প্রবাস মেলা ডেস্ক: যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘ইরানকে ধ্বংস করে দেয়ার’ হুমকির কড়া জবাব দিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দেয়া ভাষণে তিনি বলেছেন, নিষেধাজ্ঞা, বাড়তি চাপ ও গুণ্ডামির মুখে ইরানি জনগণের প্রতিরোধ আরও বাড়বে, তবে ইরান কখনোই মাথা নত করবে না। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ প্রত্যাহারসহ কূটনীতি ও আলোচনার মাধ্যমে সংঘাতের সমাধানে তেহরান প্রস্তুত বলেও জানান তিনি।
সংবাদমাধ্যম বিবিসি বলছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘দ্রুত চুক্তি না হলে ইরানকে ধ্বংস করে দেয়ার’ হুমকির জবাবে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দেয়া ভাষণে পেজেশকিয়ান এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, যেকোনো চুক্তির অংশ হিসেবে ইরানি জাহাজের জন্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ ব্যবহারে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ বন্ধ করতে হবে।
পেজেশকিয়ান বলেন, ‘সবাই হরমুজ প্রণালি থেকে সুবিধা নেবে, অথচ আমাদেরই সেখানে প্রবেশাধিকার থাকবে না—তা হতে পারে না।’
এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। অবশ্য পেজেশকিয়ানের ভাষণ শুরুর সময়ই যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদল অধিবেশন কক্ষ থেকে বেরিয়ে যায়। নিউইয়র্কে জাতিসংঘের অধিবেশনে ইরানের প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট আমাদের সন্ত্রাসী হিসেবে বর্ণনা করেছেন। অথচ আমরা সন্ত্রাসবাদের শিকার।’
এরপর তিনি ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির একটি ছবি তুলে ধরেন। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে হামলা শুরু করলে নিজের বাসভবনে হামলায় নিহত হন খামেনি।
পেজেশকিয়ান ওই দিন মিনাবের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও লামার্দের একটি ক্রীড়া কমপ্লেক্সে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহতদের কয়েকজনের ছবিও দেখান। ইরান বলে আসছে, ওই দুই হামলায় ১৭৫ জনের বেশি বেসামরিক মানুষ নিহত হন, যাদের দুই-তৃতীয়াংশই শিশু। তবে লামার্দে হামলার কথা যুক্তরাষ্ট্র অস্বীকার করেছে এবং মিনাবে কী ঘটেছিল, তা এখনো তদন্ত করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে।
পেজেশকিয়ান বলেন, ‘আমাদের নিরপরাধ মানুষকে কাপুরুষোচিত হামলা ও আগ্রাসনের লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। আর আমরা সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে নিজেদের রক্ষা করেছি।’
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ব্যাপক বিমান হামলার জবাবে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি থাকা প্রতিবেশী উপসাগরীয় আরব দেশগুলোতে প্রাণঘাতী ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায় ইরান। এরপর উপসাগর, ওমান সাগর ও আরব সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়ে হরমুজ প্রণালিও কার্যত বন্ধ করে দেয় ইরান। বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস পরিবহনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ সাধারণত এই নৌপথ দিয়ে যায়। এর জবাবে এপ্রিল মাসে ইরানের বন্দর ও জাহাজের ওপর অবরোধ আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র।
জুনে যুদ্ধ বন্ধ এবং হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেয়ার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে প্রাথমিক একটি সমঝোতা হয়েছিল। তবে ইরান আবার জাহাজে হামলা শুরু করার পর কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সেই সমঝোতা ভেঙে যায় এবং যুক্তরাষ্ট্রও অবরোধ পুনর্বহাল করে।
ইরান হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে এবং এই নৌপথ ব্যবহারকারী জাহাজগুলোর কাছ থেকে ফি আদায় করতে চায়। তবে যুক্তরাষ্ট্র এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে।
গত মঙ্গলবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দেয়া ভাষণে ট্রাম্প বলেন, তিনি একটি ‘বড় সিদ্ধান্তের’ মুখোমুখি হয়েছেন। হয় এমন একটি চুক্তিতে যেতে হবে, যার মাধ্যমে ইরানিরা নিজেদের দেশ পুনর্গঠন করতে পারবে, অথবা ‘ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে দ্রুত ধ্বংস’ করে দেয়া হবে।
পেজেশকিয়ান ট্রাম্পের এই হুমকিকে ‘গুণ্ডামির মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ’ বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ‘(ট্রাম্পকে) অবশ্যই জানতে হবে যে নিষেধাজ্ঞা, বাড়তি চাপ ও গুণ্ডামির মুখে ইরানি জনগণের প্রতিরোধ আরও বাড়বে। আমরা কখনোই মাথা নত করব না বা আত্মসমর্পণ করব না।’
তবে একই সঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমরা শক্তির ভাষা মেনে না নিয়ে সংলাপ, কূটনীতি ও আলোচনার জন্য প্রস্তুত’। যেকোনো চুক্তির অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের যে অবরোধ প্রত্যাহার করতে হবে, সে বিষয়েও স্পষ্ট অবস্থান জানান পেজেশকিয়ান।
ইরান শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক কর্মসূচি পরিচালনার অধিকার ছাড়বে না বলেও জানান তিনি। একই সঙ্গে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কোনো চেষ্টা করবে না বলেও পুনর্ব্যক্ত করেন।