প্রবাস মেলা ডেস্ক: দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম দেশ হিসেবে জাতিসংঘের ‘আন্তঃসীমান্ত জলপ্রবাহ ও আন্তর্জাতিক হ্রদসমূহের সুরক্ষা ও ব্যবহার সংক্রান্ত কনভেনশন (UN Water Convention)’-এ বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দিয়েছে। এই কনভেনশনে বাংলাদেশ ৫৬তম দেশ হিসেবে যোগদান করল।
বাংলাদেশ একটি জটিল ভৌগোলিক অঞ্চলে অবস্থিত, যেখানে ৫৭টি আন্তঃসীমান্ত নদী প্রবাহিত হয়েছে। এসব নদীর মধ্যে রয়েছে গঙ্গা (পদ্মা), ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা—যা চীন, নেপাল, ভুটান ও ভারতের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বাংলাদেশের বঙ্গোপসাগরে মিলেছে। ফলে এই অঞ্চলে জল ব্যবস্থাপনায় আন্তঃদেশীয় সহযোগিতা এবং টেকসই ও ন্যায়সঙ্গত ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে খরা, বর্ষায় অতিবর্ষণ, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং লবণাক্ততার প্রভাবে বাংলাদেশ চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বছরে গড়ে ২০-২৫ শতাংশ জমি প্লাবিত হয়, আর বড় বন্যার সময় তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫৫-৬০ শতাংশ পর্যন্ত। বিশ্বের মধ্যে সর্বোচ্চ সংখ্যক মানুষ—বাংলাদেশের প্রায় ৬০ শতাংশ জনগণ—উচ্চমাত্রার বন্যার ঝুঁকিতে আছে।
জাতিসংঘের ইউএনইসিই (UNECE) নির্বাহী সচিব তাতিয়ানা মলসিয়ান এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তন ও পানির উপর ক্রমবর্ধমান চাপের প্রেক্ষাপটে বিশ্বের বহু দেশ এই কনভেনশনকে আন্তঃসীমান্ত সহযোগিতা জোরদারের একটি কার্যকর প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গ্রহণ করছে।”
বাংলাদেশ সরকারের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও পানির চাহিদা আমাদেরকে দায়িত্বশীল ও সহযোগিতামূলক জল ব্যবস্থাপনার দিকে বাধ্য করছে। ইউএন ওয়াটার কনভেনশনের আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও নীতিমালা আমাদের জাতীয় নিরাপত্তা ও জনস্বার্থ রক্ষায় সহায়ক হবে।”
২০২৫ সালের মার্চে ঢাকায় জাতীয় কর্মশালার মাধ্যমে এই কনভেনশনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হয়। জাতিসংঘের পক্ষ থেকে দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে কনভেনশনটির গুরুত্ব তুলে ধরতে ধারাবাহিক কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে।
বাংলাদেশ পূর্বে থেকেই ভারতের সঙ্গে যৌথ নদী কমিশনের (Joint Rivers Commission) মতো কিছু দ্বিপাক্ষিক জল চুক্তিতে যুক্ত রয়েছে। ২০১২ সাল থেকেই বাংলাদেশ এই কনভেনশন সংক্রান্ত বিভিন্ন বৈঠকে অংশ নিচ্ছে। সর্বশেষ ২০২৪ সালের অক্টোবরে স্লোভেনিয়ায় অনুষ্ঠিত দশম বৈঠকে অংশগ্রহণ করেছিল বাংলাদেশ।
ইউএন ওয়াটার কনভেনশনের সচিব সোনিয়া কপেল বলেন, “বাংলাদেশের এই পদক্ষেপ অন্য দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোকে উৎসাহ দেবে। আমরা আশা করি ভবিষ্যতের বৈঠকগুলোতে দেশ আরও এগিয়ে আসবে।”
জাতিসংঘের এই কনভেনশনটি ১৯৯২ সালের ১৭ মার্চ গৃহীত হয় এবং ২০১৬ সাল থেকে এটি জাতিসংঘের সব সদস্য রাষ্ট্রের জন্য উন্মুক্ত। এটি আন্তঃসীমান্ত জলসম্পদ ব্যবস্থাপনায় একটি বৈশ্বিক আইনি কাঠামো গড়ে তুলেছে, যার আওতায় বর্তমানে ৫৬টি দেশ সদস্য রয়েছে।