প্রবাস মেলা ডেস্ক: ‘নুরু, পুশি, আয়েশা, শফি সবাই এসেছে, আম বাগিচার তলায় যেন তারা হেসেছে’… সত্যিই সেদিন চট্টগ্রামবাসীর প্রাণের মেলা বসেছিল, তবে আম বাগিচায় নয়, সবুজ শ্যামলীমায় ঘেরা টরন্টোস্থ এডামস পার্কের বিশাল বৃক্ষরাজির তলায়। নুরু, পুশি, আয়েশা, শফি না আসলেও টরোন্ট এবং আশেপাশের অনেক শহর থেকে মায়ার টানে ছুঁটে এসেছিলেন হাজারো চট্টগ্রামবাসী। সেদিন এডামস পার্ক পরিণিত হয়েছিল কানাডার বুকে এক খন্ড ‘চট্টগ্রামে’। মহামারী করোনা আমাদের অনেকদিন বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিল। আবার একত্রে মিলতে পেরে উচ্ছাসে আনন্দে মেতে উঠে সবাই। সুদূর বাংলাদেশ থেকে আমাদের এই আনন্দযজ্ঞে যোগ দিয়েছেন দৈনিক পূর্বকোণ পত্রিকার সম্পাদক জসীম উদ্দিন চৌধুরী এবং বিশিষ্ট শিল্পপতি আই এফ আই সি ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদের সম্মানিত চেয়ারম্যান লিয়াকত আলী। এছাড়াও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন অধ্যাপক ড. শাহাদাত হোসেন খান এবং অধ্যাপক ড. সদরুল হক চৌধুরী স্যার সহ আরো অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের উপস্থিতি আমাদেরকে উৎসাহিত করেছে। গরম গরম ছেকা পরোটা আর মুরগির কলিজা দিযে মুগ ডাল সাথে নাসির ভাইয়ের ধোঁয়া উঠা চায়ের আমেজ দিযে দিনের সকাল শুরু হওয়া অনুষ্ঠানের সমাপ্তি হয় ঝালমুড়ি আর বৈকালিক বেলা বিস্কিট আর চা দিযে। এরই ফাঁকে একদিকে ভিন্ন আঙ্গিকে দেশীয় খেলাধুলা-শাড়ী, চুড়ি, পাঞ্জাবীর দোকান-দেশীয় পিঠাপুলি আর মেহেদীর লাল রঙে হাত রাঙানোর মেলা। অন্যদিকে তানভী হকের সঞ্চালনায় চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গান এবং চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী মাইজভাণ্ডারী গান সহ রকমারি গানের সুর লহরীর মূৰ্ছনা। থেলা, মেলা, খাওয়া-দাওয়া আর গানে-উচ্ছাস ছিল প্রাণে প্রাণে। মায়ার টানে একসাথে ভোজনে অংশগ্রহণ করেছিল প্রায় দেড় হাজার মানুষ।

‘একের ভিতর অনেক’ মডেলের এবারের পিকনিকের থিম ছিল ‘খেলা আর মেলা’। গতানুগতিক খাওয়া দাওয়া ভিত্তিক বনভোজনের প্রচলিত ধারণার বাইরে এসে একটা বিনোদনধর্মী আয়োজনের মাধ্যমে উপস্থিত সবাইকে একটু আনন্দ দেয়ার প্রয়াস ছিল সমগ্র অনুষ্ঠানটিতে। খেলাধুলা পর্বে মূলধারার দেশীয় খেলাগুলোকে উপস্থাপন করে আমাদের দ্বিতীয় প্রজন্মের কাছে পরিচিত করা হয়েছে। যেমন খুশি তেমন সাঁজ, ‘মোরগ লড়াই, বিস্কিট দৌড়, বলী খেলা সহ আরো অনেক ধরনের খেলার আয়োজন ছিল বনভোজনের এই মহাযজ্ঞে। ছিল প্রীতি ফুটবল ম্যাচ এবং প্রীতি ক্রিকেট ম্যাচের আয়োজন। ক্রিকেট এবং ফুটবলের পরিচালনায় ছিলেন আমাদের স্পোর্টস সেক্রেটারি আনোয়ার সালাম সহ-স্পোর্টস সেক্রেটারি সাক্ষর বড়ুয়া এবং সংগঠনের ক্রীড়া কর্মকর্তা রোকনুজ্জামান চৌধুরী। সবচেয়ে আকর্ষণীয়, উপভোগ্য এবং প্রসংশিত ছিল ‘বলি খেলা’।

