তানজিলা তাবাসসুম নকশী: বহু দিন ধরে, বহু ক্রোশ দূরে, বহু ব্যয় করি, বহু দেশ ঘুরে দেখিতে গিয়েছি পর্বতমালা, দেখিতে গিয়েছি সিন্ধু। দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া, ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া একটি ধানের শীষের উপরে একটি শিশিরবিন্দু। উপরের লেখাটির যথার্থতা শতভাগ প্রকাশ পায় আমাদের নিজ দেশে অবস্থিত পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজারের ক্ষেত্রে। যুগের সাথে তাল মিলিয়ে আমরা এখন অনেক জীবন সচেতন এবং ভ্রমণপিপাসু হয়ে উঠেছি। সেটা অবশ্যই ইতিবাচক। তবে পৃথিবী ঘুরে দেখবার আগে নিজের দেশকে চেনা বাঞ্চনীয়। গত ৭/৮ বছরে ক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের তটে এসেছে আমূল পরিবর্তন। অর্থনৈতিক বিশ্বায়নের কারণে সেখানে বেড়েছে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ। স্রষ্টার অপার আনুকুল্যে সব শ্রেণীর মানুষের জন্যই সেখানে তৈরী হয়েছে আমোদ-প্রমোদের অভয়ারণ্য।

কিভাবে যাবেন এবং থাকবেন কোথায়
খুব সম্ভবত এটিই পৃথিবীর সবচেয়ে সুলভ সমুদ্র সৈকত যেখানে সর্বনিম্ন খরচে যেকোনো পর্যটক ভ্রমণবিলাস করতে পারবে। তা সে উচ্চ, মধ্য বা নিম্ন যেই আয়ের লোকই হোক না কেন। সেখানে যেমন আছে আকাশ পথে যাতায়াতে সময় ও আরামের সহজলভ্যতা ঠিক তেমনই আছে বিলাসবহুল আবাসন ব্যবস্থা। অপরদিকে এসি-নন এসি বাস এবং ৫,৪,৩,২ তারকা হোটেল থেকে শুরু করে খুব নাগালের মধ্যে এবং অল্প সুবিধাজনক হোটেলও আছে। আপনার শুধু ইচ্ছেটা প্রয়োজন সেখানে যাবার। বাকিটা ওপরওয়ালাই করে দেবেন। আমার মনে হয় স্রষ্টা ও সৃষ্টির প্রতি সম্মান জানাতে হলেও বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের একবার হলেও সেখানে পা ফেলা উচিৎ। যাদের বাজেটে ঘাটতি নেই তারা পছন্দমতো যেকোনো হোটেল বা রিসোর্টে উঠে যেতে পারেন। অসংখ্য অপশন পেয়ে যাবেন। আর যারা বন্ধুবান্ধব মিলে বাজেট ট্যুর দিতে চান বা যাদের পরিবারের, আত্মীয় স্বজনের সদস্য সংখ্যা বেশী তারা ভাড়া করে নিতে পারেন সুন্দর কোনো স্টুডিও ফ্ল্যাট। এতে মাথাপিছু থাকার খরচ অনেকটাই কমে আসবে।

খাওয়া দাওয়া
সত্যি বলতে গেলে আমার মতো ভোজন রসিক যারা আছেন তারা কক্সবাজার ট্যুর থেকে ৩/৪ কেজি ওজন বাড়িয়ে আনলেও অবাক হবার কিছু নেই। খাওয়ার জন্য সাধারণ খাবার এর পাশাপাশি হরেকরকম সি-ফুড তো আছেই।

বিনোদন
বসে বসে সৈকতের সৌন্দর্য উপভোগ করবার জন্য সারাদিনের জন্য কাউচ ভাড়া করে নিতে পারেন, কোন কোন হোটেলের নিজস্ব কাউচও থাকে। সমুদ্র স্নানের সময় প্রয়োজনীয় কাপড়চোপড় রাখার জন্য আছে ট্যুরিস্ট পুলিশের লকার। আগে লাবনি বিচ সবচাইতে জমজমাট থাকলেও এখন কলাতলি, ইনানী ও অন্য বীচগুলোতেও ভিন্নতা এসেছে। ওয়াটার রাইডগুলোও পাবেন বিশ্বের যেকোনো বিচের চেয়ে সুলভে। নতুন যোগ হয়েছে প্যারাসুট! এছাড়াও সারাদিনের জন্য জীপ বা ট্যাক্সি ভাড়া করে চলে ঘুরে আসতে পারেন হিমছড়ি, মেরিন ড্রাইভ, পাথর দ্বীপ ও আরো ছোট ছোট কিছু দ্বীপে। সেইন্টমার্টিনও চলে যেতে পারেন ছোট্ট জাহাজে চেপে যদি হাতে একটু বেশি সময় থাকে। সে গল্প না হয় আরেকদিন বলবো। রাতের বেলা চলে যেতে পারেন ক্যান্ডেল লাইট ডিনার বা পুলসাইড কোন কফি শপে। প্রতি বৃহস্পতিবার বিশেষ পার্টির আয়োজন হয়, সেখানেও ঢুঁ মেরে আসতে পারেন। আর রাতের বীচ ও চাঁদের আলো দেখার ব্যাপারটা তো রইলোই।

অপার সম্ভাবনা
আমাদের দেশের নীতিনির্ধারকেরা যদি একটু সচেতন হতেন তাহলে শুধু এই একটি সমুদ্র সৈকতই আমাদের এনে দিতে পারতো লাখ লাখ বৈদেশিক মুদ্রা। এবার কক্সবাজার যেয়ে সবচেয়ে বেশি হতাশ হয়েছি বিমানবন্দরে। এটা নাকি পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত! অথচ নেই কোন বিদেশের সাথে সংযোজিত ডিরেক্ট ফ্লাইট, ভাবা যায়? এয়ারপোর্টে বিদেশি পর্যটক একেবারেই হাতে গোনা। এর প্রধান কারণ ডিরেক্ট ফ্লাইটএর অভাব। বিদেশ থেকে পর্যটক এসে অবশ্যই ঢাকা নেমে প্লেন পরিবর্তন করতে চাইবেনা। শুধুমাত্র এই সমস্যা নিরসন হলেই আমাদের পর্যটন শিল্প অনেকটা আশার আলো দেখবে। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের গভীর মনোযোগের দাবী জানাচ্ছি বেশ দৃঢ়ভাবেই! নিজ নিজ জায়গা থেকে দেশকে তুলে ধরার এ দায়িত্ব ও দায়বদ্ধতা আমাদের সবার।