ড. আবদুল মালেক ফরাজী: বাংলাদেশের বৃহত্তম জনসংখ্যা আপদ নয়-সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক সম্পদ। The greatest natural resource of Bangladesh is it`s biggest population. প্রত্যেক দেশ, জাতী,গোষ্ঠী বা ব্যক্তি নিজেদের যোগ্যতার বলেই সময়ে সময়ে বিশ্বসমাজের উচ্চ শিখরে অবস্থান করেছে। প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। রাজত্ব স্থাপন করেছে আবহমান কাল ধরে। তাই যোগ্যতার কোন বিকল্প নাই। জ্ঞানই যোগ্যতার মাপকাঠি। জ্ঞানই মানুষকে যোগ্য ও সার্থক করতে পারে। যে দেশের মানুষ যত শিক্ষিত, সচেতন সেই দেশ তত উন্নত, অগ্রসর ও সেই সমাজ ততবেশী সূস্থ। একটি দেশের নাগরিক সমাজের সচেতেনতার মানের উপর নির্ভর করে সেই দেশ, সমাজ বা মানুষের ধ্যান ধারণা, চরিত্র, শারিরীক ও মানসিক সুস্থতা।
রেমিট্যান্স যোদ্ধা (NRB) প্রবাসীরাও তাদের সন্তানদের বিশ্বমানের বিজ্ঞানভিত্তিক আধুনিক উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত ও যোগ্য করে গড়ে তোলার জন্য অন্তহীন ভাবনা পোষণ করে। আপ্রাণ চেষ্টা করে থাকে l কিন্ত সম্ভব হয়ে উঠেনা l কারণ দেশের বেশীর ভাগ বিদ্যালয়ে আদর্শ বিদ্যা চর্চা নেই। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষা অত্যন্ত লাভজনক একটি ব্যবসায়ে পরিণত হয়েছে l এখানে জ্ঞানদানের চেয়ে অর্থলাভই মূখ্য। ছাত্রছাত্রী আর শিক্ষকের সম্পর্ক পরিবর্তিত হয়েছে। ছাত্রছাত্রীরা উদ্যমহীন, শৃঙ্খলা পরিপন্থী কর্মকান্ডে অংশগ্রহন করছে। এককথায় আমাদের সন্তানদের জীবনই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কাজেই প্রবাসীরা তাঁদের সন্তানদের প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত ও যোগ্য করে তুলতে হলে অবশ্যই আমাদের বিকল্প চিন্তা করতেই হবেl
বাংলাদেশ পৃথিবীর সবচেয়ে ঘন বসতিপূর্ণ একটি দেশ। এই ছোট দেশটিতে প্রায় ২০(বিশ) কোঠি মানুষের বসবাস। সরকারি হিসাব অনুযায়ী দেশের ১৭ কোটি জনসংখ্যার মধ্যে ১১ কোটি কর্মক্ষম ও প্রায় ৬ কোটি বেকার। বাংলাদেশে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশী বেকার। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগ্যতা ও দক্ষতার অভাবে এই দেশে জনগণ অনেকটা অভিশাপে পরিণত হয়েছে। অথচ এই মানুষ গুলিই মূলত: মানব মূলধন-মানব শক্তি। এই মানৰ মূলধন উন্নত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ পেয়ে মানবসম্পদে উন্নীত হয়ে আর্শীবাদে পরিণত হতে পারে। এই মানুষ গুলিই স্বাধীনতা আন্দোলনের মূল্যবোধক চেতনার আলোকে এই দেশ ও জাতিকে বিশ্বদরবারে স্বশাসিত, শোষণমুক্ত একটি প্রকৃত কল্যাণ রাষ্ট্রে উন্নীত করতে পারে। আমাদের মনে রাখা দরকার “The greatest natural resource of Bangladesh is it`s biggest population.”বাংলাদেশের বৃহত্তম জনসংখ্যাই আমাদের সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক সম্পদ। অন্যান্য সম্পদের মত মানুষও জাতীয় সম্পদ।
