শিবব্রত গুহ, কোলকাতা, ভারত: আমাদের দেশ ভারতবর্ষে অনেক বিদ্রোহ সংঘঠিত হয়েছিলো। তার মধ্যে একটি বিদ্রোহের নাম হলো নীল বিদ্রোহ। এটি ছিল এক কৃষক বিদ্রোহ। ভারতীয় উপমহাদেশের মাটি নীল চাষের জন্য বিশেষ উপযোগী হওয়ায় ব্রিটিশ নীলকরেরা নীলচাষে বিপুল পুঁজি বিনিয়োগ করেছিলো। নদীয়া, যশোর, বগুড়া, রংপুর ইত্যাদি জেলায় নীলচাষ শুরু হয়েছিলো। উনিশ শতকের শেষের দিকে নীলচাষ লাভজনক না হওয়ায় কৃষকেরা নীল চাষ ছেড়ে ধান ও পাট চাষের দিকে ঝুঁকে পড়েছিলো।
ব্রিটিশ নীলকরেরা তাই দেখে প্রমাদ গুনেছিল। তারা তখন দমন-পীড়ন নীতির আশ্রয় নিয়েছিলো। প্রথম দিকে নীলচাষে একচেটিয়া অধিকার ছিলো ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির। ১৮৩৩ সালের সনদ আইনের ফলে তাদের সেই একচেটিয়া অধিকার হয়েছিলো বিলুপ্ত। ব্রিটিশ মুলুকের থেকে দলে দলে, ইংরেজ নীলকর সাহেবরা বাংলায় এসেছিলো। বাংলায় এসে তারা ইচ্ছেমতো নীল চাষ শুরু করেছিল। তখন থেকেই শুরু হয়েছিলো নীলচাষীদের ওপরে অত্যাচার। এই অত্যাচার ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। এর ফলে ১৮৫৯ সালের ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসে নীলচাষীরা এক হয়ে নীল চাষ করতে অসম্মতি প্রকাশ করে। প্রথমদিকে অবশ্য এই আন্দোলন ছিল অহিংস। কিন্তু নীলচাষ না করার জন্য নীলচাষীদের ওপরে নীলকর সাহেবরা প্রচন্ড অত্যাচার শুরু করে দেয়। নীলচাষীদের ধরে ধরে গ্রেফতার করা হতে থাকে। এরপরে আর কোন উপায় না থাকায় এই বিদ্রোহ হয়ে ওঠে সশস্ত্র। এই বিদ্রোহ বাংলার প্রধান ধর্মীয় গোষ্ঠীদেরও সমর্থন লাভ করে। বিশেষত, চাঁদপুরের হাজি মোল্লা, যিনি ঘোষণা করেছিলেন নীলচাষ থেকে ভিক্ষা উত্তম।

প্রাচীনকাল থেকেই বাংলার বুকে নীল চাষের প্রচলন ছিল। ভারতীয় ভেষজ বিজ্ঞানের নানা বইতে, প্রাচীন প্রতিমূর্তির বর্ণে, অঙ্কিত পট ও চিত্রে তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ আছে। ইংরেজিতে নীল Indigo নামে আর গ্রিক ও রোমান ভাষায় Indicum নামে পরিচিত। উভয় শব্দই India শব্দের সমার্থবোধক। বাংলার নীল খুবই উৎকৃষ্ট প্রকৃতির ছিলো। এর সুখ্যাতি দেশে বিদেশে ছড়িয়ে পড়েছিলো।
আবার, প্রাচীন দ্রাবিড় গোষ্ঠীর মাঝেও প্রচলন ছিলো নীলের ব্যবহার। তারা বাস করতো সিন্ধু নদের তীরে। এজন্য ধারণা করা হয়, আমাদের দেশ ভারতবর্ষেই নীলের উৎপত্তি হয়েছিল। লুই বোনার্ড নামের একজন ফরাসী বণিকের মাধ্যমে, এদেশে আধুনিক পদ্ধতিতে নীল চাষ ও নীলের ব্যবহারের প্রচলন ঘটেছিলো। তিনি ১৭৭৭ সালে, আমেরিকা থেকে প্রথম নীলবীজ ও আধুনিক চাষের পদ্ধতি এদেশে নিয়ে এসেছিলেন।
১৭৭৭ সালে, বাংলায় প্রথম শুরু হয়েছিলো নীলচাষ। লুই বোনার্ডকে প্রথম নীলকর বলে মনে করা হয়। যশোর জেলার চৌগাছায় প্রথম নীল বিদ্রোহের হয়েছিলো সূত্রপাত। এই বিদ্রোহ দ্রুত বর্ধমান, বাঁকুড়া, বীরভূম, মুর্শিদাবাদ, পাবনা ও খুলনায় ছড়িয়ে পড়েছিলো। কিছু নীলকর সাহেবের বিচার করা হয় ও ফাঁসি দেওয়া হয়েছিলো। কৃষকেরা অনেক নীলকুঠিতে আক্রমণ করে সেইসব নীলকুঠি ভেঙ্গে গুড়িয়ে দেয়। নীলকরদের মাল বহনের যোগাযোগের রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়। সশস্ত্র কৃষকেরা সরকারি অফিস, থানা, স্থানীয়
ম্যাজিস্ট্রেটের কাছারি প্রভৃতির ওপরে আক্রমণ করে। এই বিদ্রোহ নীলকর সাহেবদের মনে ভয় ধরিয়ে দিয়েছিলো। তাদের পায়ের তলার মাটি কেঁপে গিয়েছিলো।

