মার্ক লিওনার্ড, বার্লিন, জার্মানি:
ইসরায়েল এবং ইসলামিক জিহাদীদের মধ্যে সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতি, ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যে বিদ্যমান চরম নাখোশ অবস্থার প্রশমন এবং ইয়েমেনে যুদ্ধাবস্থার স্বস্তিদায়ক বিরতি- এসবই পশ্চিমাদের ন্যুনতম অংশগ্রহণ ব্যতিরেকে সম্পন্ন হয়েছে। এসব ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যের সহিংসতার একটি অস্থায়ী বিরতি হিসেবে বিবেচিত হলেও, এটি সেখানে ভবিষ্যতে বহুমুখী পরিবর্তনের একটি আভাস হিসেবেও দেখা দিতে পারে।
মে মাস ছিল আরব কূটনীতিকদের জন্য একটি ঘটনাবহুল মাস। আরব লীগ কর্তৃক সিরিয়ার সদস্যপদ স্থগিত করার ১২ বছর পর সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদকে আনুষ্ঠানিকভাবে আলিঙ্গন করে ফিরে আসতে স্বাগত জানানো হয়। ইয়েমেনে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ বন্ধ হওয়ার লক্ষণ দেখা দেয়ার ফলে ইরান ও সৌদি আরব পুনর্মিলনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। ইতিমধ্যে, মিশর ইসরায়েল এবং ইসলামিক জিহাদীদের মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতির মধ্যস্থতা করেছে এবং সৌদি আরব সুদানে গৃহযুদ্ধের অবসানের প্রচেষ্টায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ত্রাণকর্তা হিসাবে আবির্ভূত হয়েছে।

এইসব সাম্প্রতিক ঘটনাবলীর উল্লেখযোগ্য বিষয় হল ঐসব ঘটনায় পশ্চিমাদের প্রায় সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি। যদিও মধ্যপ্রাচ্যে পশ্চিমাদের সম্পৃক্ততা বছরের পর বছর ধরে ওঠানামা করেছে, তবুও বলা যায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার ইউরোপীয় মিত্ররা শীতল যুদ্ধের অবসানের পর থেকে এই অঞ্চলে বেশির ভাগ কূটনৈতিক অগ্রগতির নেতৃত্ব দিয়েছে। ইসরায়েল ও জর্ডানের মধ্যে শান্তি ও সম্পর্কের স্বাভাবিকীকরণ, ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলির মধ্যে সম্প্রীতি স্থাপন এবং ২০১৫ সালের ইরান পারমাণবিক চুক্তি সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণ, ২০১১ সালে লিবিয়ায় সামরিক হস্তক্ষেপ, সিরিয়ায় আসাদ-বিরোধী বিদ্রোহীদের সমর্থন এবং সিরিয়া ও ইরাকে ইসলামিক স্টেটকে তার ঘাঁটি থেকে বিতাড়িত করা ছিল পশ্চিমাদের সম্পৃক্ততার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। আবার যুক্তরাষ্ট্র ইয়েমেনে সৌদি আরবের বিমান অভিযানকে সমর্থন করেছে। তবে এইসব কাজের মধ্যে যা অবশিষ্ট রয়েছে তা হল ইরাকে ২ হাজার ৫০০ এবং সিরিয়ায় ৯০০ মার্কিন সেনার উপস্থিতি।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলের সাথে পশ্চিমাদের দুরত্ব বাড়ছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমেরিকার বিচ্ছিন্নতা চীনের সাথে তার ক্রমবর্ধমান প্রতিদ্বন্দ্বিতার দিকে মনোনিবেশ করার জন্য একটি পরিকল্পিত কৌশলের অংশ বলে বিবেচিত হচ্ছে। একজন প্রাক্তন মার্কিন কর্মকর্তা আমাকে বলেছিলেন, এটি কেবল আমেরিকার প্রাক-৯/১১ অবস্থায় ফিরে আসা নয়; বরং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলে তার ১৯৯০-এর পূর্বের পদ্ধতিতে ফিরে যেতে চায়, যেখানে শান্তি বজায় রাখার লক্ষ্যে আঞ্চলিক মিত্রদের উপর নির্ভরতার সাথে একটি ন্যুনতম সামরিক উপস্থিতিও নিশ্চিত করা হয়েছিল। প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন মধ্যপ্রাচ্যের কর্দমাক্ত অবস্থাকে প্রতিহত করার জন্য তার প্রশাসনের ক্ষমতার জন্য গর্ববোধ করেন যা তার পূর্বসূরি বারাক ওবামা এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ফাঁদে ফেলেছিল। কারণ তারা এশিয়ার দিকে ধাবিত হওয়ার চেষ্টা করেছিল।

