মো: মোস্তফা কামাল মিন্টু
পরিশ্রম ও মেধার সমন্বয় থাকলে যে সফলতা লাভ করা যায় তার সেরা দৃষ্টান্ত তিনি। তার জন্ম ও বেড়ে উঠা ঢাকাতেই। খুব ছোটবেলাতেই তিনি স্বপ্ন দেখতেন নতুন ও বিশেষ কিছু করার। একসময় তিনি ঢাকা থেকে আয়ারল্যান্ডে পাড়ি জমান। সেখানে লেখাপড়ার পাশাপাশি মডেলিংয়ে যুক্ত হন। মেধা, পরিশ্রম, ইচ্ছাশক্তি ও সৌন্দর্য্য দিয়ে তিনি এগিয়ে যেতে থাকেন। ২০১৪ সালে মিস আয়ারল্যান্ড খেতাব অর্জনের পাশাপাশি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তার ক্যারিয়ারে যুক্ত হয়েছে আরও অনেক আন্তর্জাতিক খেতাব। বলছিলাম বর্তমানে আয়ারল্যান্ডের ডাবলিন প্রবাসী বাংলাদেশি মেয়ে মাকসুদা আক্তার প্রিয়তি’র কথা। তার সাথে যোগাযোগ করে তাকে নিয়ে প্রবাস মেলা’র এবারের প্রচ্ছদ আয়োজন।

খুব ছোটবেলাতেই মাকসুদা আক্তার প্রিয়তি বাবাকে হারিয়েছেন। তখন তার বয়স ছিল মাত্র ৮ বছর। ১২ বছর বয়সেই তিনি আয়ারল্যান্ডে পাড়ি জমান। এরপর ১৯ বছর বয়সে মাকে হারালেও ধমে যাননি প্রিয়তি। বরং নিজের স্বপ্ন বাস্তবায়নে ছুটে চলেছেন দুর্বার গতিতে।
প্রিয়তি ছোটবেলাতেই একজন মডেল হতে আগ্রহী ছিলেন, তবে তার স্বপ্ন ছিল একজন বৈমানিক হওয়া। তার সেই স্বপ্নকে তিনি মেধার পাশাপাশি ধৈর্য, পরিশ্রম ও সততার মাধ্যমে বাস্তবে রূপ দিয়েছেন। মডেলিংয়ের মাধ্যমে তিনি যেমন আকাশ ছুঁয়েছেন, তেমনি বিমান নিয়ে আকাশে চষে বেড়ানোর বাস্তব কাজটাও নিয়মিত করছেন। কারণ মডেলিংয়ে নিয়মিত অংশ নিলেও তিনি একজন পেশাদার পাইলট। বেসরকারি পাইলট হিসেবে নিয়মিত বিমান চালান প্রিয়তি।
এ বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে প্রিয়তি বলেন, মডেলিং আমার শখ ও ভালোবাসা, আর বিমান চালনা আমার পেশা, প্যাশন। এই দুই নিয়েই থাকতে চাই সবসময়। কিন্তু দুটি ক্ষেত্র একসঙ্গে সামলান কিভাবে? প্রিয়তি বলেন, আসলে ইচ্ছে থাকলে উপায় হয়, আমি কাজ ভাগ করে নিই। মডেলিংয়ের সময় মডেলিং আর বৈমানিক হিসেবে কাজ করার সময় শুধুমাত্র সেই কাজেই মন দেই। মাঝে মধ্যে কষ্ট হয়, তারপরও সময়টা ব্যালেন্সড করে নিই।

বাংলাদেশের একজন নারী হিসেবে সুন্দরী প্রতিযোগীতায় সফল হয়েছেন, পাশাপাশি বৈমানিক হিসেবে কাজ করছেন, কেমন লাগে? জবাবে প্রিয়তি বলেন, আসলে আমি যখন মিস আর্থ ইন্টারন্যাশনালে যাই তখন খুব গর্ব হচ্ছিলো, কারণ নিজের দেশকে প্রতিনিধিত্ব করতে পেরেছি আমি। এটা যেমন আনন্দের, তেমনি গর্বের। তখন একটা আবেগ কাজ করে। কারণ আমি যেখানেই যেভাবে থাকিনা কেন আমার দেশ বাংলাদেশ। দেশের প্রতি সবসময় অন্যরকম একটা টান কাজ করে। এ বিষয়টি বাংলাদেশের মেয়েদের উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করবে বলে আমি মনে করি।
সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্ব্যাপী ‘মি টু’ নিয়ে উঠা আন্দোলন নিয়ে প্রিয়তিও মুখ খুলেছেন। তার নিজ জন্মভূমিতেই যৌন হেনস্থার শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ আনেন তিনি। এক ফেসবুক লাইভে তিনি দাবি করেন, বিজ্ঞাপনের পারিশ্রমিক আনতে গেলে এক ব্যবসায়ির যৌন হেনস্তা থেকে নিজের বুদ্ধিমত্তায় তিনি বেঁচে যান। এ নিয়ে প্রিয়তি নারী সমাজের পাশাপাশি পুরুষশাসিত সমাজকেও পরিবর্তনের আহ্বান জানান।
মাকসুদা আক্তার প্রিয়তি লন্ডন ইন্টারন্যাশনাল স্কুল থেকে পাশ করার পর আয়স্ফিলদ কলেজ ডাবলিনে পড়াশোনা করেন। এরপর ইন্সটিটিউট অব টেকনোলোজি টালাহ ডাবলিন (ITT Dublin) থেকে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করেন।

