কখনো কখনো মানুষ তার তৃতীয় নয়নের দৃষ্টি দিয়ে স্বপ্ন সাজায়। এর জন্য যে কাঙ্খিত শ্রমসময় প্রয়োজন তাও তিনি প্রয়োগ করেন। স্বপ্নগুলো আস্তে আস্তে বড় হয়ে একসময় ইপ্সিত রূপ নেয়। তখন ঐ মানুষটি মনের আকাশে গড়ে তোলেন সাফল্যের ঘর-বাড়ি আর হয়ে উঠেন দরদী প্রাণের দাবীদার। এমন একজন মানুষের নাম জুবাইদা নাজনীন চৌধুরী। সামান্য একজন গৃহিনী থেকে তিনি কিভাবে নারী উদ্যোক্তা হবার সিঁড়ি বেয়েছেন তার কাহিনী তুলে ধরছি প্রবাস মেলা’র পাঠকদের জন্য।

জুবাইদা নাজনীন চৌধুরীর জন্ম মুন্সিগঞ্জ জেলার রামগোপালপুর গ্রামের ডেপুটি বাড়ীর এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে। বাবা লুৎফুর রহমান ও মা মাহিয়া বেগম রানী। ৬ বোন ৩ ভাইয়ের মধ্যে নাজনীন চৌধুরী ৭ম। খুব কড়া শাসনের মধ্য দিয়ে তাদের ছোটবেলা কেটেছে। এ প্রসঙ্গে জুবাইদা নাজনীন চৌধুরী বলেন, আমাদের ছোটবেলা বেশ কড়া শাসনে কেটেছে। মুরুব্বিরা চাইতো না মেয়েরা বাড়ীর বাইরে থাক। তাই আমরা সবসময় বাড়ীর ভিতরেই থাকতাম-বাড়ীর ভিতরে যতটুকু খেলাধুলা করা যেতো তা পর্যাপ্ত না। কিন্তু কি আর করা। মুরুব্বিদের কথাতো মানতে হতো।
জুবাইদা নাজনীন চৌধুরীর শিক্ষাজীবন কেটেছে তার গ্রামের বাড়ী মুন্সিগঞ্জেই। তিনি গোয়াগুনি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাইমারি শেষ করেন। এরপর ভর্তি হন হাজী আমজাদ আলী উচ্চ বিদ্যালয়ে। সেখান থেকে কৃতিত্বের সাথে এসএসসি পাশ করার পর স্থানীয় কলেজে এইচএসসিতে ভর্তি হলে তার পড়াশোনা আর এগোয়নি। কেন পড়াশোনার ছেদ ঘটলো এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মিসেস চৌধুরী বলেন, আমি যখন এইচএসসিতে ভর্তি হই তখন আমার বিয়ে হয়ে যায়। এর প্রস্তাবক ছিলেন আমাদের এলাকার সংসদ সদস্য সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলি। যাইহোক বিয়ের পর পরিবারের প্রতি দায়িত্ববোধের প্রশ্নে আমিও আনুষ্ঠানিক পড়াশোনা থেকে দূরে থেকে গেলাম।

