প্রবাস মেলা ডেস্ক: পাক্ষিক প্রবাস মেলা’র আমন্ত্রণে সম্মানিত অতিথি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি’র ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু প্রবাস মেলা অফিস পরিদর্শন করেছেন। ২২ নভেম্বর ২০২২, মঙ্গলবার সন্ধ্যায় প্রবাস মেলা’র কলাকুশলীদের সাথে তিনি চা-চক্রে অংশ নিয়ে দেশের বর্তমান রাজনীতিসহ নানা বিষয়ে কথা বলেন। আলোচনার এক ফাঁকে সাবেক এই সংসদ সদস্যের হাতে প্রবাস মেলার সৌজন্য কপি তুলে দেন পত্রিকার সম্পাদক শরীফ মুহম্মদ রাশেদ এবং নির্বাহী সম্পাদক শহীদ রাজু।
শামসুজ্জামান দুদু একাধারে একজন রাজনীতিবিদ, ৯০ এর গণঅভ্যূত্থানের অন্যতম ছাত্রনেতা, সাংবাদিক, সুবক্তা ও ক্রীড়া সংগঠক। তবে সবকিছু ছাড়িয়ে তিনি এখন স্পষ্টবাদী রাজনীতিবিদ হিসেবে দেশে-বিদেশে ব্যাপকভাবে পরিচিত। বক্তৃতার মঞ্চে কিংবা টিভি টক-শো তে তার ক্ষুরধার সত্য ভাষণ সকলেরই মন কাড়ে।
জন্ম ও বেড়ে ওঠা: তিনি ১৯৫৬ সালের ১৭ জুন চুয়াডাঙ্গা জেলায় এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার শৈশব-কৈশোর চুয়াডাঙ্গা শহরেই কেটেছে। আইনজীবী পিতা মো: ইব্রাহীম ও গৃহিনী মাতা ফাতেমা ইব্রাহীমের ঘরে তারা ৭ ভাই ১ বোন পরম যত্নে বেড়ে উঠেছেন।
শিক্ষা জীবন: তিনি চুয়াডাঙ্গা বালিকা বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। তারপর চুয়াডাঙ্গা বি.জে স্কুল থেকে ১৯৭২ সালে এসএসসি এবং চুয়াডাঙ্গা সরকারী কলেজ থেকে ১৯৭৪ সালে এইচএসসি শেষ করে প্রাচ্যের অক্সফোর্ডখ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সেখান থেকে তিনি ১৯৭৮ সালে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।

রাজনৈতিক জীবনের হাতেখড়ি: ছোটবেলায় তার ইচ্ছা ছিল তিনি ডাক্তার হবেন বা সেনাবাহিনীতে যোগ দেবেন। কিন্তু হাই স্কুলে পড়াকালীন স্কুল কর্তৃপক্ষের একটি ভুলের কারণে তিনি বিজ্ঞান বিভাগে পড়তে পারেননি। সে কারণে তার ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন পূরণ হয়নি। স্কুল কলেজ জীবনে নানা সামাজিক-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকার সুবাদে তার চিন্তা-মানসে রাজনৈতিক ভাবনার জন্ম নেয়। হাই স্কুলে পড়াকালীন সময়ে তিনি বাংলাদেশের প্রোথিতযশা রাজনীতিবিদ ও গণমানুষের কণ্ঠস্বর মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী’র সান্নিধ্য লাভ করেন এবং বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামে অংশগ্রহণ করার মাধ্যমে ভাসানী কেন্দ্রিক রাজনৈতিক আদর্শে যুক্ত হন। পরে ভাসানী সমর্থিত ছাত্র সংগঠন বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়নের মহকুমা সেক্রেটারির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৪ সালে এ সংগঠনটি কয়েকটি ছাত্র সংগঠনের সমন্বয়ে জাতীয় ছাত্র দলে রূপান্তরিত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন সময়ে তিনি এ সংগঠনের সদস্যপদ লাভ করেন।
বিএনপিকেন্দ্রিক রাজনীতি: ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল গঠন করা হলে শামসুজ্জামান দুদু এ সংগঠনের সদস্যপদ লাভ করে পরে সাহিত্য সম্পাদক নির্বাচিত হন। তিনি ১৯৮৫-৮৬ সালে ছাত্রদলের কেন্দ্রিয় সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি’র গণশিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক, কৃষি বিষয়ক সম্পাদক, বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন। তিনি ১৯৯২ সালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়ে দীর্ঘদিন কাজ করেন। তুখোড় এ ছাত্রনেতা বর্তমানে বিএনপি’র ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
সংসদ সদস্য: শামসুজ্জামান দুদু ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ১৯৯৬ সালে তার সংসদীয় আসন চুয়াডাঙ্গা-১ থেকে প্রথম বার সাংসদ নির্বাচিত হন। নির্বাচনটি ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬ সালে অনুষ্ঠিত হয় এবং অধিকাংশ বিরোধী রাজনৈতিক দল নির্বাচনটি বর্জন করে। একই সালের জুন মাসে অনুষ্ঠিত সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তিনি বিজয়ী হয়ে সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

