প্রবাস মেলা ডেস্ক: সংগীত জগতের অনন্য এক নাম ফকির আলমগীর। দেশের সংগীতকে বিশ্ব দরবারে পৌঁছে দিতে তার ভূমিকা স্মরণীয়। কিংবদন্তি এই গণসংগীতশিল্পী ও স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শব্দসৈনিক ফকির আলমগীরের দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী আজ রবিবার (২৩ জুলাই)। দেখতে দেখতে দুইটি বছর পার হয়ে গেল বাংলাদেশের গর্ব একুশে পদকপ্রাপ্ত স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শব্দসৈনিক, গণসংগীতশিল্পী ফকির আলমগীর আমাদের মাঝে নেই। ২০২১ সালের ২৩ জুলাই সকলকে কাঁদিয়ে পরপাড়ে পাড়ি জমান এই কিংবদন্তি শিল্পী। তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আজ বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে তারই প্রাণের সংগঠন ঋষিজ শিল্পীগোষ্ঠী। দিনটিকে স্মরণীয় করে শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালার প্রধান মিলনায়তনে আজ রবিবার বিকেল ৫টায় অনুষ্ঠিত হবে ‘কথা-গানে ফকির আলমগীর স্মরণ ও স্মৃতিপদক প্রদান অনুষ্ঠান’। এদিন ঢাকায় এই গুণী শিল্পীর নামে একটি সড়কও উদ্বোধন করা হবে।
জীবদ্দশায় ফকির আলমগীরের ইচ্ছে ছিল নিজের নামে একটি সড়কের নামকরণ হোক। মৃত্যুর কয়েক মাস আগে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলামের সঙ্গে আলাপে এমন ইচ্ছার কথা প্রকাশ করেছিলেন এই গণসংগীতশিল্পী।
কিন্তু করোনার কারণে দাপ্তরিক কাজ বন্ধ থাকায় জীবিত অবস্থায় তা দেখে যেতে পারেননি তিনি। তার মৃত্যুর দুই মাসের মাথায় সিটি কর্পোরেশনের বোর্ড সভায় সিদ্ধান্ত হয় ফকির আলমগীরের নামে রাজধানীর খিলগাঁও চৌধুরীপাড়ার ৬ নম্বর সড়কটির নামকরণ করা হবে।
আজ রবিবার সড়কটি উদ্বোধন করবেন মেয়র আতিকুল ইসলাম। এ প্রসঙ্গে ফকির আলমগীরের ছেলে মাশুক আলমগীর বলেন, ‘মেয়র আতিকুল ইসলামের কাছে আমাদের পরিবার চিরকৃতজ্ঞ। আজ একটি অনুষ্ঠান করে মেয়র রাস্তাটি উদ্বোধন করবেন। এলাকার গণমান্য ব্যক্তিত্বরা ও সংস্কৃতিজনরাও সেখানে উপস্থিত থাকবেন। আমি চাই ফেরদৌস ওয়াহিদ, ফিরোজ সাঁই ও আজম খান আংকেলদের নামেও রাস্তা হোক। উনাদের মতো গুণী মানুষদের স্মরণে রাখার জন্য এমন উদ্যোগ দেশ নিতেই পারে।’
খিলগাঁওয়ের চৌধুরীপাড়ার ৬ নম্বর সড়কেই ফকির আলমগীরের বাসা। শুধু নামকরণ নয়, সড়কে একটি ফলকও থাকবে, সেখানে একনজরে ফকির আলমগীর সম্পর্কে জানতে পারবে পথচারীরা।
১৯৫০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ফরিদপুর জেলার ভাঙ্গা থানার কালামৃধা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন ফকির আলমগীর। ২০২১ সালের ২৩ জুলাই করোনায় আক্রান্ত হয়ে না ফেরার দেশে চলে যান তিনি।
শিল্পী কালামৃধা গোবিন্দ হাইস্কুল থেকে ১৯৬৬ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে দেশের ঐতিহ্যবাহী জগন্নাথ কলেজে ভর্তি হন। সেখান থেকে স্নাতক ডিগ্রি নিয়ে পরবর্তী পর্যায়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাংবাদিকতায় এমএ পাস করেন।

তিনি ১৯৬৬ সালে ছাত্র ইউনিয়নের সদস্য ছিলেন। এরই ধারাবাহিকতায় ক্রান্তি শিল্পীগোষ্ঠী ও গণশিল্পী গোষ্ঠীর সদস্য হিসেবে ষাটের দশকে বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামে এবং ‘৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে গণসংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে এক বিশেষ ভূমিকা পালন করেন।
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে একজন শব্দসৈনিক হিসেবে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে যোগ দেন। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশ বেতার ও টেলিভিশনে নিয়মিত সংগীত পরিবেশনার পাশাপাশি প্রচলিত ও প্রথাসিদ্ধ গানের বন্ধ্যা ভূমিতে দেশজ ও পাশ্চাত্য সংগীতের মেলবন্ধন ঘটিয়ে বাংলা গানে নতুন মাত্রা সংযোজন করেন।
১৯৭৬ সালে গঠন করেন ঋষিজ শিল্পগোষ্ঠী। এই গোষ্ঠীর মাধ্যমে গণসংগীতকে তিনি সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেন।
দীর্ঘ ক্যারিয়ারে ফকির আলমগীরের গাওয়া ‘সান্তাহার জংশনে দেখা’, ‘বনমালী তুমি’, ‘কালো কালো মানুষের দেশে’, ‘মায়ের একধার দুধের দাম’, ‘আহা রে কাল্লু মাতব্বর’, ‘ও জুলেখা’সহ বেশ কিছু গান দারুণ জনপ্রিয়তা পায়। এর মধ্যে ‘ও সখিনা’ গানটি এখনো মানুষের মুখে মুখে ফেরে। ১৯৮২ সালের বিটিভির ‘আনন্দমেলা’ অনুষ্ঠানে গানটি প্রচারের পর দর্শকের মধ্যে সাড়া ফেলে। কণ্ঠ দেওয়ার পাশাপাশি গানটির সুরও করেছেন ফকির আলমগীর।
তিনি গানের পাশাপাশি একজন সফল লেখকও। তার প্রকাশিত গ্রন্থগুলো চেনা চীন, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ও বিজয়ের গান, গণসংগীতের অতীত ও বর্তমান, গণসংগীত ও মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধে বিদেশি বন্ধুরা, আমার কথা, পপসংগীতের একাল সেকাল।
ফকির আলমগীর সংগীতে অবদানের জন্য একুশে পদক, শেরে বাংলা পদক, ভাসানী পদক, সিকোয়েন্স অ্যাওয়ার্ড অব অনার, তর্কবাগীশ স্বর্ণপদক, জসীমউদ্দীন স্বর্ণপদক, ক্রান্তিপদক, গণনাট্যপদক, গণস্বাস্থ্য মুক্তিযোদ্ধা সম্মাননা, জনসংযোগ সমিতি পুরস্কার, ভারতীয় গণনাট্য সংঘ পুরস্কার, ত্রিপুরা সংস্কৃতি সমন্বয় পুরস্কার, বাংলা একাডেমির সম্মানজনক ফেলোশিপসহ অসংখ্য পুরস্কার পেয়েছেন।
এছাড়াও ফকির আলমগীর বাংলা একাডেমি আজীবন সদস্য, গণসংগীত সমন্বয় পরিষদের সভাপতি, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সহ-সভাপতি, জনসংযোগ সমিতির সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের আজীবন সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের উপদেষ্টা, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র পরিষদের সদস্য, অফিসারস ক্লাবের সদস্য ছিলেন।