সালমান রাব্বানি বাবু, ঢাকা থেকে: ফিলিস্তিনি একজন মহিয়সী নারীর নাম ‘নূর- ই- ফাতিমা কাওমী’। প্রায় প্রতিদিনই ইসরাইলী সেনারা ফিলিস্তিনিদের উপর যে শত শত গ্রেনেড, মর্টার শেল, বুলেট ছুঁড়ে মারে সেগুলোর খোসা তিনি কুঁড়িয়ে নেন। তারপর সেগুলো তিনি অতি যত্নে পরিষ্কার করে তার ভিতর ফুলের বীজ রোপন করেন। মরূভূমির তপ্তবালিতে গ্রেনেডের খোসায় ফুল ফোটাতে তাকে একটা লম্বা সময় অপেক্ষা করতে হয়। তিনি প্রতিদিন নিয়ম করে পানি দেন, একটু একটু করে চারাগুলোকে বড় করেন। সমস্ত প্রতিকূলতা থেকে রক্ষা করেন তিনি তার গাছগুলোকে। তারপর একসময় তার গাছগুলো ভরে ওঠে স্বর্গীয় ফুলে ফুলে। পৃথিবীতে যে মরণাস্ত্রগুলো তৈরীই হয়েছে মানুষের জীবন নেয়ার জন্য, মানুষের অস্তিত্ব বিনাশের জন্য, সেখানেও নূর- ই- ফাতিমারা প্রচন্ড ভালোবাসা আর গভীর আবেগ দিয়ে ফুল ফোটান। এটাই যুদ্ধবাজ, অস্ত্রব্যবসায়ী, কর্পোরেট পুঁজিবাদী পৃথিবীর প্রতি নূর- ই- ফাতিমাদের প্রতিবাদ। এখানেই তার ভালোবাসার মহাত্ব।
বর্তমান পৃথিবীতে যে ভয়াবহভাবে করোনা মহামারী রূপ ধারণ করেছে সেটি নিয়েও বিভিন্ন মতবাদ চালু আছে। কেউ কেউ এটাকে বলছে বায়োলজিক্যাল রোবট যা ল্যাবোরেটরীতে তৈরী হয়েছে পৃথিবী থেকে জনসংখ্যা কমিয়ে ফেলার জন্য। আরেকদল বলছে এটা আল্লাহর গজব বিধর্মীদের শায়েস্তা করার এটি আল্লাহ তা আলাহ দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন।
আমি কিছু কিছু কাঠমোল্লাদের আচার আচরণ ও কথাবার্তায় চরম বিরক্ত হয়েছি। যখন চীনের উহান, ইতালীর রোম, দক্ষিণ কোরিয়াতে করোনা আক্রান্ত হয়ে শত শত মানুষ মারা যাচ্ছে তখন কিছু কিছু কাঠমোল্লাদের বলতে শোনলাম এটা মুসলমানদের জন্য সুসংবাদ, কোনো মুসলিম দেশে এটা আসবেনা, মুসলমানদের ভয় নেই। আরো বেশি জমায়েত করে তারা ধর্মভীরু মানুষগুলোকে নিয়ে দোয়া খায়ের এর ব্যাবস্থা করতে লাগলো। এরপর যখন একে একে সমস্ত মুসলিম দেশসহ সমগ্র বিশ্বে এটা ছড়িয়ে পড়লো। মিরপুর টোলারবাগ মসজিদের ঈমাম করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেলো তখন তাদের টনক নড়লো। এখন তাদের বলতে শুনি এটাই শরীয়তের বিধান মহামারীর সময় ঘরে থাকা, ধর্মকর্ম নিজ গৃহেই করা। নবীজী এটাই বলে গেছেন। এরাই কিন্তু সেই ধর্ম ব্যবসায়ী যারা শুধুই ধর্মের নামে কুৎসা রটান কিন্তু কখনোই স্রষ্টার মহাত্ব এবং সৃষ্টির আসল সৌন্দর্য খোঁজেন না।

