জোসেফ স্টিগলিৎজ, নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র:
কোভিড-১৯ এবং ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার যুদ্ধ বিশ্বে অর্থনৈতিক পতন যতটা না কঠিন পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে, তারচেয়ে নীতিনির্ধারকদের প্রতিক্রিয়া বিশ্ব অর্থনীতির খারাপ পরিস্থিতিকে আরও খারাপের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। ২০২৩ সালে মানুষের ক্রমবর্ধমান দুঃখ-কষ্ট আরও খারাপের দিকে যাবে, যা বৈশ্বিক নেতৃত্বে জনতুষ্টিবাদী বিপজ্জনক বুলিবাগীশদের জন্য বাড়-বাড়ান্ত অবস্থা তৈরি করবে। এ কারণে দেশে দেশে নাগরিক সমাজে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বাড়ছে।
অর্থনীতিকে বিপর্যয়কর বিজ্ঞান বলা হয়ে থাকে এবং ২০২৩ সালে এর সেই উপাধিকে আরও সত্য বলে প্রমাণ করবে। আমরা দুটি বিপর্যয়ের করুণা দশা দেখার অপেক্ষায় রয়েছি যা সম্পূর্ণই আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। প্রথমটি হল কোভিড-১৯ মহামারী, যা আমাদেরকে নতুন, আরও মারাত্মক, আরও সংক্রামক, বা ভ্যাকসিন-প্রতিরোধী রূপগুলিকে সাথে নিয়ে হুমকি দিয়ে চলেছে। চীন প্রধানত তার নাগরিকদের পশ্চিমাদের তৈরি বেশি কার্যকর এমআরএনএ (সজঘঅ) ভ্যাকসিন দিয়ে টিকা দিতে ব্যর্থ হওয়ার কারণে চীনে মহামারিটি নিয়ন্ত্রনে নেয়া পদক্ষেপ বেশ খারাপভাবে পরিচালিত হয়েছে।

দ্বিতীয় বিপর্যয় হল, ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন যুদ্ধ। এই সংঘাতের কোন শেষ দেখা যাচ্ছে না এবং এটি বাড়তে পারে বা আরও বড় আকারে নেতিবাচক প্রভাব তৈরি করতে পারে। যেভাবেই হোক, বিশ্বে জ্বালানি এবং খাবারের দামের ক্ষেত্রে আরও বিঘ্ন ঘটবে তা নিশ্চিত। চিন্তা করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে যে নীতিনির্ধারকদের প্রতিক্রিয়া একটি খারাপ পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করে তুলবে। কারণ তারা মনে করেছে, এই সমস্যাগুলি যথেষ্ট উদ্বেগের নয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার খুব বেশি এবং খুব দ্রুত বাড়াতে পারে। আজকের মুদ্রাস্ফীতি মূলত সরবরাহের ঘাটতি দ্বারা পরিচালিত, যার মধ্যে কিছু ইতিমধ্যে সমাধানের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। তাই সুদের হার বাড়ানো বিপরীতমুখী সমস্যা তৈরি করতে পারে। কারণ এটি খাদ্য, তেল বা গ্যাস উৎপাদন করবে না, পক্ষান্তরে সরবরাহের ঘাটতি দূর করতে সহায়তা করতে পারে এমন বিনিয়োগগুলিকে একত্রিত করা আরও কঠিন করে তুলবে।

আর্থিক কড়াকড়িও বিশ্বব্যাপী মন্দার কারণ হতে পারে। প্রকৃতপক্ষে, এই ফলাফলও অত্যন্ত প্রত্যাশিত। কারণ বিশ্ব অর্থনীতির কিছু ভাষ্যকার নিজেদেরকে এই বলে দৃঢ়প্রত্যয়ী মনে করেন যে- মুদ্রাস্ফীতি মোকাবেলা করতে এমন অর্থনৈতিক যন্ত্রণার প্রয়োজন আছে যা কার্যকরভাবে মন্দার ভিতরও উল্লাস করতে পারে। তারা যুক্তি দেখান, সমস্যা যত দ্রুত ও গভীরতর হবে, তত ভাল। কিন্তু রোগের চেয়ে নিরাময় যে আরও খারাপ হতে পারে তারা মনে হয় তা বিবেচনা করেননি।
মার্কিন ফেডারেলের কঠোরতায় বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দার ঝাঁকুনি ইতিমধ্যে অনুভূত হতে শুরু করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে ‘ভিক্ষুক-তোমার-প্রতিবেশী’ নীতিতে জড়িয়ে পড়েছে। কারণ একটি শক্তিশালী ডলার যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মুদ্রাস্ফীতি কমায়, সাথে সাথে এটি অন্যান্য দেশের মুদ্রাকেও দুর্বল করে দেয় এবং সেখানেও মুদ্রাস্ফীতি বাড়িয়ে তা করে। এই বৈদেশিক-বিনিময় প্রভাবগুলি প্রশমিত করার জন্য দুর্বল অর্থনীতির দেশগুলিকে সুদের হার বাড়াতে বাধ্য করা হচ্ছে, যা তাদের অর্থনীতিকে আরও দুর্বল করছে। উচ্চ সুদের হার, অবমূল্যায়িত মুদ্রা এবং বিশ্বব্যাপী মন্দা ইতিমধ্যে কয়েক ডজন দেশকে দেউলিয়াত্বের প্রান্তে ঠেলে দিয়েছে।