কানাডার বুকে চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী বলী খেলা, আহ! যেন লালদীঘির মাঠে জব্বারের বলীখেলা। এই প্রথমবারের মত কানাডায় এই ধরণের প্রতিয়োগীতা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সর্বমোট ৮ জন বলি অংশ নেন। শওকত বলী (মোহাম্মদ শওকত আলী) এবারে চ্যাম্পিয়ন হন এবং রনি বলি রানার্স আপ হন। অন্যান্য বলির ছিলেন: সিরাজুল ইসলাম, মাহবুবুল ইসলাম সাইফুল, শাহজাহান, তানভী হক। আকাশ, তানভীর এবং বেলাল। খেলা পরিচালনা করেন বীর মুক্তিয়োদ্ধা শাহজাহান। নাঈমা ফারদৌসীর নেতৃত্বে স্পোর্টস পরিচালনায় ছিলেন, নাহিদ বেলী, শাহজাদী আকতার, নাহেদ পারভিন, তেহজিনা এমদাদ নুপুর, রফিকুল ইসলাম, শেখ জসীম উদ্দিন, নাজমা বেগম, মাহফুজা সোবহান সহ আরো অনেকেই।

খেলাধুলা আর খাওয়া দাওয়ার পাশাপাশি চলতে থাকে আমাদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। গান, কবিতা আর কথার ব্যঞ্জনায় মুখরিত ছিল সারাদিনমান। বিশিষ্ট নাট্যাভিনেতা ও নাট্যকার তানভী হক এবং নাহিদ বেলীর সঞ্চালনায় এই পর্বে অংশ নেন টরোন্টোর অত্যন্ত পরিচিত শিল্পী মেহজাবিন বিনতে ওসমান, কাজী আব্দুল বাসিত, সিরাজি, ইউশা, সামান্থা, মুন্নী এবং তানভী এবং আবৃত্তি করেন মাহফুজা সোবহান। সাংস্কৃতিক পর্বের সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন এবং দর্শক নন্দিত পর্ব ছিল তানভী ভান্ডারী এবং তার দলের পরিবেশনায় মাইজভাণ্ডারী গান। মুহুর্মুহু করতালি আর নাচে গানে দর্শকবৃন্দ উৎসাহিত করেন শিল্পীদের। দলের অন্য শিল্পীরা হলেন: ইঞ্জিনিয়ার সিরাজুল ইসলাম, সাজ্জাদ হোসেন, নাঈমা ফারদৌসী, শামীমা আকতার সীমা, নাজমা বেগম এবং নাহিদ আকতার বেলী। ভান্ডারী গানের পরিকল্পনা এবং পরিচালনায় ছিলেন বিশিষ্ট শিল্পী তানভী হক। বনভোজনের আরেক আকর্ষণ ছিল শাহ আমানত উল্লাহ রিন্টুর বানানো বিশাল ফটোফ্রেম। এতে চট্টগ্রামের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানসমূহের উল্লেখ ছিল। যা আমাদের নতুন প্রজন্মের চট্টগ্রাম সম্পর্কে অনেক তথ্য জানতে সহায়তা করে। ফটোফ্রেমটি সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত আহসানুল বারী লাবুর নেতৃত্বে যারা খাবার পরিবেশনার দায়িত্বে ছিলেন কাওসার সুমন, মোহাম্মদ এরশাদ, সেকান্দার আলি, শেখ জসিম, শুভঙ্কর দে, উজ্জ্বল চৌধুরী, অপূর্ব ভৌমিক, নাসির, মাহবুবুল ইসলাম সাইফুল, সিরাজুল ইসলাম, মাকসুদ, সাহেদ তাহের, আইনুল কবির, জয়নাল আবেদীন, মোহাম্মদ জসীম, শাহানা পারভীন, শাহজাদী আখতার মিনু, আমিন চৌধুরী সহ আরো অনেকেই। রান্না-বান্নার এই বিশাল কর্মযজ্ঞ যিনি নিবিড়ভাবে তত্বাবধান করেন তিনি হলেন বীর মুক্তিয়োদ্ধা শাহজাহান।