জুবাইদা নাজনীন চৌধুরী একজন গৃহিনী হিসাবে জীবন শুরু করলেও নিজের মেধা এবং শ্রম আর কর্তব্যনিষ্ঠার কারণে তিনি নিজেকে একজন সফল নারী উদ্যোক্তা হিসাবে প্রতিষ্ঠা করেছেন। ব্যবসা করতে গিয়ে অনেকবার লোকসান গুনেছেন। কিন্তু তিনি দমে যাননি। আবার বিনিয়োগ করে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন। অপরিসীম ধৈর্য্য আর সাহস ব্যবসাক্ষেত্রে তাকে সফলতা এনে দিয়েছে। কিভাবে একজন গৃহিনী থেকে ব্যবসায়ী হয়ে উঠলেন এমন প্রশ্নের জবাবে কৃতি এ নারী উদ্যোক্তা বলেন, আপনারা অবশ্যই জানেন যে, আমাদের দেশে একজন নারীকে প্রধানত তার পরিবারের দৈনন্দিন কাজকর্ম শেষ করে ব্যবসা বা সামাজিক কাজে মনোনিবেশ করতে হয়। তবুও আমি মনে করি কঠোর পরিশ্রমী মনোভাব থাকলে একজন গৃহিনীও সফল ব্যবসায়ী বা নারী উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে পারেন। যেমন ধরুন আমার কথা আমিও প্রথম প্রথম ব্যবসা বুঝতাম না। ২০০০ সালের দিকে আমি পুরোপুরি ব্যবসায় মনোনিবেশ করি। তখন আমার মেঝোছেলের জন্ম হয়। আমার হাজব্যান্ডও বিদেশ থেকে দেশে চলে আসেন। তিনি দেশে এসে তাদের পৈত্রিক ব্যবসা কামাল টি কোম্পানির পাশাপাশি নাজ এন্টারপ্রাইজ নামে একটি ইন্ডাস্ট্রি প্রতিষ্ঠা করেন। তখন আমাদের ব্যবসার বেশ প্রসার ঘটে। আমিও আমার স্বামীর সাথে ব্যবসায়ে যুক্ত হয়ে গেলাম। এটা ছাড়াও আমার অন্যান্য ব্যবসা ছিলো। আমি আগে থেকেই মেয়েদের শাড়ী, সেলোয়ার কামিজসহ বিভিন্ন পোষাক কিনে হাতের কারুকাজ করে বিক্রি করতাম। দেশের বিভিন্ন জেলায় নারী-পুরুষ যারা হাতের কাজ জানে তাদেরকে দিয়ে কাজ করাতাম। এভাবে আমিও লাভবান হয়েছি এবং তারাও স্বাবলম্বী হয়েছে। অনেকে আবার টাকা মেরে দিয়েছে আমার লোকসান হলেও আমি আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছি। মাঝখানে আবার কসমেটিক ইম্পোট করেও ব্যবসা করেছি। বুটিকস-বাটিকস এর ব্যবসা করেছি। আবার মানসম্মত বিউটি পার্লারও প্রতিষ্ঠা করেছি।

কিসের তাড়না আপনাকে এমন কর্মদ্যোমী হতে অনুপ্রাণিত করেছে জানতে চাইলে মিসেস চৌধুরী বলেন, আমি মনের টানে কাজ করি। আমি মনে করি প্রত্যেকটি মানুষের আত্মপরিচয়ের সন্ধান করা উচিৎ। আমিও চেয়েছি নিজের একটা পরিচয় তৈরি করতে। বর্তমানে তিনি কামাল ট্রি এন্ড কোম্পানি, নাজ প্রিন্টিং এন্ড প্যাকেজিং, নাজ এন্টারপ্রাইজ, ক্রিস্ট্রাল প্যালেজ গুলশান, পাঁচতারা সমবায় সমিতি লি: এর ম্যানেজিং পার্টনার হিসেবে কাজ করছেন।

ব্যবসায়ী হলেও একজন সমাজসেবী হিসাবে জুবাইদা নাজনীন চৌধুরী দেশে বিদেশে সবার প্রিয় মুখ হয়ে উঠেছেন। সময় সুযোগ পেলেই তিনি মানুষের পাশে এসে দাঁড়ান এবং নানাভাবে সাহায্য সহযোগিতা করেন। বিশেষ করে গ্রামগঞ্জের সুবিধাবঞ্চিত দরিদ্র মানুষের সেবায় তিনি সর্বদা নিয়োজিত থাকছেন। তার নিজ জেলা মুন্সিগঞ্জের সাধারণ মানুষ তাকে ত্রাতা হিসেবে মনে করেন-সবাই তাকে ভালোবাসেন। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মানবহিতৈষী দরদী এই নারী বলেন, আমি ব্যবসা বাণিজ্যের কাজের ফাঁকে সময় বের করে গ্রামের অবহেলিত ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য আমার সামর্থনুযায়ী সাহায্য সহযোগিতা করে আসছি। মানুষের জন্য কিছু করতে পারলে আমি খুব আনন্দ পাই- আমার মন প্রশান্তিতে ভরে উঠে। আলাপচারিতায় তিনি জানান বেশ কয়েকটি দেশিয় ও আন্তর্জাতিক সংগঠনের সাথে যুক্ত আছেন। বর্তমানে তিনি আন্তর্জাতিক সংগঠন We care for Women (WCH) এর মহিল বিষয়ক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সাবেক ডিবি প্রধান এআইজি মাহবুবুর রহমান এর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত সামাজিক সংগঠন জনমুক্তির সাথে সক্রিয়ভাবে যুক্ত আছেন। এছাড়া তিনি ইন্ডিয়া বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশীপ ক্লাব, আইআইসিসিআই বিজনেস গ্রুপ, বিক্রমপুর সমিতি ঢাকা, বাংলাদেশ ফটোগ্রাফিক সোসাইটি, ডিপ্লোমেটিক স্পাউজ ঢাকা এর একজন সম্মানিত সদস্য।