উচ্চ সুদের হার এবং জ্বালানির উচ্চ মূল্য অনেক সংস্থাকে দেউলিয়া হওয়ার দিকে ঠেলে দেবে। ইতিমধ্যেই এর কিছু নাটকীয় উদাহরণও সৃষ্টি হয়েছে। যেমন সদ্য জার্মান জাতীয়করণকৃত আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইউটিলিটি ইউনিপার। এমনকি কোম্পানিগুলো দেউলিয়াত্ব সুরক্ষা না চাইলেও, ফার্ম এবং পরিবার উভয়ই কঠোর আর্থিক এবং ঋণের অবস্থার চাপে চ্যাপ্টা হতে থাকবে। এটি আশ্চর্যজনক নয় যে, গত ১৪ বছরের অতি-নিম্ন সুদের হার বলবৎ থাকার পরও বিশ্বের অনেক দেশ, সংস্থা এবং পরিবারকে অধিক হারে ঋণগ্রস্ত করে রেখেছে।

গত বছরের সুদের হার এবং বিনিময় হারের ব্যাপক পরিবর্তন বহুবিধ অদৃশ্য ঝুঁকি সৃষ্টি করেছে। গত বছরের সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে এবং অক্টোবরের শুরুতে ব্রিটিশ পেনশন তহবিলের দৃশ্যমান পতনোন্মুখ অবস্থা তারই জলন্ত উদাহরণ। যথা সময়ে ঋণ বা পাওনা পরিশোধের অক্ষমতা এবং বিনিময় হার অনিয়ন্ত্রিত অর্থনীতির একটি বৈশিষ্ট্য এবং অস্বচ্ছ সূচক বৃদ্ধির সাথে সেগুলি আরও বেশি প্রচলিত হয়ে উঠে।
এই ধরণের অর্থনৈতিক টানাপোড়ন সবচেয়ে দুর্বল দেশগুলির উপর ঋণের কঠিন বোঝা চাপিয়ে দেয়। এতে করে জনতুষ্টিবাদী বুলিবাগিশ নেতারা আমজনতাদের মধ্যে বিরক্তি এবং অসন্তোষের বীজ বপন করার জন্য ওই সব দেশকে আরও উর্বর ভূমিতে পরিণত করার সুযোগ পাবে। গত বছর ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লুইজ ইনাসিও লুলা দ্যা সিলভা তার চরম ডানপন্থী প্রতিদ্বন্দ্বী জেইর বলসোনারোকে পরাজিত করার পর বিশ্বব্যাপী স্বস্তির বাতাস বইছিলো। তবে আমাদের ভুলে যাওয়া চলবে না যে বলসোনারো প্রায় ৫০ শতাংশ ভোট পেয়েছেন এবং এখনও ব্রাজিলের কংগ্রেসকে নিয়ন্ত্রণ করছেন।
অর্থনীতিসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে আজ মানুষের কল্যাণের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হল রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি। এখন বিশ্বের অর্ধেকেরও বেশি মানুষ কর্তৃত্ববাদী শাসনের অধীনে বসবাস করছে। এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো গণতান্ত্রিক দেশে দুটি প্রধান দলের মধ্যে একটি দল ব্যক্তিত্বের কাল্টে (Cult) পরিণত হয়েছে যা ক্রমবর্ধমান গণতন্ত্রকে প্রত্যাখ্যান করে এবং ২০২০ সালের নির্বাচনের ফলাফল সম্পর্কে সমানে মিথ্যা বলে চলেছে। তার প্রধান কাজ হল আমেরিকান গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি সম্পর্কে যতটা সম্ভব ভুল এবং বিভ্রান্তি ছড়িয়ে গণমাধ্যম, বিজ্ঞান এবং উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠানগুলিকে আক্রমণ করা।

