মো: বাছের আলী: ‘আমার শরীরের অংশটুকুই যদি আমার না হয়, তাহলে আমার বলে আর রইল কী? এমন আক্ষেপের মাঝে অশ্রুসিক্ত নয়নে একথাটিই বার বার বলছিলেন তিনি। জীবনের একটা সময়ে এসে ফাঙ্গাস মাইসিটোমা রোগে আক্রান্ত হয়ে অনেক চেষ্টার পরেও নিজের ডান পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুল হারিয়ে জীবন সম্পর্কে এমনই উপলব্ধি তাঁর। কথা হচ্ছিলো বাংলা মায়ের কাদামাটিতে বেড়ে ওঠা সাধারণ এক বালক থেকে দেশের প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী হওয়া একজন মানুষের সাথে। তাঁর নাম আব্দুর রাজ্জাক। পেশায় ব্যবসায়ী হলেও জীবনের গভীর উপলব্ধিবোধ থেকে নিজেকে নিয়োজিত করেছেন আর্তমানবতার সেবায়। নিজের হাতে গড়ে তুলেছেন চ্যারিটি প্রতিষ্ঠান ‘আরমা ওয়েলফেয়ার সোসাইটি’। স্বপ্ন দেখেন মানুষের সেবায় আরো কিছু করার। তাঁর আশা জীবনের বাকী অংশটুকু যেন কাটিয়ে দিতে পারেন সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের সেবা করে। তাঁর কথায় যেন বার বার প্রতিধ্বনিত হচ্ছিলো ভুপেন হাজারিকার অমর সংগীতের বাণী ‘মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য’।

আব্দুর রাজ্জাক এর জন্ম কুষ্টিয়া জেলার দৌলতপুর থানার অন্তর্গত প্রত্যন্ত এক গ্রাম ফিলিপনগরে। কৃষি কর্মকর্তা বাবা আব্দুল মোত্তালিব এবং গৃহিণী মায়ের ৪ ছেলে ও ২ মেয়ের মধ্যে তিনি ৪র্থ সন্তান। তার সফল ব্যবসায়ী হয়ে ওঠার গল্প জিরো থেকে হিরো হয়ে ওঠার গল্পকেও হার মানায়। অতি স্বল্প পুঁজি আর মনে জমানো অভিমান নিয়ে একদিন বাড়ি থেকে বেরিয়ে পা দেন ব্যবসার পথে। দূর্গম এই পথে চলতে গিয়ে সাক্ষী হয়েছেন জীবনের কঠিনতম ব্যতিক্রমী সব অধ্যায়ের। কোন প্রেরণা আপনাকে ব্যবসায়ী হওয়ার অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মনোবল, কঠোর পরিশ্রম, বড় হওয়ার স্বপ্ন, প্রতিশ্রুতি রক্ষা করার মানসিকতা এবং ধৈর্য আমাকে ব্যবসায়ী হয়ে ওঠতে সাহস যুগিয়েছে। এ প্রসঙ্গে জানাতে চাই, আমি খুব মেধাবী ছাত্র ছিলাম না। অবশ্য শিক্ষাজীবন শেষ করে চাকরি করবো, এমনটি ঘূর্ণাক্ষরে আমি কল্পনাও করিনি। বলতে পারেন একেবারে খালি হাতে আমার ব্যবসার হাতেখড়ি। যেদিন আমি বাড়ি থেকে বের হই, সেদিন আমার পকেটে ছিল ১১ টাকা ২৫ পয়সা আর ছিল অসম্ভব মনোবল। ব্যবসার শুরুতে বন্ধুর মা-এর কাছ থেকে ৫,০০০/- টাকা ঋণ করেছিলাম এক মাস পরে ফেরত দেবো বলে। পরবর্তীতে বন্ধুর ভাবীর কাছ থেকে একই কথা বলে আরো ৫,০০০/- টাকা ঋণ করে বন্ধুর মা এর ঋণ প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী পরিশোধ করেছিলাম। সর্বশেষ বন্ধুর বড় ভাই এর দোকান থেকে ৬,০০০/- টাকার রং বাকিতে ক্রয় করে অন্য একটি দোকানে ৫,৫০০/- টাকায় নগদে বিক্রি করে বন্ধুর ভাবীর ঋণও প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী পরিশোধ করেছিলাম। ব্যবসার শুরু থেকে এভাবেই আমি আমার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছি, যা আজও অব্যাহত রয়েছে। আমি মনে করি মানুষের বিশ্বাস অর্জন করতে পারলে, অর্থের কোন সমস্যা হয় না। আজকের আমি দীর্ঘ প্রায় ৩৫ বছরের পরিশ্রম ও সাধনার ফসল। অর্থের অভাবে না খেয়ে ঢাকা শহরে রাত্রিযাপন করেছি, তবুও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করিনি এবং ব্যবসার নীতি ও আদর্শকে বিসর্জন দেইনি। এমনকি আমার জ্ঞানত: অন্যের অর্থ আত্মসাৎ করা কিংবা অন্যকে ঠকানোর কথা কখনো কল্পনাও করিনি। কারো উপকার করেছি কি-না জানিনা তবে এটুকু বলতে পারি, আমার জ্ঞানত: কারো ক্ষতি করিনি। যে কাজ করি সেটা খুব মনোযোগ দিয়ে দায়িত্ব সহকারে করি। বলতে পারেন এটাই আমার মূলধন’।