মধ্যপ্রাচ্যের নতুন বাস্তবতা বোঝার দুটি উপায় রয়েছে। প্রথমটি হল পশ্চিমা আকাঙ্খা এবং বাস্তব অবস্থার মধ্যে উপসাগরীয় অঞ্চলের অনাকাঙ্খিত পরিতাপ। যদিও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন এখনও মৌখিকভাবে ইসরায়েল এবং ফিলিস্তিনি- এই দুই-রাষ্ট্র নীতিকে সমর্থন করে, কিন্তু উভয় রাষ্ট্র এই নীতি থেকে অনেক দূরে সরে গেছে। যেহেতু ইসরায়েলের ইহুদি সংখ্যাগরিষ্ঠরা আরও বেশি হারে অতি-গোঁড়া জাতীয়তাবাদী হয়ে উঠেছে, বেশিরভাগ ফিলিস্তিনিরা প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের অনমনীয় ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের হয়ে সশস্ত্র প্রতিরোধের পক্ষে এসেছে।
এদিকে, পশ্চিমারা ইরানের দ্রুত অগ্রসরমান পারমাণবিক কর্মসূচী মোকাবেলায় কূটনীতির গুরুত্বের কথা বলে চলেছে, কিন্তু এক্ষেত্রে তাদের উদ্যোগ খুবই সীমিত। গত সেপ্টেম্বরে থেকে ইরানের জনগণের শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের বিরুদ্ধে দেশটির সকারের নিষ্ঠুর দমন-পীড়নের জন্য এবং ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়াকে তার সামরিক সহায়তা করাকে আমেরিকান এবং তার ইউরোপীয় মিত্রদের নিষ্ক্রিয়তাকে দায়ী করা যেতে পারে।
কিন্তু ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি টিকিং টাইম বোমায় পরিণত হচ্ছে। এই বছরের শুরুর দিকে, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা বলেছে যে, ইরান তার কাছে সংরক্ষিত ইউরেনিয়াম ৮৩.৭% অস্ত্র-গ্রেড স্তরে উন্নীত করেছে। ইরানের ব্রেকআউট সময় অর্থাৎ একটি পারমাণবিক অস্ত্রের জন্য পর্যাপ্ত বিচ্ছিন্ন উপাদান তৈরি করার জন্য প্রয়োজন হবে ১২ মাস। কিন্তু যখন পারমাণবিক চুক্তি বাস্তবায়িত হয়েছিল তখন একটি পারমাণবিক বোমাকে পূর্ণাঙ্গ রূপ দিতে প্রায় ১২ দিন বাকী ছিল।
এই অঞ্চল থেকে পশ্চিমাদের প্রত্যাহারের ফলে সৃষ্ট শূণ্যতা পূরণে অন্যান্য দেশগুলি ছুটে এসেছে। গাজায় ইসরায়েল এবং ইসলামী জিহাদীদের মধ্যে একটি সংক্ষিপ্ত ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ফলে বড় ধরনের সংঘাত দেখা দেয়ার উপক্রম হলে মিশর মধ্যস্থতার দায়িত্ব নেয় যা শেষ পর্যন্ত শত্রুতার অবসান ঘটায়। একইভাবে, এপ্রিলের শেষ দিকে ইসলামিক স্টেট নেতা আবু হুসেইন আল-কুরাশিকে হত্যায় মার্কিন ড্রোন হামলার পাশাপাশি তুর্কি বিশেষ বাহিনীও নিয়োজিত ছিল।