নীল বিদ্রোহের একটি বিশেষ দিক হলো, এই বিদ্রোহে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিশেষভাবে লক্ষ্য করা যায়। এই বিদ্রোহে হিন্দু মুসলমান কৃষকেরা ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধভাবে, যোগদান করেছিলো। যা সত্যিই এক চমকপ্রদ ব্যাপার। নীল বিদ্রোহ দমণ করার জন্য কঠোর দমন নীতির আশ্রয় নিয়েছিলো ব্রিটিশ সরকার। যদিও এই বিদ্রোহ ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছিলো। যা ছিলো কল্পনার অতীত! এই বিদ্রোহ সারা বাংলায় ছড়িয়ে পড়েছিলো। নদীয়ার দিগম্বর বিশ্বাস, পাবনার কাদের মোল্লা, মালদার রফিক মন্ডল এই বিদ্রোহের জনপ্রিয় নেতা ছিলেন। বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে নীলকর সাহেবদের কাছে ত্রাস হয়ে উঠেছিলেন আরেক বিদ্রোহী নেতা বিশ্বনাথ সর্দার। তিনি একাধিক নীলকুঠি করেছিলেন আক্রমণ। নদীয়ার আসান নগরের কাছে তাঁর হয়েছিলো ফাঁসি। ঐতিহাসিক সুপ্রকাশ রায়, বিশ্বনাথ সর্দারকে নীল বিদ্রোহের প্রথম শহীদ রূপে গণ্য করেছেন। যদিও ব্রিটিশরা বিশ্বনাথকে চিত্রায়িত করেছিলো
‘বিশে ডাকাত’ নামে। ঐতিহাসিক যোগেশচন্দ্র বাগল মনে করেন, যে কৃষকদের নীল বিদ্রোহের অহিংস আন্দোলন, সিপাহী বিদ্রোহের চেয়ে বেশি সফল হয়েছিলো। নীল বিদ্রোহের সংবাদ ব্রিটিশ মুলুকে পৌঁছে যায়। এই বিদ্রোহ নিয়ে সেখানে হইচই পড়ে গিয়েছিলো।
ব্রিটিশ পার্লামেন্ট নীলচাষীদের দূরবস্থার বিষয় নিয়ে, ইংরেজ শাসকদের কাছে কৈফিয়ত দাবী করেছিলো। এই বিদ্রোহ ও তার অসন্তোষের কারণ, অনুসন্ধান করার জন্য একটি কমিটি গঠন করেছিলো। এই কমিটি সবকিছু তদন্ত করে নীল গাছের দাম বৃদ্ধি করেছিলো। এতে লাভের পরিমাণ অনেক কমে যাওয়ায় নীলকর সাহেবরা সব নীল কারখানাগুলো বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছিলো।

১৮৯৫ সালে নীলের উৎপাদন কমে যাওয়ার জন্য নীলকর সাহেবরা এই ব্যবসা বন্ধ করে দিয়েছিলো। বিখ্যাত নাট্যকার দীনবন্ধু মিত্র ১৮৫৯ সালে নীল বিদ্রোহকে কেন্দ্র করে একটা নাটক লিখেছিলেন। তার নাম হল নীলদর্পণ। এই নাটকটির জনপ্রিয়তা আজও রয়েছে। আরেক বাংলা সাহিত্যের দিকপাল কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত এই নাটকের অনুবাদ ইংরেজি ভাষায় করেছিলেন।
নীল বিদ্রোহ ছিলো এক ঐতিহাসিক বিদ্রোহ। এই বিদ্রোহে নীল চাষীদের নীলকর সাহেবদের যাবতীয় অন্যায় অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের স্বতঃস্ফূর্ততা ধরা পড়েছিলো। এক্ষেত্রে তাঁদের সাহসের প্রশংসা করতেই হয়। তাঁরা নীলকর সাহেবদের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করেই এই বিদ্রোহে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। তাঁরা অসম্ভবকে সম্ভব করেছিলেন। তাঁদের এই বীরত্বের কাহিনী আজও শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে আপামর ভারতবাসী।