সুফি আসমার আলী, হংকং থেকে: বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে খুব অল্প সংখ্যক স্বনামধন্য তারকা বিচরণ করছেন বা করেছেন। সদ্য প্রয়াত এণ্ড্রু কিশোর সে সব বিরল তারকাদের মধ্য একজন অন্যতম তারকা যিনি বাংলাদেশের সিনেমার গানের ভূবনে আপন আলোয় চির উদ্ভাসিত থাকবেন। তিনি এই পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে গত ৬ই জুলাই ২০২০ তারিখে পরলোকে গমন করেন। তাঁর এই অকাল মৃত্যুতে বাংলাদেশের সঙ্গীত জগতে যে শূণ্যতার সৃষ্টি হ’লো সেটা আর কোনোদিন পূরণ হবে বলে মনে হয়না। আমরা শোকাহত এবং তাঁর শোক সন্তপ্ত পরিবারের প্রতি আমাদের গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি। মৃত্যুকালে তিনি তাঁর স্ত্রী, এক পুত্র ও এক কন্যা এবং অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গ্যাছেন।

প্রাথমিক পর্যায়ে কেমো চলাকালে হাসপাতালে
এণ্ড্রু কিশোর ওরফে কিশোর কুমার বাঁড়ুই, ১৯৫৫ সালের ৪ঠা নভেম্বর রাজশাহী নগরীর এক খৃষ্টান পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেছিলেন। তিনি রাজশাহী কোর্ট একাডেমী স্কুল থেকে ১৯৭০ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন এবং ১৯৭২ সালে রাজশাহী সিটি কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক সমাপ্ত করেন। এরপরে ১৯৭৩ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যবস্থাপনা বিভাগে স্নাতক সম্মান বিষয়ে ভর্তি হন। ১৯৮০ সালে একই বিষয়ে তিনি মাষ্টার্স ডিগ্রী অর্জন করেন।
তাঁর পরিবার ছিল একটি সঙ্গীত প্রেমী পরিবার। বড় বোন মিসেস শিখা বিশ্বাস ছোট বেলা থেকেই গান শিখতেন আর বড় ভাই মরহুম স্বপন কুমার বাঁড়ুই নিতেন তবলার তালিম। তাই তিনি খুব ছোট বেলা থেকেই দিদি ও দাদা’র পদাঙ্ক অনুসরণ করেন। তাঁদের সঙ্গীত গুরু ছিলেন মরহুম আব্দুল আজিজ বাচ্চু।

স্কুল জীবনে তিনি আন্তঃস্কুল সঙ্গীত প্রতিযোগীতায় একাধিক বার চ্যাম্পিয়ন হবার গৌরব অর্জন করেছিলেন। তখন থেকেই রাজশাহী জেলার ছাত্র সমাজে তাঁর সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল। ৭০ দশকের গোড়ার দিকেই তিনি রাজশাহী বেতার কেন্দ্রে রবীন্দ্র সঙ্গীত শিল্পী হিসাবে অন্তর্ভুক্ত হন। তবে পরবর্তী সময়ে তিনি আধুনিক গান গাইতে আরম্ভ করেছিলেন এবং আধুনিক গানের শিল্পী হিসাবেই সমাদৃত হয়েছিলেন। তিনি আসলে সব ধরণের গান গাইতেন। বিশ্ববিদ্যালয় তথা রাজশাহী শহরে তিনি অনেক বিচিত্রানুষ্ঠানে সঙ্গীত পরিচালনা করেছেন।
৭০ দশকের শেষ ভাগে তিনি প্রথম প্লে-ব্যাক করেন “মেল ট্রেইন’ ছবির একটা গানে। কিন্তু দূর্ভাগ্য বশতঃ সেই ছবিটি শেষ পর্য্যন্ত প্রকাশ পায়নি। এরপরে কন্ঠ দিলেন “এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী” ছবির গানে। তারপর, “প্রতিজ্ঞা” ছবিতে বদলী গায়ক হিসাবে কন্ঠ দিয়েছিলেন “এক চোর যায় চলে” গানটিতে। গানটি এতই জনপ্রিয়তা পেয়েছিল যে, কিশোর’কে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। অচিরেই তিনি বাংলাদেশের সিনেমার গানের জগতে পুরুষ কন্ঠের একছত্র অধিপতি হিসাবে নিজেকে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তাঁর সঙ্গীতের খ্যাতি দেশ-বিদেশে এতটাই ছড়িয়ে গিয়েছিল যে, উপ-মহাদেশের কিংবদন্তি সঙ্গীত পরিচালক রাহুল দেব বর্মন ৮০’র দশকে ভারতীয় ছায়া ছবিতে গান গাওয়ার জন্য তাঁকে আহবান করেছিলেন। তিনি একাধিক ভারতীয় ছবিতেও প্লেব্যাক করেছেন।

তিনি তাঁর সঙ্গীতের শিক্ষাগুরু ওস্তাদ আব্দুল আজিজ বাচ্চু’র প্রতি সন্মান প্রদর্শণ করতে “ওস্তাদ আব্দুল আজিজ বাচ্চু” স্মৃতি সংসদ নামে রাজশাহীতে একটি প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেছেন। অনেক সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্য ও সাংস্কৃতিক অনুরাগীদের তিনি সেখানে অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। মৃত্যুর আগে পর্য্যন্ত তিনি প্রতিষ্ঠানটির সভাপতির পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন।
তাঁকে আমি কাছ থেকে যতটুকু দেখেছি, তিনি ছিলেন, একজন নিষ্ঠাবান, মার্জিত ভদ্রলোক। তিনি একজন কর্তব্যনিষ্ঠ স্বামী ও পিতা ছিলেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য আরেকটি গুন ছিল এই যে, তিনি ছিলেন নম্র স্বভাবের বন্ধু বৎসল একজন ব্যক্তি। তিনি হাসিমুখে সহজ ভাবে মানুষের সাথে মিশতে জানতেন। কিংবদন্তি এই শিল্পীর ঠোঁটের কোণায় লেগে থাকা সেই নিস্পাপ হাসিটি যেন তাঁর সুধা কন্ঠের অলংকার হয়েই আমাদের মধ্যে বেঁচে থাকে।