ইসমাইল হোসাইন, আম্মান, জর্ডান: দেশের বাইরে বসবাসরত প্রায় দুই কোটি বাংলাদেশি প্রবাসী দীর্ঘদিন ধরে দেশের অর্থনীতি, পরিবার ও সমাজের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন। কিন্তু ভোটাধিকার প্রয়োগের ক্ষেত্রে আজও তারা বড় ধরনের বঞ্চনার শিকার। প্রবাসীদের ভোট নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশন ও উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনুস যে উদ্যোগ নিয়েছেন, তা প্রবাসীদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। তবে এই সুযোগ বাস্তবায়নে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে এনআইডি–সংকট।
প্রবাসী নেতাদের মতে, বিশ্বজুড়ে দুই কোটিরও বেশি বাংলাদেশি প্রবাসীর মধ্যে মাত্র প্রায় এক লাখ ভোটার নিবন্ধন করতে পেরেছেন। অর্থাৎ ৯৮ শতাংশ প্রবাসী এখনো ভোটের জন্য নিবন্ধন করতে পারছেন না শুধুমাত্র এনআইডি কার্ড না থাকার কারণে। বহু প্রবাসী আছেন যারা ৩০ থেকে ৪০ বছর ধরে বিদেশে বসবাস করছেন। এদের অধিকাংশই এনআইডি কার্ড পাননি বা তৈরির সুযোগও পাননি। ফলে নতুন ভোট ব্যবস্থার আওতায় তাদের অংশগ্রহণ অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
এই বাস্তবতায় প্রবাসীরা দাবি করেছেন—এনআইডির পাশাপাশি বৈধ বাংলাদেশি পাসপোর্টের মাধ্যমেই যেন ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ তৈরি করা হয়। তাদের মতে, পাসপোর্ট একটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পরিচয়পত্র এবং বিদেশে অবস্থানরত প্রবাসীদের জন্য এটি-ই সবচেয়ে প্রমাণসিদ্ধ নথি। যদি পাসপোর্টভিত্তিক ভোট ব্যবস্থা চালু করা হয়, তাহলে কোটি প্রবাসী দেশের নেতৃত্ব নির্বাচন প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারবেন।
প্রবাসীরা আরও জানান, নির্বাচন কমিশন প্রস্তাবিত পোস্টাল ভোট বা বিডিএফ পদ্ধতির মাধ্যমে ভোট গ্রহণ বাস্তবসম্মত নয়। কারণ বহু দেশে পোস্ট অফিস ব্যবহারের হার অত্যন্ত কম। অনেকে স্থানীয় পোস্ট অফিস কোথায় রয়েছে সেটিও জানেন না। আধুনিক ডিজিটাল পৃথিবীতে পোস্টাল ব্যবস্থা বহু এলাকাতেই আর সক্রিয় নেই। ফলে এই পদ্ধতি প্রবাসীদের জন্য অকার্যকর হয়ে উঠতে পারে।
এর পরিবর্তে প্রবাসীরা সরকারি তত্ত্বাবধানে নিরাপদ ও স্বচ্ছ কোনো ডিজিটাল মাধ্যমে ভোট প্রদান পদ্ধতি চালুর দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে—সরকারি অ্যাপ বা অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে নির্ভরযোগ্য নিরাপত্তা যাচাই করে ভোটের সুযোগ তৈরি করা হলে প্রবাসীরা সহজ, দ্রুত ও নিরাপদ উপায়ে ভোট দিতে পারবেন। তাদের বিশ্বাস, প্রযুক্তিনির্ভর এই সমাধান দেশের ভবিষ্যৎ নির্বাচন ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করবে।
প্রবাসীরা বলেন, তারা সারা জীবন দেশের জন্য কাজ করে যান—রেমিট্যান্স পাঠিয়ে দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখেন, পরিবারের দায়িত্ব পালন করেন, দেশের সম্মান বিশ্বে উজ্জ্বল করে তোলেন। কিন্তু দেশের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নির্বাচন করতে না পারা তাদের জন্য গভীর বেদনার। একটি ভোট একজন সৎ, নীতিবান ও দেশপ্রেমিক নেতৃত্ব নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় অবদান রাখতে পারে—এ বিশ্বাস থেকেই তারা ভোটাধিকারের পূর্ণ বাস্তবায়ন চান।
নির্বাচন কমিশন ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর কাছে প্রবাসীদের আবেদন—পাসপোর্টকে ভিত্তি করে ভোট দেওয়ার সুযোগ চালু করা হোক, প্রবাসীদের জন্য বাস্তবসম্মত অনলাইন বা ডিজিটাল ভোটিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা হোক এবং প্রবাসীবান্ধব নীতিনির্ধারণে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো আরও কার্যকর ভূমিকা পালন করুক।
প্রবাসীদের ভাষ্য—“দেশের সংকটে সবসময় প্রবাসীরা হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। উন্নয়নের প্রতিটি ধাপে প্রবাসীদের অবদান রয়েছে। তাই দেশের জন্য, দেশের গণতন্ত্রের জন্য ভোট দেওয়ার সুযোগ আমাদের অধিকার। সরকার ও নির্বাচন কমিশন এই দাবি বিবেচনা করবে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।”