যদিও পশ্চিমের অনেকেই মধ্যপ্রাচ্যে এই উদীয়মান শক্তির অগ্রগতির ফলে হতাশ হতে পারেন, তবুও আমেরিকা-উত্তর মধ্যপ্রাচ্যকে বোঝার আরেকটি উপায় আছে। প্রাথমিক উদ্বেগ থাকা সত্ত্বেও বলা যায় যে, মার্কিন প্রত্যাহার এই অঞ্চলকে নৈরাজ্য ও বিকৃঙ্খলার মধ্যে নিমজ্জিত করবে। তবুও মধ্যপ্রাচ্যের অনেকেই এখন এ অঞ্চলে পশ্চিমা হস্তক্ষেপকে অস্থিতিশীলতার কারণ হিসাবে দেখছেন। আফগানিস্তান থেকে পশ্চিমাদের দ্রুত প্রস্থানের ঘটনা এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। এতদাঞ্চলে আঞ্চলিক কিছু নেতৃত্ব এবং রাশিয়া ও চীনের মতো বহিরাগত শক্তির সক্রিয় উপস্থিতির ফলে উদ্ভূত নতুন ব্যবস্থা পশ্চিমা দেশগুলোর পছন্দের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে। কারণ স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থার ভূমিকার কারণে ওই দেশগুলো এখনও একটি স্বতন্ত্র কর্তৃত্ববাদী শাসনের প্রতিনিধিত্ব করছে।

যদিও পশ্চিমারা ভিন্ন ফলাফলের আশা করেছিল, তবুও এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, মধ্য প্রাচ্যে সহিংসতা কিছুটা কমেছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের পরিপক্ক নেতৃত্বে এবং চীনা মধ্যাবস্থায় ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যে চরম নাখোশ অবস্থার প্রশমন এবং ইয়েমেনে সংঘাতের ক্রমাবনমন হয়েছে। একইভাবে, সুদানে শুরু হওয়া গৃহযুদ্ধের মতো সংকট মোকাবেলায় আঞ্চলিক নেতাদের মধ্যে দায়িত্ববোধের বৃদ্ধি একটি ইতিবাচক বিষয় হিসেবে গণ্য করা যায়।
তবে এটা নিশ্চিত ভাবে বলা যায়, মধ্যপ্রাচ্যের উদীয়মান অবস্থা একটি কর্তৃত্ববাদী শান্তি হিসাবে বর্ণনা করা যেতে পারে এবং এ অঞ্চলের দেশগুলি যে সকল চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করছে তাও বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। তবে পশ্চিমা নীতিনির্ধারকরা সবসময় এই অঞ্চলটিতে বিদ্যমান অন্যান্য সমস্যার দিকে মনোনিবেশ করে বলে মনে হলেও বর্তমানে এখানকার নেতারা অর্থনৈতিক একীকরণ এবং উন্নয়নের দিকে মনোনিবেশ করছে।
অবশ্যই, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এখন তাদের মধ্যে চলমান সহিংস যুগের একটি অন্তর্বর্তীকালের অবসান দেখতে পারছে। কিন্তু বিশ্ববাসী সেখানে বহুমুখী উন্নতির ভবিষ্যত নির্মাণের স্বপ্ন দেখতে পাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের একজন চীনা পর্যবেক্ষক আমাকে বলেছেন, তার দেশ এই অঞ্চলটিকে ‘আমেরিকা-পরবর্তী বিশ্বের জন্য একটি পরীক্ষাগার’ হিসেবে দেখতে এসেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পিছিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে, এখানকার আঞ্চলিক খেলোয়াড়রা নিজেদের সমস্যা সমাধানে সমন্বিত প্রয়াশ চালাবে এবং ভারত, তুরস্ক, রাশিয়া এবং চীনের মতো দেশগুলিও এখানে প্রভাব বিস্তার করবে।
ইউরোপিয়ান বৈদেশিক সম্পর্ক কাউন্সিলের সদস্য এবং মধপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা বিষয়ের বিশ্লেষক জুলিয়েন বার্নস-ডেসি এবং হিউ লোভাট মনে করেন, একটি বহুমুখী বিশ্বে সুষম বিস্বব্যবস্থা গঠনে পশ্চিমাদের হয় উল্লেখযোগ্য হারে অর্থ-সম্পদ বিনিয়োগ করতে হবে অথবা অন্যদের অগ্রাধিকারের সাথে নিজেরদের খাপ খাইয়ে চলতে হবে। পরবর্তী বিকল্পটি সর্বদা পশ্চিমাদের কাঙ্খিত প্রাপ্তী হিসেবে ভালো ফলাফল নাও হতে পারে, তবে তা খুব একটা খারাপ বিষয়ও নয়।
মার্ক লিওনার্ড: ইউরোপীয় কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনের পরিচালক এবং The Age of Unpeace: Hwo Connectivity Causes Conflict বই এর লেখক।
স্বত্ত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
অনুবাদ: শহীদ রাজু।