পান্না বদরুল:
ঊনপঞ্চাশ বছর বয়ে গেলো গড়াইয়ের তীব্র লঘু স্রোতে,
আজও নিজের মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতে পারিনি,
শিখিনি জীবনের খরস্রোতা নদীর ঢেউয়ের সাথে মিতালির মন্ত্র,
জীবনের মধ্য গগনে সূর্য্যের তাপে টালমাটাল লাগে সব কিছু,
মনে পড়ে যায় সেদিনের ফেলে আসা রক্তরাঙা পলাশ ফুল,
বর্ষায় ফুটন্ত কদম হাতে বৃষ্টি ফোটায় ফোটায় নয়ন জলে মিশ্রিত সুখাশ্রু।
মনের আঁকা ক্যানভাসে জলছবি হয়ে ভেসে ওঠে নিজস্বতার ভাস্কর্য্য,
শৈশবের আলতা রাঙা পায়ে
নুপুর পরে চারু বলেছিল ‘তুমি আমার বর হবে’!
তাহলে কিন্তু বাজার করতে হবে,
লাল শাড়ি,চু ড়ি, ব্লাউজ-পেটিকোট
আর আর করতে করতে
লজ্জ্বায় লাল ছোট্ট চারুটি অন্তর্বাস কিনে দিতে হবে
সেকথা বলতেই পারেনি সেদিন!
সময় অসময়ে আমাকে শাসিয়ে যেত
যেন ওর কেনা গোলাম আমি,
যতো রাগ অভিমান অনুযোগ অভিযোগ সবই আমার কাছে,
ওর কাছে আমি হলাম ম্যাজিশিয়ান!
যে কিনা জাদু দিয়ে সব ঠিক করে দিতে পারে।
একবার আমার খুব করে জ্বর হলো
ডাক্তার হেকিম এলো আর গেলো, কিন্তু বাঁচার কোন বাণী শুনালেন না কেউই;
বিভোর জ্বরে বাবার উচ্চস্বরে নামাজ,
আর প্রত্যুষে মায়ের কান্নার সাথে কোরআন তেলাওয়াত শুনতে পেতাম ঘোরে।
একদিন শিয়রের কাছে কি যেন মনে হলো সহসা
“GET WELL SOON” লেখা চিরকুটটি মমতায় রেখে গিয়েছিল শৈশব পেরিয়ে কিশোরীর মায়াবতী আভায় ছুঁইছুঁই যৌবনা চারুতা!
মসজিদের হুজুরের পানি পড়া
বাবা মায়ের অহর্নিশি দোয়া ও সেবা শুশ্রূষায় কিংবা
গ্রাম্য ডাক্তারের অক্লান্ত দৌড়ঝাঁপই হোক,
আর চারুতার চিরকুটের ছোঁয়ায় হোক,
সেবারের মতো আজরাইল ছেড়ে দিয়েছিল জীবনের সব রস চুষে নিয়ে।
সুস্থ হতে ঢের সময় লেগেছিল হয়তো আরো লাগতো যদি চারুতার স্পর্শ না থাকতো,
এক মাঘী পূর্ণিমা রাতে চারুতা এসেছিল আমার জানালায় জোৎস্নার আলো হয়ে,
স্বলাজে অশ্রুভেজা চোখ তুলে শুধু বলেছিল ম্যাজিশিয়ান পরশু আমার বিয়ে;
আমার সমস্ত ম্যাজিক হাওয়ায় মিলিয়ে গিয়েছিল,
মুখের সমস্ত কথা বুকেই আটকে বন্দি হয়েছিল,
চারুতা বুঝেছিল নির্বাক জাদুকরের দৌরাত্ব!
ওর মুখে ভরা পূর্ণিমায় দেখেছিলাম অমাবস্যার বিমূর্ত অন্ধকার!
চারুতা ভালো আছে শুনেছি
স্বামী-সন্তান আর ভালোবাসা নিয়ে,
মেরুদন্ডহীন আমিও ভালো আছি
আজও চারুতার চিরকুটটি শিয়রের বালিশের নিচে বয়ে।