো পরিস্থিতি চরম বিশৃঙ্খল, উত্তপ্ত ও অগোছালো। আমরা এখনও আশা ছাড়ছি না। অন্যদিকে একজন সালভাদরীয় উদ্ধারকর্মী জানান, বাস্তবতা হলো, এই সময়ে এসে জীবিত মানুষ পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ, বেশিরভাগই এখন মরদেহ।
এই ধ্বংসযজ্ঞের মাঝেও উপকূলীয় লা গুয়াইরা অঞ্চল থেকে একটি অলৌকিক খবর সামনে এসেছে। ৭ দশমিক ২ ও ৭ দশমিক ৫ মাত্রার তীব্র জোড়া ভূমিকম্পে বহুতল ভবন ধসে পড়ার প্রায় ৩২ ঘণ্টা পর সেখান থেকে এক নবজাতক শিশুকে সম্পূর্ণ জীবিত ও অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, ধুলোবালি মাখানো অক্ষত শিশুটিকে কোলে নিয়ে এক উদ্ধারকর্মী পরম মমতায় কাঁদছেন।
উদ্ধারকাজে স্থানীয় প্রশাসনের ধীরগতি ও কঠোর আমলাতান্ত্রিক নিয়মের কারণে ভেনেজুয়েলার সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে অন্তর্বর্তী সরকার সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত লা গুয়াইরা রাজ্যে জনসাধারণের প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ করে সেখানে সেনাবাহিনী মোতায়েন করেছে। একই সঙ্গে বেসামরিক স্বেচ্ছাসেবকদের জন্য ‘সেফ-এন্ট্রি পাস’ বা বিশেষ অনুমতিপত্র নেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
রাজধানী কারাকাসের একটি কনসার্ট হলের সামনে এই পাসের জন্য ভোর থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছেন হাজারো মানুষ। ৫৩ বছর বয়সী ইজেকিয়েল রিভেরো ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ভোর থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। এখন বেলা গড়িয়ে গেছে, এই দীর্ঘ সময়ে আমরা কতগুলো প্রাণ হারালাম তার হিসাব কে দেবে? লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা আরেক তরুণ কার্লোস ইত্রিয়াগো বলেন, ভাবুন একবার, মানুষের জীবন বাঁচাতেও এখন সরকারি পারমিট বা অনুমতিপত্র লাগছে!
নিজেদের স্বজনদের লাশ নিজেদেরই সরাতে হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন অনেকে। কারাকাসের এক মর্গের সামনে দাঁড়িয়ে ৪৩ বছর বয়সী এক শোকার্ত মা ইয়েসিকা মেন্দোজা এএফপিকে বলেন, লা গুয়াইরাতে আমাদের ঘর ধসে পড়ার পর আমার ২৫ বছর বয়সী মেয়ে ও ২৬ বছর বয়সী জামাতাকে আমরা নিজেরাই টেনে বের করেছি। কোনো সরকারি সাহায্য আসেনি। গরমে লাশ পচে যাচ্ছে, তাই শেষকৃত্য ছাড়াই তাদের সরাসরি পুড়িয়ে ফেলতে হচ্ছে।
ভেনেজুয়েলার ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির প্রেসিডেন্ট হোর্হে রদ্রিগেজ জানিয়েছেন, এ পর্যন্ত ১ হাজার ৪৩০ জন নিহত এবং ৩ হাজার ২৩৮ জন গুরুতর আহত হয়েছেন। জাতিসংঘের প্রাথমিক মূল্যায়নে জানিয়েছে, এই জোড়া ভূমিকম্পে ভেনেজুয়েলার প্রায় ৬ দশমিক ৭ বিলিয়ন (৬৭০ কোটি) মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ ভৌত অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, যা দেশটির মোট জিডিপির প্রায় ৬ শতাংশ।
এই বিপর্যয় মোকাবিলায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম ত্রাণবাহী সামরিক বিমান ‘সি-১৭’ কারাকাসের সিমন বলিভার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের একটি আংশিক সচল রানওয়েতে অবতরণ করেছে। এছাড়া মার্কিন নৌবাহিনীর একটি জাহাজও ভেনেজুয়েলা উপকূলে এসে পৌঁছেছে।
অন্তর্বর্তীকালীন নেত্রী ডেলসি রদ্রিগেজ জানিয়েছেন, তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন। যুক্তরাষ্ট্র বিশেষ উদ্ধারকারী দল ও জরুরি অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রের সরঞ্জাম পাঠিয়ে পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে। বর্তমানে বিশ্বের ২১টি দেশের বিশেষ উদ্ধারকারী দল ভেনেজুয়েলায় দিনরাত কাজ করে যাচ্ছে। গত জানুয়ারি মাসে মার্কিন স্পেশাল ফোর্সের অভিযানে নিকোলাস মাদুরো ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে ভেনেজুয়েলা এমনিতেই একটি ভঙ্গুর রাজনৈতিক ট্র্যানজিশন বা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, যার মধ্যে শতাব্দীর এই ভয়াবহতম প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেশটির মেরুদণ্ড পুরোপুরি ভেঙে দিয়েছে।