২০১৪ সালে মিস আয়ারল্যান্ড খেতাব অর্জনের পর প্রিয়তি আইরিশ শোবিজ জগতের টাইমলাইনে চলে আসেন। সুন্দরী প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে সফলতা পাওয়াটা খুব সহজ ব্যাপার নয়, এই পথটা কেমন ছিল? এমন প্রশ্নের জবাবে প্রিয়তি বলেন, খুব সোজা ছিলো না, আর আমি একজন বাংলাদেশি, আমার বেলায়তো সেটা আরও কঠিন ছিল। কিন্তু আমার আত্মবিশ্বাসের কমতি ছিলনা। কখনও হতাশা ভর করেনি। আমি আমার কাজের প্রতি সবসময় সিরিয়াস ছিলাম। আর কাজের প্রতি সৎ থাকলে সেই জায়গায় দেরিতে হলেও সফলতা আসবে এটা আমি মানি। আমি চেষ্টাও করেছি প্রচুর।
বর্তমানে আয়ারল্যান্ডের শীর্ষ মডেলদের মধ্যে অন্যতম প্রিয়তি’র ঝুলিতে যুক্ত হয়েছে অনেক আন্তর্জাতিক সম্মাননা। মডেলিং ও অভিনয় জীবনে প্রিয়তি অর্জন করেছেন অনেক স্বীকৃতি ও পুরস্কার। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে মিস ইউনিভার্সাল রয়্যালটি ২০১৩ (Miss Universal Royalty 2013), মিস আয়ারল্যান্ড ২০১৪ (Miss Ireland 2014), মিস হট চকোলেট ২০১৪ (Miss Hot Chocolate 2014), মিস ফটোজেনিক ২০১৪ (Miss Photogenic 2014), সুপার মডেল অব দ্য ইয়ার ২০১৪ (Super model of the Year 2014), মিস আয়ারল্যান্ড আর্থ ২০১৫ (Miss Ireland Earth 2015), প্রথম আইরিশ-এশিয়ান হিসেবে মিস আর্থ এ প্রথম রানার-আপ ২০১৬, আন্তর্জাতিক ডাইভারসিটি লিডারশীপ অ্যাওয়ার্ড (International Diversity Leadership Awards), আইরিশ মডেল অফ দ্যা ইয়ার ২০১৬ (Irish Model of the Year 2016), মিস ক্যারনিভ্যাল আয়ারল্যান্ড ২০১৫ (Miss Carnival Ireland 2015), মিস ইউরোপিয়ান আয়ারল্যান্ড (Miss European Ireland) আয়ারল্যান্ড’স পেজিয়ান্ট (Ireland’s Pageant) মিস কমপ্যাশনেট ২০১৬, মিস বেস্ট গাউন ২০১৬, মিস ফিটনেস ২০১৬ প্রভৃতি। বর্তমানে হলিউড ও বলিউড থেকেও প্রচুর কাজের অফার পান বলে জানান প্রিয়তি।
মাকসুদা আক্তার প্রিয়তি একজন বাংলাদেশি আইরিশ ফ্যাশন মডেল এবং অভিনেত্রী। তার সুন্দর চেহারা ও শারীরিক সৌন্দর্য্য খুব সহজেই সবাইকে বিমোহিত করে। যে কারণে প্রিয়তি’র আত্মজীবনী প্রকাশ করেছিল যুক্তরাষ্ট্রের এইচএমএল ম্যাগাজিন। আত্মজীবনী প্রকাশের পর প্রত্যাশার চেয়েও অনেক ভালো সাড়া পেয়েছিলেন প্রিয়তি। তাঁর আত্মজীবনী দিয়ে নির্মিত হতে যাচ্ছে স্বল্পদৈর্ঘ্য একটি চলচ্চিত্র। চলচ্চিত্রটি পরিচালনা করবেন কিরন ডেভিস। চলচ্চিত্রে অভিনয় করবেন প্রিয়তি নিজেই। এর চিত্রনাট্যও লিখেছেন তিনি।
১৯৮৯ সালের ৭ আগস্ট ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন মাকসুদা আকতার প্রিয়তি। বাবা মরহুম আব্দুর রশিদ ও মা মরহুমা মোছেন আরা। তারা ছয় ভাই একবোন। বিবাহিত জীবনে প্রিয়তি দুই সন্তানের মা। ছেলের নাম আবরায (Abrazz) ও মেয়ের নাম মৌনীরা (Mounira)।
মেইলে যোগাযোগ করা হলে এক প্রশ্নের জবাবে প্রিয়তি জানান, প্রবাসী বাংলাদেশিদের নিয়ে ঢাকা থেকে একটি ম্যাগাজিন পত্রিকা নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে জেনে আমি খুব আনন্দিত হয়েছি, আমি পাক্ষিক প্রবাস মেলা পত্রিকাটির সফলতা কামনা করছি। এবার ঢাকা আসলে আমি অবশ্যই প্রবাস মেলা পত্রিকার অফিস পরিদর্শন করবো।
বিদেশে দেশকে কেমন মিস করেন এর জবাবে কৃতি এই প্রবাসী জানান, আমি বরাবরই আমাদের দেশকে অনেক অনেক মিস করি। দেশের মানুষদেরকে মিস করি। সময় পেলেই আমি দেশে চলে আসি। তবে বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে বাংলাদেশের সব খবর অনলাইন বিশেষ করে ফেসবুকের মাধ্যমে জানতে পারি। বাংলাদেশে আমার পরিচিত অনেকের সঙ্গেই নিয়মিত কথা হয়। আমি বাংলাদেশের মানুষের এবং এদেশের সাফল্য-সমৃদ্ধি সবসময় কামনা করি।