জুবাইদা নাজনীন চৌধুরী একজন স্বাস্থ্য সচেতন ব্যক্তিত্ব। শরীর মন ঠিক রাখার জন্য নিয়মিত শরীর চর্চা করেন। তাই তিনি কয়েক বছর আগে মার্শালআর্টে ভর্তি হন। বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামের অডিটোরিয়ামে কোচ লিজু চানের তত্বাবধানে নিয়মিত তায়াকোয়ানদো প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন। বাংলাদেশ তায়াকোয়ানদো ফেডারেশনের সেক্রেটারি মাহমুদুল ইসলাম রানা স্যার এবং প্রেসিডেন্ট মোর্শেদ কালাম স্যারের নিকট বিশেষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। এ প্রসঙ্গে মিসেস চৌধুরী বলেন, রানা স্যারের উৎসাহ এবং সহযোগিতার কারণে আমি তায়াকানান্দো প্রতিযোগিতায় পুরস্কার হিসাবে মেডেল পাই। বর্তমানে আমি তায়াকোয়ানদো প্রশিক্ষক হিসাবেও কাজ করছি। আলাপচারিতায় নাজনীন চৌধুরী জানান, যেদিন আমি তায়াকোয়ানদো প্রতিযোগিতায় মেডেল পাই সেই নিউজ টেলিভিশনে প্রচার করা হয়েছিলো এবং হাজব্যান্ড ঐ নিউজ দেখেন। আমি যখন বাসায় যাই তখন তিনি আমাকে ফুল দিয়ে অভিনন্দন জানান। এটি একটা বড় পাওয়া যে আমার স্বামী আমাকে সাপোর্ট দিচ্ছেন।

জোবাইদা নাজনীন চৌধুরী নতুন প্রজন্মের নারী উদ্যোক্তাদের জন্য একজন উদাহরণ হতে পারেন। কিভাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে হয়, নিজের আত্মপরিচয়ে বলিয়ান হতে হয় এ বিষয়ে তার কাজ দেখে শেখার আছে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সমাজে শত বাধা থাকবে- সেগুলোকে উপেক্ষা করে চলার জন্য একটা সংগ্রামী মনের প্রয়োজন। আর এর জন্য চাই ধৈর্য্য এবং কাজে লেগে থাকার প্রবল ইচ্ছা। তাই নতুন প্রজন্মের উদ্যোক্তাদের বলবো- নিজের কাজের প্রতি সৎ থেকে লেগে থাকুন- সাফল্য আসবেই আসবে।
পারিবারিক জীবনে জুবাইদা নাজনীন চৌধুরী তিন ছেলের একজন আদর্শ মা। বড় ছেলে জায়েন মাহবুব মোহাইমিন ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ থেকে এ বছর বিবিএ পাশ করেছেন। মেঝোছেলে জারিফ মাহবুব মোতাব্বির কার্ডিফ ইন্টারনাশনাল স্কুল এন্ড কলেজ থেকে চলতি বছর ‘ও’ লেভেল পরীক্ষায় অংশ নেবেন। আর ছোট ছেলে জিসান মাহবুব মুনাদির মানারাত ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে ৭ম গ্রেডে পড়ছেন। তার স্বামী মাহবুব আলম ব্যবসার পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক কাজের সাথে যুক্ত আছেন।