দৃশ্যত এখন আমাদের লক্ষ্য হল, বিগত ২৫০ বছরের অগ্রগতির অনেকটাই ফিরিয়ে আনা যা স্নায়ুযুদ্ধের শেষের দিকে আশাবাদ তৈরি করেছিল। মার্কিন দার্শনিক অর্থনীতিবিদ ফ্রান্সিস ফুকুইয়ামা ‘ইতিহাসের সমাপ্তি’ ঘোষণার কথা বলেছেন, যার দ্বারা তিনি উদার-গণতান্ত্রিক মডেলের বিপরীতে কোনো গুরুতর প্রতিদ্বন্দ্বীর অন্তর্ধানকে বোঝাতে চেয়েছিলেন।
তবে অনেকটা নিশ্চিত যে, এখনও একটি ইতিবাচক এজেন্ডা রয়েছে যা রাজনীতিতে আদিমমত্ততা এবং হতাশার উদ্ভবকে আটকাতে পারে। কিন্তু অনেক দেশে, রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং অচলাবস্থা এই ধরনের এজেন্ডাকে নাগালের বাইরে ঠেলে দিয়েছে। আরও অধিক-কার্যকর রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে, আমাদের অর্থনীতি এখন যে মুদ্রাস্ফীতিজনিত চাপের মুখোমুখি হচ্ছে তা প্রশমিত করে, আমরা উৎপাদন ও সরবরাহ বাড়াতে আরও দ্রুত এগিয়ে যেতে পারতাম। কৃষকদের যতটা সম্ভব কম উৎপাদন করতে বলার অর্ধ শতাব্দী পর, ইউরোপ এবং আমেরিকা উভয়ই তাদের (কৃষকদের) আরও বেশি উৎপাদন করতে বলতে পারতো। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র শিশু যত্ন প্রদানে আরও উদ্যোগী হতে পারতো- যাতে আরও বেশি নারী শ্রমশক্তিতে যুক্ত হয়ে কথিত শ্রম ঘাটতি দূর করতে পারতো। এবং ইউরোপ তার জ্বালানি বাজার সংস্কার করে বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি রোধ করতে আরও দ্রুত গতিতে এগিয়ে যেতে পারতো।
বিশ্বের দেশগুলো অবৈধ বা অপ্রত্যাশিত উপায়ে অর্জিত অর্থের উপর কর আরোপ করে দুস্থদের রক্ষা করার জন্য সে অর্থ ব্যবহার করতে পারে। এতে অর্থনৈতিক স্থিতিস্থাপকতা সৃষ্টি হবে যা জনসাধারণকে বিনিয়োগে উৎসাহিত করবে এবং পণ্যের দামও কমে যাবে। একটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় হিসাবে, আমরা কোভিড-১৯ এর বুদ্ধিবৃত্তিক-সম্পত্তি মওকুফ করতে পারতাম, এর ফলে ভ্যাকসিন প্রয়োগে বর্ণবাদের মাত্রা এবং এটি যে অসন্তোষ সৃষ্টি করেছে তা কমাতে পারতাম। এর পাশাপাশি কোভিডের বিপজ্জনক নতুন মিউটেশনের ঝুঁকিও হ্রাস করতে পারতাম।
সব বলা হয়েছে, তবুও একজন আশাবাদী বলবেন যে আমাদের গ্লাস প্রায় এক-অষ্টমাংশ পূর্ণ। বাছাইকৃত কয়েকটি দেশ এই এজেন্ডা বাস্তবায়নে কিছু অগ্রগতি করেছে এবং এর জন্য তাদের কাছে আমাদের কৃতজ্ঞ হওয়া উচিত। কিন্তু ফ্রেডরিখ ভন হায়েক এর দ্য রোড টু সার্ফডম (The Road to Serfdom)) লেখার প্রায় ৮০ বছর পরে বলতে হয়, আমরা এখনও চরমপন্থী নীতির উত্তরাধিকার নিয়ে বেঁচে আছি যা তিনি এবং মিল্টন ফ্রিডম্যান মূল স্রোতে ঠেলে দিয়েছিলেন। এই ধারণাগুলি আমাদেরকে সত্যিকারের বিপজ্জনক পথে নিয়ে গেছে: তৈরি করেছে ফ্যাসিবাদের একবিংশ শতাব্দী সংস্করণের রাস্তা।
জোসেফ স্টিগলিৎজ:
অর্থনীতিতে নোবেল বিজয়ী এবং কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ (১৯৯৭-২০০০), মার্কিন প্রেসিডেন্টের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা কাউন্সিলের চেয়ারপারসন এবং উচ্চ-পরিচালকদের সহ-সভাপতি। তিনি আন্তর্জাতিক কর্পোরেট ট্যাক্সেশন সংস্কারের স্বাধীন কমিশনের সদস্য এবং ১৯৯৫ আইপিসিসি জলবায়ু মূল্যায়নের প্রধান লেখক।
স্বত্ত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
অনুবাদ: শহীদ রাজু।