অর্ভ্যথনা ও রেজিস্ট্রেশনে যারা ছিলেন: আনোয়ারুল হাকিম আরজু, মিনহাজ আজম, ড. হাসানুল আবেদীন ফরহাদ, শহীদ উল্লাহ ও রফিকুল ইসলাম। এবারের রাফল ড্রর সবচেয়ে আকর্ষণীয় পুরস্কার ছিল মঞ্জুর চৌধুরীর সৌজন্যে টরন্টো-ঢাকা-টরন্টো বিমান টিকেট। দ্বিতীয় পুরস্কার ছিল সাহেদ তাহেরের সৌজন্যে স্যামসাং ৬৫ ইঞ্চি টেলিভশন। এছাড়াও Ipad, Iroomba রোবট সহ আরো অনেক আকর্ষণীয় পুরস্কার ছিল। রাফল ড্র তত্ত্বাবধান করেন শেখ জসিম, শওকত আলী, মাকসুদুল আলম ও জামাল উদ্দিন।

পরিশেষে সংগঠনের সভাপতি বীর মুক্তিয়োদ্ধা মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়ার প্রাঞ্জল বক্তব্যের মধ্য দিয়ে দিনের শেষ পর্ব পুরস্কার বিতরণ ও রাফল ড্র শুরু হয়। সভাপতি অনুষ্ঠানে আগত সবাইকে তাদের সময় এবং সহযোগিতার জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। তিনি বলেন অনুষ্ঠানের সকল সার্থকতা আপনাদের আর সকল ব্যথর্তা আমাদের। খাবার দাবারে কিছুটা অসুবিধার জন্যে তিনি সবার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মঞ্জুর চৌধুরী তার বক্তব্যে সবাইকে ধন্যবাদ জানান। সেই সাথে অনুষ্ঠানে যারা আর্থিক পৃষ্টপোষকতা করেছেন তাদের আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানান। তিনি আগামী অক্টোবরে চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী মেজবানীতে আসার জন্যে সবাইকে আমন্ত্রণ জানান। পিকনিক কমিটির আহ্বায়ক ইঞ্জিনিয়ার সিরাজুল ইসলাম ও সবাইকে অনুষ্ঠানে আসার জন্যে আন্তরিক ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন এবং যে সমস্ত স্বেচ্ছাসেবকদের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফসল এতবড় একটা সফল অনুষ্ঠান তাদের ধন্যবাদ জানান।
এই পর্বে আরো বক্তব্য রাখেন সংগঠনের সিনিয়র সহ সভাপতি কাজী ওসমান, অর্থ সম্পাদক মাহবুবুল ইসলাম সাইফুল, সহ-সভাপতি এমদাদ চৌধুরী, সহ-সভাপতি হুসাইনুজ্জামান শামীম, যুগ্ম আহ্বায়ক আমিন চৌধুরী, সাহেদ তাহের, মোহাম্মদ শাহজাহান আরো অনেকেই। পুরো অনুষ্ঠানটি সার্বিক পরিচালনায় ছিলেন বনভোজন কমিটির সদস্য সচিব সাজ্জাদ হোসেন। সংগঠনের সকলের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় চট্টগ্রাম সমিতি কানাডা একটা প্রাণবন্ত ও পরিচ্ছন্ন অনুষ্ঠান উপহার দিলো যা স্মরণীয়, বরণীয় এবং অনুকরণীয় হযে থাকবে অনেকদিন।