সমাজের উন্নয়নে অর্থ ও বস্তুসম্পদের মত ব্যবহার হয় মানব সম্পদ। জাতীয় মানব সম্পদ উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় সমাজের সকল মানুষের দক্ষতা ও ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। সাধারণ মানুষ বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করে সম্পদে পরিণত হয়। দক্ষ ও যোগ্য মানুষই সমাজ, দেশ ও জাতির সকল উন্নয়ন, উন্নতি ও অগ্রগতির মূল ভিত্তি। সমাজের শান্তি, শৃংখলা,উন্নতি, অগ্রগতি নির্ভর করে মানব সম্পদের মান ও সুষ্ঠ ব্যবহারের উপর।
মানবসম্পদ উন্নয়ন ছাড়া জাতীয় উন্নয়ন অসম্ভব। সমাজ উন্নয়নে মানবীয় মূলধনকে কর্মমুখী ও বিজ্ঞান ভিত্তিক জ্ঞান ও প্রশিক্ষণ দিয়ে শিক্ষিত, যোগ্য, দক্ষ ও আত্মবিশ্বাসী করে মানবসম্পদে উন্নীত করা ব্যতিত অন্য কোন বিকল্প নেই। এককথায় মানবসম্পদ উন্নয়ন হল মানবীয় শক্তি ও সামর্থ্যের সর্বোত্তম বিকাশ করে প্রত্যেককে সাবলম্বী, স্বচ্ছল ও সুন্দর করা এবং জাতীয় টেকসই উন্নয়নে অবদান রাখার যোগ্য করে তোলা। অদক্ষ জনগোষ্টীসমূহকে সৃজনশীল, উৎপাদনমুখী, যোগ্য, দক্ষ, সাহসী জনগোষ্টিতে উন্নীত করে উৎপাদন ও উন্নয়নের হাতিয়ারে পরিণত করা।
মানবসম্পদ উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় সমাজের সকল মানুষের জ্ঞান, দক্ষতা,ক্ষমতা ও যোগ্যতা বৃদ্ধি পায় এবং ব্যক্তি জীবনকে করে কর্মঠ, সচ্ছল, স্বাবলম্বী,উৎপাদনমুখী, আত্মনির্ভরশীল। পারিবারিক জীবনকে করে আনন্দঘন ও মধুর। সামাজিক জীবনকে করে মর্যাদাবান, দায়িত্বশীল ও কর্তব্য পরায়ণ। কর্মঠ, সচ্ছল ও স্বাবলম্বী মানুষরা নাগরিক জীবনে হয় সমাজ সচেতন, দায়িত্বশীল ও ন্যায়পরায়ন। যোগ্য মানুষদের অবদানে দেশ ও সমাজ হয় সমৃদ্ধ ও উন্নত। দেশ ও জাতি বিশ্বদরবারে হয় সমাদৃত ও সম্মানিত।
এদেশে কর্মসংস্থানের অভাব না থাকা সত্ত্বেও যোগ্যতার অভাবে সহায়-সম্বল বিক্রি করে লক্ষ লক্ষ নারী পুরুষ সামান্য আয়ের জন্য জীবনের সর্বোচ্চ ঝুঁকি নিয়ে বৈধ-অবৈধভাবে দলে দলে বিদেশে যাচ্ছে। বিদেশ থেকে অনেক কষ্টে যে টাকা আয় করছে তার চেয়ে শতগুণ বেশি টাকা বৈধভাবে বিদেশী দক্ষশ্রমিকরা বাংলাদেশ থেকে নিয়ে যাচ্ছে। কাজেই বাংলাদেশের শুধু দরকার-মানব শক্তিকে কর্মমুখী ও বিজ্ঞান ভিত্তিক শিক্ষা, জ্ঞান ও প্রশিক্ষণ দিয়ে যোগ্য মানব সম্পদে উন্নীত করা।