একবার চিন্তা করুনতো, পৃথিবীটা এখন কতটা অমানবিক হয়ে ওঠেছে। বিনা কারণে আমরা যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ছি, পৃথিবী থেকে সমস্ত ন্যায়নীতি এখন মঙ্গলগ্রহে দেশান্তরিত। পারমাণবিক অস্ত্র বানিয়েই আমরা ক্ষান্ত না, আমরা হাইড্রোজেন বোমা বানিয়ে ফেললাম, যেটার মানে হলো পৃথিবীর কোন কিছুর ক্ষতি হবেনা শুধু মানুষগুলো মরে যাবে। পৃথিবীতে দেশে দেশে আজ যতো আয়োজন তার অধিকাংশই এই মানবজাতিকে হত্যা করার জন্য। আমরা স্বর্ণখনি আর গোচারণক্ষেত্রের জন্য অবলীলায় পৃথিবীর ফুসফুস আমাজন বন ধ্বংস করে ফেলি। আমরা অতি তুচ্ছ কারণে বাঁধ দিয়ে নদীগুলোকে মেরে ফেলি। আমরা আজ পৃথিবীতে শুধুই ভোগবিলাস আর ধ্বংসযজ্ঞে লিপ্ত। মৃত্যুর আগে পৃথিবীর সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী ‘স্টিফেন হকিং’ সংবাদ সম্মেলন করে বলেছিলেন, ‘মানবজাতিকে এখানেই থামতে হবে, নিজেদের ভোগবিলাসের জন্য মানবজাতি যেভাবে প্রকৃতিকে ধ্বংস করছে, যেভাবে অতি তুচ্ছ কারণে একে অপরের বিরুদ্ধে ধ্বংসলীলায় লিপ্ত হচ্ছে তাতে পৃথিবী তার ধারণ ক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে, প্রকৃতি আর নিতে পারছেনা। এভাবে চলতে থাকলে পৃথিবীতে বড় ধরণের ডিজাস্টার হবে এমনকি মানবজাতি, ডাইনোসরদের মতো একদিন বিলীনও হয়ে যেতে পারে।’ আজ পৃথিবী যে ভয়াবহ হুমকির সম্মূখীন তা পুরোপুরি ‘Revenge of Nature’ বলে মনে হচ্ছে.
আমি প্রচন্ডভাবে মানবিকতায় বিশ্বাস করি এবং আমি স্রষ্টায় বিশ্বাসী। আমি মনে করি সমস্ত ধর্ম, বর্ণ, গোত্রের ঊর্ধ্বে মানুষ। এই যে পৃথিবীতে এতো রঙ, এতো বর্ণের মানুষ এটাই পৃথিবীর আসল সৌন্দর্য। তুমি তাঁর সৃষ্টির সৌন্দর্যের মাঝে তাকে খুঁজতে থাকো।
কাজেই আমি বিশ্বাস করি সমগ্র বিশ্বের, সমস্ত মানবিক মানুষগুলোর সম্মিলিত প্রয়াসে এই পৃথিবী আবারো তার স্বাভাবিক নিয়মে ফিরে আসবে। আবারো ভালোবাসায় ভরে উঠবে এ পৃথিবী। দূর্যোগের পর আকাশটা যেমন চকচকে সোনালী আলোয় ভরে যায়, পৃথিবীটাও তেমনি ফুলে ফলে আর শস্য শ্যামলে ভরে উঠবে। নূর- ই- ফাতিমার মতো আমরাও পৃথিবীর সমস্ত মরণাস্ত্রের খোসায় শুধুই ফুল ফোটাবো। সর্বশেষ বিচারে এই পৃথিবীতে শুধু মানবিকতা আর ভালোবাসাই থাকবে। সবশেষে আমি আমার সবসময়ের অন্যতম প্রিয় লেখক আর্নেস্ট হ্যামিংওয়ের সেই কথাটি আবারো বলে যেতে চাই ‘A Man can be destroyed but not defeated…..’ । জয় হোক
নূর- ই- ফাতিমাদের মতো মানুষের, জয় হোক মানবতার।