| মুহাম্মদ আনোয়ার শাহাদাত হোসেন : |
মুসলমানদের প্রধান দুটি উৎসবের একটি হলো ঈদুল আযহা। আগামী ১ আগস্ট বাংলাদেশে পালিত হবে পবিত্র ঈদুল আযহা। যদিও এবার করোনা মহামারীর কারণে সামগ্রিক অর্থনৈতিক মন্দা সহ বিভিন্ন সমস্যায় অন্যান্য বারের মতো হয়তো সকলের পক্ষে পশু কুরবানি দেয়া সম্ভব হবেনে। তারপরও বাংলাদেশের মতো মুসলিমপ্রধান দেশে লাখ-লাখ পশু জবাই হবে তাতে সন্দেহ নেই। ঈদুল আযহার নামাজ শেষে সামর্থবান মুসলমানগণ আল্লাহর রাহে পশু কুরবানি দেয়। এক্ষেত্রে জবেহকৃত পশুর বর্জ্য পরিস্কারের ব্যাপারে আমাদের সকলকে সচেতন হওয়া উচিত। যত্রতত্র পশু জবেহ করে বর্জ্য যদি সঠিকভাবে পরিস্কার না করি তাহলে পরিবেশ মারাত্মক দূষিত হয় যা মোটেও উচিত নয়। পশু কুরবানি যেমন ইবাদত তেমনি পরিবেশ সংরক্ষণ করা বা পরিস্কার পরিচ্ছন্নতাও ইবাদত বটে। আপনার, আমার অবহেলা বা অসচেতনতার কারণেযদি পশুর বর্জ্য রোগ- ব্যাধি ছড়ায়, দুর্গন্ধময় পরিবেশ সৃষ্টি করে আশে-পাশের মানুষকে কষ্ট দেয় তাহলে তার দায়ভার কিন্তু আমাদের উপরই বর্তায়। তাই কুরবানি দেয়ার আগেই ঠিক করে রাখুন আপনার পশু কোথায় জবেহ করবেন। আপনার বাড়ির দূরবর্তী কোন সুবিধা মতো জায়গায় বা প্রতি এলাকায় যদি একটি নির্দিষ্ট স্থানে পশু জবেহ করা যায় তাহলে বর্জ্য পরিস্কার সহজ হয়। ঐ নির্দিষ্ট স্থানটিতে গর্ত করে সেখানে যদি পশুর রক্ত ও অন্যান্য বর্জ্য ফেলে মাটি ভরাট করে দেয়া যায় তাহলে আর দূর্গন্ধ ছড়ানোর সম্ভাবনা থাকে না।
যদি এক জায়গা সম্ভব না হয় তাহলে যেখানেই আপনি পশু জবেহ করবেন সেখানেই ছোট একটি গর্ত করে ঐ গর্তে রক্ত ও অন্যান্য উচ্ছিষ্ট ফেলে মাটি ভরাট করে দিন তাহলে পরিবেশ দূষণের হাত থেকে রক্ষা পাবেন। আর মাংস কাটার সময়ও পশুর অপ্রয়োজনীয় অংশ যা আপনি ফেলে দিবেন তা একটি নির্দিষ্ট ব্যাগে ভরে নিন তারপর মাটিতে পুঁতে ফেলুন তাতে করে দূগন্ধ ছড়াবেনা এবং পরিবেশও নষ্ট হবেনা। অনেকেই দেখা যায় পশুর নাড়ি ভূড়ি নদীতে নিয়ে পরিস্কার করে আর বর্জ্য গুলো নদীতে ছেড়ে দেয়, এটি কিন্তু মোটেই সমীচিন নয়। এতে করে নদীর পানি দূষিত হয় এবং জলজ প্রাণির ক্ষতি সাধন করে। কুরবানির পর পশুর রক্ত ও তরল বর্জ্য খোলা স্থানে রাখা যাবে না৷ কারণ, রক্ত আর নাড়িভুঁড়ি কয়েক ঘন্টার মধ্যেই দুর্গন্ধ ছড়ায়৷ আর যদি রক্ত মাটি থেকে সরানো সম্ভব না হয়, তা হলে জীবানুনাশক মেশানো পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলতে হবে৷ না হলে এই দূগন্ধ থেকে ডায়রিয়া, কলেরা সহ বিভিন্ন রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটতে পারে। এমনিতেই আমাদের দেশ অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ আর দেশে এখনও সমন্বিত কোন বর্জ্য অপসারণ ব্যবস্থা গড়ে উঠেনি। গ্রামীন পর্যায়ে তো নয়ই বরং বড় বড় শহর গুলোতেও বর্জ্য অপসারণ ব্যবস্থপনা তেমন আধুনিক নয় বা আধুনিক যন্ত্রপাতি এবং উপযুক্ত সংখ্যক দক্ষ ও প্রশিক্ষিত পরিচ্ছন্ন কর্মীও নেই। যার ফলে বর্জ্য পরিস্কার যথাযথ এবং দ্রুত হয়ে উঠেনা। প্রায়ই দেখা যায় কুরবানির পশুর রক্ত, মল-মূত্র বা অন্যান্য উচ্ছিষ্ট যেখানে সেখানে পড়ে থাকে এবং অসহনীয় দূর্গন্ধ ছড়ায়। বিভাগীয় শহরগুলোতে সিটি কর্পোরেশনের পরিচ্ছন্নতা কর্মী থাকলেও যে পরিমান বর্জ্য জমা হয় সেই অনুযায়ী খুবই অপ্রতুল এবং অব্যবস্থাপনা ও অদক্ষতা তো রয়েছে।
পৃথিবীর সব ধর্মেই পরিচ্ছন্নতার উপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য বিজ্ঞানেও শরীর সুস্থ রাখার জন্য যেসব পন্থা বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন, তার মধ্যে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা সর্বশ্রেষ্ঠ পন্থা। তাই সবকিছু সরকারের উপর ছেড়ে না দিয়ে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় আমাদেরকে এগিয়ে আসতে হবে। আসন্ন কুরবানিতে গরুর গোবর, ময়লা- আবর্জনা, কুরবানির পশুর রক্ত, উচ্ছিষ্ট গন্ধ ছড়ানোর পূর্বেই পরিষ্কার করতে হবে নিজের তাগিদে, ধর্মীয় ও সামাজিক দায়িত্ববোধ থেকে। আমাদের চারপাশ আমাদেরকেই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে এবং অপরকেও পরিস্কার পরিচ্ছন্নতায় উদ্বুদ্ধ করতে হবে। কুরবানির পর আমাদের সচেতনতা ও দায়িত্ববোধ পারে স্বাস্থ্যকর পরিবেশ বজায় রাখতে। শুধু পশু কুরবানির মাধ্যমেই ত্যাগ শব্দটি সীমাবদ্ধ রাখা ঈদুল আযহার একমাত্র শিক্ষা নয় বরং প্রত্যেকের বাস্তব জীবনে ত্যাগের অনুশীলন করতে হবে তবেই কুরবানির প্রকৃত শিক্ষা আমরা কাজে লাগাতে পারব।
লেখক: কলামিস্ট, সৌদি আরব প্রবাসী