আমরা প্রায় দুই কোটি প্রবাসীরা (NRB) বিদেশে বসবাস করি । প্রতি বৎসর বাংলাদেশ থেকে ৮ থেকে ১০ লক্ষ বেকার যুবক বিদেশে কর্মের সন্ধানে যাচ্ছে। এই প্রবাসী শ্রমিকরা প্রতি মাসে ১৬ (ষোল) বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিটেন্স পাঠিয়ে থাকে। পক্ষান্তরে বাংলাদেশে দক্ষ ও যোগ্য কর্মীর অভাবে ৬ (ছয়) লক্ষাধিক ভারতীয়,২০ হাজার শ্রীলংকা,৭ হাজার চাইনিজ ছাড়াও পাকিস্তান, ফিলিপিন সহ অন্যান্য আরও অন্ততঃ ৬০ হাজার বিদেশী অত্যন্ত দক্ষ ও প্রশিক্ষিত শ্রমিকেরা আরো অধিক টাকা বাংলাদেশ থেকে বিদেশে নিয়ে যাচ্ছে। লুটেরাদের মাধ্যমে টাকা পাচারের কথা বাদই দিলাম।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী দেশের ১৭ কোটি জনসংখ্যার মধ্যে ১১ কোটি কর্মক্ষম তার মাঝে ৬ কোটি বেকার। তাই দেশের বেকারত্ব দূরীকরণ, প্রকৃত উন্নয়ন, উন্নতি ও অগ্রগতির লক্ষ্যে দক্ষ ও যোগ্য জনশক্তি তৈয়ার করার প্রয়োজনীয় ও যথাযোগ্য প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে।
তাই আমরা রেমিটেন্স যোদ্ধা এককথায় প্রবাসীরা আমাদের অর্জিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার আলোকে বাংলাদেশে নিজ খরচে ও নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা বা শিক্ষাপদ্ধতির বিকল্প তথা বৈষম্যহীন শিক্ষা ব্যাবস্থা প্রচলনের সংস্কৃতি চর্চা শুরু করতে চাই। অর্থাৎ উন্নততর শিক্ষা গ্রহণ সবার জন্যই যেন সম্ভব ও সহজতর হয়ে উঠে। সেই প্রত্যাশায় পর্যায়ক্রমে আমাদের “Institute of Advance Science Technology & Engineering-IASTE” (প্রস্তাবিত) ইনস্টিটিউট থেকে ইউনিভার্সিটিতে উন্নীত করা বাঞ্ছনীয় । নি:সন্দেহে ফলাফল আশাব্যাঞ্জক হবে। সরকারী পৃষ্ঠপোষকতায় পর্যায়ক্রমে সারা দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেই এই উন্নততর ও বৈষম্যহীন শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষিত ও যোগ্য করে গড়ে তোলার আশাবাদ জাগিয়ে তুলতে হবে।
শিক্ষাই দক্ষতা ও যোগ্যতার মাপকাঠি। উপুযুক্ত শিক্ষা মানুষের সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ সাধন করে দক্ষ ও যোগ্য মানবসম্পদে উন্নীত করে। ভাষা মানুষের শিক্ষা গ্রহণ ও মত বিনিময়ের প্রথম ও প্রধান মাধ্যম। ভাষাহীন মানুষ বোবা। তাই ভাষাজ্ঞান অপরিহার্য।
