প্রবাস মেলা ডেস্ক: কানাডার ক্যালগেরিতে বুধবার (২৭ মে, ২০২৬) ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও উৎসবমুখর পরিবেশে পবিত্র ঈদুল আজহা পালিত হয়েছে। মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি ও ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত এই উৎসবে শহরের বিভিন্ন স্থানে হাজার হাজার মুসলিম সমবেত হয়ে ঈদের নামাজ আদায় করেন।
কানাডার আলবার্টা প্রদেশের অন্যতম প্রধান শহর ক্যালগেরিতে বুধবার (২৭ মে, ২০২৬) উদযাপিত হয়েছে মুসলিম সম্প্রদায়ের দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব পবিত্র ঈদুল আজহা। বিশ্বজুড়ে চলমান বিভিন্ন সংকটের অবসান এবং শান্তি কামনায় বিশেষ দোয়ার মাধ্যমে শুরু হয় ক্যালগেরির মুসলিম জনগোষ্ঠীর ঈদের দিনটি।
মুসলিম কাউন্সিল অফ ক্যালগেরি (MCC)-এর তথ্যানুযায়ী, এবার ক্যালগেরি ও এর আশপাশের এলাকায় রেকর্ডসংখ্যক মুসল্লি ঈদের নামাজে অংশ নেন। ধারণা করা হচ্ছে, শহরের বিভিন্ন ভেন্যুতে সব মিলিয়ে প্রায় ৫০ হাজার থেকে ৬০ হাজার মুসলিম ঈদের জামাতে শামিল হয়েছেন।
ক্রমবর্ধমান মুসলিম জনগোষ্ঠীর সুবিধার্থে এবং ভিড় এড়াতে এবার ক্যালগেরির ২০টিরও বেশি স্থানে বহুমাত্রিক জামাতের ব্যবস্থা করা হয়। এর মধ্যে প্রধান প্রধান কেন্দ্রগুলো হলো:
বায়তুল মোকাররম ইসলামিক সেন্টার ক্যালগেরি মসজিদ
প্রবাসী বাংলাদেশিদের দ্বারা পরিচালিত এই মসজিদে সকাল ৭:৩০ এবং ৮:৩০ মি এ দুইটি জামাত অনুষ্ঠিত হয়।
জেনেসিস সেন্টার (Genesis Centre)
উত্তর-পূর্ব (NE) ক্যালগেরির এই সেন্টারে আল-হেদায়া ইসলামিক সেন্টারের উদ্যোগে সকাল ৬:৩০ থেকে ১০:৩০ পর্যন্ত পর পর ৫টি বিশাল জামাত অনুষ্ঠিত হয়।
ক্যালগেরি ইসলামিক সেন্টার
দক্ষিণ-পশ্চিমের এই ঐতিহ্যবাহী মসজিদে সকাল ৭:৩০, ৯:০০ এবং ১০:৩০ মিনিটে ৩টি জামাত অনুষ্ঠিত হয়।
আল মদিনা ক্যালগেরি ইসলামিক এসেম্বলী
এখানে মুসল্লিদের উপচে পড়া ভিড় সামলাতে সকাল ৬:৩০ থেকে বেলা ১১:০০টা পর্যন্ত মোট ৬টি পৃথক জামাত আয়োজন করা হয়।
এছাড়াও শহরের উত্তর-পশ্চিমে আল-সালাম সেন্টারসহ বিভিন্ন পার্ক, কমিউনিটি হল এবং স্থানীয় মসজিদগুলোতে একাধিক ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। নামাজ শেষে মুসল্লিরা একে অপরের সাথে কোলাকুলি ও ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করেন।
অন্য ধর্মবিশ্বাসীদের অংশগ্রহণ ও সম্প্রীতির বার্তা
কানাডার বহুসাংস্কৃতিক (Multicultural) সংস্কৃতির অনন্য প্রতিফলন দেখা গেছে এবারের ঈদে। ক্যালগেরির ঈদের জামাত ও পরবর্তী উৎসবগুলোতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় অন্য ধর্মবিশ্বাসী ও ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষ অংশ নেন। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, সিটি কাউন্সিলর, বিভিন্ন চার্চ ও সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা মুসলিম কমিউনিটির আমন্ত্রণে ঈদ পুনর্মিলনীতে যোগ দেন। অনেক অমুসলিম প্রতিবেশী মুসলিম পরিবারগুলোর দেওয়া দুপুরের খাবারে ও গেট-টুগেদারে অংশ নিয়ে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করেন। এই অংশগ্রহণ ক্যালগেরির আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতি ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধকে আরও সুদৃঢ় করেছে।
ক্যালগেরির সমাজে ঈদের প্রভাব
ক্যালগেরির স্থানীয় অর্থনীতি এবং সামাজিক বন্ধনে ঈদুল আজহার প্রভাব ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট:
১. অর্থনৈতিক গতিশীলতা: ঈদকে কেন্দ্র করে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে স্থানীয় হালাল গ্রোসারি, মাংসের দোকান এবং বুটিক শপগুলোতে ছিল উপচে পড়া ভিড়। কানাডার নিয়মানুযায়ী ফার্ম ও লাইসেন্সপ্রাপ্ত কসাইখানার মাধ্যমে কোরবানি সম্পন্ন করায় স্থানীয় কৃষি ও পশুপালন খাতে বড় ধরনের অর্থনৈতিক প্রবাহ তৈরি হয়েছে।
২. দাতব্য কার্যক্রম ও মানবতা: ঈদের অন্যতম মূল শিক্ষা অনুযায়ী, ক্যালগেরির মুসলিমরা বিপুল পরিমাণ অর্থ ও মাংস স্থানীয় ফুড ব্যাংক এবং বিভিন্ন চ্যারিটি সংস্থায় দান করেছেন। বিশেষ করে যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজা, সুদান ও লেবাননের দুর্গত মানুষদের সহায়তায় বিশেষ তহবিল সংগ্রহ করা হয়।
৩. সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন: বিভিন্ন দেশের ও ভাষার মানুষ একই কাতারে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করায় শহরের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য আরও দৃশ্যমান হয়েছে। মেহেন্দি উৎসব, ফেস পেইন্টিং ও শিশুদের জন্য বিশেষ উপহারের আয়োজন পুরো শহরে এক উৎসবমুখর আমেজ তৈরি করে।
নামাজ শেষে খুতবায় ইমামগণ বিশ্বশান্তি, বিশেষ করে ফিলিস্তিনসহ বিশ্বের সকল নিপীড়িত মানুষের জন্য দোয়া করেন। একই সাথে কানাডার মাটিতে একজন আদর্শ ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে ইসলামের মানবিক মূল্যবোধ বজায় রাখার আহ্বান জানানো হয়। সব মিলিয়ে, ক্যালগেরির ঈদুল আজহা কেবল একটি ধর্মীয় উৎসবই ছিল না, বরং তা হয়ে উঠেছে শান্তি, সম্প্রীতি ও মানবিক কল্যাণের এক অনন্য মিলনমেলা।