সাংবাদিক ও ক্রীড়া সংগঠক: শামসুজ্জামান দুদু ছাত্রজীবনে বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক কাজের পাশাপাশি লেখালেখি ও সাংবাদিক হিসেবেও কাজ করেছেন। স্কুল জীবনে তার হাত ধরেই স্কুল ম্যাগাজিন বের হতো। কলেজ জীবনে তিনি জাতীয় পত্রিকা দৈনিক বাংলা’র চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি ছিলেন। পরে ঢাকায় এসে প্রাচ্যবার্তা পত্রিকা সম্পাদনা করেন। এই পত্রিকাটির প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ছিলেন বরন্য সাংবাদিক ও টিভি উপস্থাপক ফজলে লোহানী। একসময় আব্দুল্লাহ আল হারুনের সম্পাদনায় চট্টগ্রাম থেকে সাপ্তাহিক স্বাধীনতা নামে একটি পত্রিকা বের হতো। পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে গেলে ১৯৯২-৯৩ সালের দিকে শামসুজ্জামান দুদু ঐ পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্ব নেন। এছাড়া তিনি বাংলাদেশের অন্যতম ক্রীড়া সংগঠন ব্রাদার্স ইউনিয়নের সেক্রেটারি ছিলেন।
ছাত্র রাজনীতি সম্পর্কে মূল্যায়ন: ছাত্র রাজনীতির পুরোধাপুরুষ শামসুজ্জামান দুদু বর্তমান ছাত্র রাজনীতির গতি প্রকৃতি সম্পর্কে বলেন, এক সময় ছাত্ররা স্বাধীনতা গণতন্ত্রের জন্য জীবন বাজী রেখে লড়ে গেছেন। বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে বাংলাদেশ সৃষ্টি পর্যন্ত প্রতিটি আন্দোলনে ছাত্রদের খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে ক্ষুদিরাম প্রথম বাঙালি হিসেবে আত্মহুতি দিয়েছিলেন। ভাষা আন্দোলনে, পাকিস্তানের অপশাসনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় বাংলার তরুণ ছাত্র সমাজ বাঙালির অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য অকাতরে প্রাণ দিয়েছেন। তারই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে ছাত্র সমাজের ভূমিকা অনস্বীকার্য। মেধা, মনন, সাহসিকতায় তারা ছিলেন অনন্য। ৯০-এর গণঅভ্যুত্থানে স্বৈরাচার এরশাদকে গদিচ্যুত করার ক্ষেত্রেও ছাত্ররা সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছে। কিন্তু ছাত্র আন্দোলনের সে স্বর্ণযুগ এখন আর নেই। তখন নীতি-আদর্শ ছিল, পড়াশোনা ছিল, সৌহার্দ্য-সম্প্রীতি ছিল। এখন ছাত্ররা মূল দলের লেজুড় হয়ে থাকছে। অর্থ-ক্ষমতা-প্রতিপত্তির লোভ তাদেরকে গ্রাস করে ফেলেছে। তাই বর্তমান ছাত্র রাজনীতিতে আগের সেই আদর্শিক জায়গাটা আর নেই। দেশের বড় বড় রাজনৈতিক দলগুলোতে এখনও সাবেক ছাত্রনেতারাই বেশিরভাগ পদে নিযুক্ত আছেন। যেমন বিএনপি’র যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, মহিলা দল, শ্রমিক দল, কৃষক দল এবং অন্যান্য সংগঠনের পুরোটাই এখন ছাত্রদলের সাবেক নেতারা আছেন। এছাড়া বিএনপির স্থায়ী কমিটি থেকে শুরু করে সমগ্র বিএনপিতে একটা বড় অংশে ছাত্রদলের সাবেক নেতারা রয়েছেন। তারা এখন দলে অনেক বড় ভূমিকা পালন করছেন। তিনি আরও বলেন, ‘স্বাধীনতার পর যে বাংলাদেশ প্রত্যক্ষ করতে চেয়েছিল এদেশের ছাত্র, যুবক, শ্রমিক, কৃষকসহ মেহনতি মানুষ। স্বাধীনতার পর তার উল্টোটা হয়েছে। সেসময় ছাত্ররা ভালো একটা কিছু প্রত্যাশা করেছিল। জিয়াউর রহমানের শাসনামলে তিনটি ছাত্র সংগঠন মিলে ছাত্রদল প্রতিষ্ঠা করেছিল। জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের মূল স্লোগান হচ্ছে গঠনমূলক শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা যা স্বাধীনতা, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অনুগঠক হিসেবে কাজ করবে। এটা প্রতিষ্ঠা করা এখন আমাদের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।
মূলধারার রাজনীতি সম্পর্কে: আলাপচারিতায় এক প্রশ্নের জবাবে শামসুজ্জামান দুদু বলেন, বর্তমানে মূলধারার রাজনীতিতে বিভাজন প্রকট আকার ধারণ করেছে এটা সত্য। এর কারণও রয়েছে। এখন দেশে বাকস্বাধীনতা নেই, গণতন্ত্র নেই। বর্তমানে বাংলাদেশের যে শাসন ব্যবস্থা চলছে তা বলা যায় একদলীয় শাসন যা স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য কোনভাবেই কার্যকর নয়। এখন গণতন্ত্রের নামে দূর্নীতি, অপশাসন করে সত্য মিথ্যার লড়াই চলছে। তাই এখন স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে সত্যিকারের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা জরুরী যা রাজনৈতিক এই বিভাজন দূর করতে পারে।
পারিবারিক জীবন: ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনে শামসুজ্জামান দুদু ২ কন্যা সন্তানের পিতা। তারা দু’জনই স্কলাস্টিকা’র মেধাবী শিক্ষার্থী ছিলেন। বড় মেয়ে জারিন কাশফি ইভা যুক্তরাষ্ট্রে পিএইচডি করছেন। ছোট মেয়ে প্রভা মোর্শেদা জামান যুক্তরাষ্ট্রে কম্পিউটার সায়েন্সে পড়ছেন। তার স্ত্রী মোর্শেদা বানু বুয়েট থেকে আর্টিটেকচার এবং আরবান প্ল্যানিংয়ে এমএসসি পাশ করে রাজউক এ আরবান প্ল্যানার পদে চাকরি করছেন।