ভৌত বিশ্বের যা কিছু পর্যবেক্ষণযোগ্য, পরীক্ষণযোগ্য ও যাচাইযোগ্য, তার সুশৃঙ্খল, নিয়মতান্ত্রিক গবেষণা ও সেই গবেষণালব্ধ জ্ঞানভাণ্ডারই বিজ্ঞান। প্রযুক্তি হল জ্ঞান, যন্ত্রতন্ত্রের ব্যবহার কৌশল। বিশ্ব শ্রমবাজারে তথ্য প্রযুক্তি (IT) জ্ঞান ও যোগ্যতার ব্যবহার ও চাহিদা সবচেয়ে বেশি। ফ্রিল্যান্সিং বা আউটসোর্সিং (Freelancing or outsourcing বা outside resourcing) এর মাধ্যমে সহজে আয় করা যায়। ফ্রিল্যান্সিং বা আউটসোর্সিং এক বিশাল শ্রমবাজার। ঘরে বসে স্বল্প সময়ে অনলাইনে এমনকি বিশ্বের যেকোন স্থানের কাজ সহজে করে নিয়মিত অনেক আয় করা যায়। বর্তমান উন্নয়নশীল বিশ্বের শ্রমবাজারে প্রকৌশল বিদ্যা (Engineering), ব্যবহারিক বিজ্ঞানের গুরুত্ব অপরিসীম। প্রকৌশল বিজ্ঞানীরা প্রকৃতির সম্পদকে মানুষের ব্যবহারযোগ্য যে কোন রূপে রূপান্তরিত করে যে কোন ব্যবহারিক সমস্যার প্রযুক্তিগত সমাধান করে মানবজাতির উপকার ও কষ্ট লাঘব করছে। প্রকৌশল হল সেই সুসংগঠিত শক্তি যা প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের মাধ্যমে সমাজ ও সভ্যতার ইতিহাস বদলে দেয়। মানব সভ্যতার ইতিহাস ও প্রকৌশলের ইতিহাস তাই অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। বস্তুবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্বসভ্যতার যতটুকু প্রগতি সম্পন্ন হয়েছে, তার সবটুকুতেই প্রকৌশলবিদ্যার গভীর অবদান আছে। দেশী বিদেশী শ্রমবাজারে প্রকৌশলীদের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। তাছাড়াও প্রকৌশলীরা শিল্প উদ্যোক্তা হয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করত: দেশের বেকারত্ব দূর করতে পারে। প্রকৌশলীরা পৃথিবীর কোথাও বেকার থাকে না। দেশের বেকারত্ব দূরীকরণ, প্রকৃত উন্নয়ন, উন্নতি ও অগ্রগতির লক্ষ্যে শিক্ষিত, সচেতন, দক্ষ ও যোগ্য শিল্প উদ্যোক্তা সৃষ্টিও একান্ত প্রয়োজন। স্বাধীনভাবে আয়, উন্নতি ও প্রতিভা চর্চার উন্মুক্ত ক্ষেত্র হল ব্যবসা বাণিজ্য। সেই ক্ষেত্রে ব্যবসা-ব্যবস্থাপনার বিশেষ পেশাগত জ্ঞান অপরিহার্য। তাই বাংলাদেশের বেকার জনগোষ্টীকে বিজ্ঞানভিত্তিক, কারিগরী ও প্রযুক্তিগত শিক্ষা, জ্ঞান ও প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ, যোগ্য ও আত্মপ্রত্যয়ী করে গড়ে তোলার প্রত্যাশায় রেমিটেন্স যোদ্ধদের আন্তর্জাতিক সংগঠনের সার্বিক ব্যাবস্থাপনায় আন্তর্জাতিক মানের প্রতিষ্ঠান “Institute of Advance Science Technology & Engineering” প্রতিষ্ঠা করতে পারে। ফলে দেশে দক্ষ ও যোগ্য জনশক্তি গড়ে উঠবে। আমাদের দেশে আর বিদেশী দক্ষ জনশক্তির প্রয়োজন হবে না। দেশের বেকারত্ব দূর হবে। আমাদের দেশ থেকে আর আয় রোজগারের জন্য বিদেশ যেতে হবেনা। কাজেই হাজারও প্রতিকূলতা সত্ত্বেও সারা বিশ্বের রেমিটেন্স যোদ্ধা প্রবাসীদের একই ছাতার নীচে এসে এধরনের জাতীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার মহান দায়িত্ব পালন করতে হবে।
লেখক: প্যারিস, ফ্রান্স প্রবাসী।