আব্দুর রাজ্জাক বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড-এর অধীনে ১৯৮৫ সালে ঠিকাদারী ব্যবসার মাধ্যমে কর্মজীবন শুরু করেন এবং বিদ্যুৎ সেক্টরেই মূলত তাঁর ব্যবসার ভিত মজবুত হয়। ১৯৯৮ সাল থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার উন্নয়নে ৪০ জেলায় কাজ করেন। তাছাড়া বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প, সঞ্চালন লাইন নির্মাণসহ গ্রীড উপকেন্দ্র নির্মাণেও ব্যাপক কাজ করেন। তিনি একই সময়ে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড কন্ট্রাক্টরস এসোসিয়েশনেরও নেতৃত্ব দিয়েছেন। ব্যবসায়ী জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতার বলে ধীরে ধীরে নিজ হাতে যতœ আর মমতায় গড়ে তুলেছেন আরমা ইলেকট্রিক কোম্পানি, আরমা রিয়েল এস্টেট লিমিটেড, আরমা লাইন হার্ডওয়্যার অ্যান্ড এক্সেসরিজ লিমিটেড, আরমা এগ্রিকালচার লিমিটেড, এশা হোল্ডিংস্ লিমিটেড। বর্তমানে এসব প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত রূপ ‘আরমা গ্রুপ-এর তিনি প্রধান নির্বাহী ও চেয়ারম্যান।

এছাড়াও জীবন যুদ্ধে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে তিনি কল্যাণমূলক কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেন। এজন্য তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন আরমা ওয়েলফেয়ার সোসাইটি, আব্দুর রাজ্জাক স্কুল অ্যান্ড কলেজ এবং আব্দুর রাজ্জাক ফিশারিজ টেকনোলজি ইনস্টিটিউট। এ প্রসঙ্গে তিনি জানান, ‘ভাল কিছু করতে শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। তাই আমি চিন্তা করেছি জীবনে যদি কিছু দানই করি সেটা যেন শিক্ষায় হয়। কারণ শিক্ষার মাধ্যমেই আলোকিত মানুষ গড়া সম্ভব’। সারা বাংলাদেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অসচ্ছল মেধাবী শত শত শিক্ষার্থীর পড়াশোনার খরচ যোগাচ্ছেন প্রচারবিমূখ এই চ্যারিটি ব্যক্তিত্ব। কুষ্টিয়া জেলার দৌলতপুর উপজেলা ও পাবনা জেলার ঈশ্বরদী উপজেলায় প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে আব্দুর রাজ্জাক মেধাবৃত্তি কার্যক্রম ২০০৬ থেকে চলমান রয়েছে। এ কার্যক্রমের আওতায় প্রতিবছর প্রায় ২০০ জন মেধাবী ছাত্র/ছাত্রীদেরকে এককালীন আর্থিক সহযোগিতা করা হয়ে থাকে। আব্দুর রাজ্জাক বেশ কয়েকটি সামাজিক প্রতিষ্ঠানের সাথে সম্পৃক্ত রয়েছেন। ২০১৭ সাল অবধি যুক্ত ছিলেন রোটারী ক্লাব অব গুলশান গ্রীণ এর সাথে। এছাড়াও যুক্ত আছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের এমিরেটার্স প্রফেসর ড. এম আফজাল হোসেনের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত Helping Organisation for Promising and Energetic Students (HOPES) নামের একটি প্রতিষ্ঠানের সাথে। যার মাধ্যমে শতশত শিক্ষার্থীদের শিক্ষাবৃত্তির ব্যবস্থা করে থাকেন। এছাড়া তিনি ২০১১-২০১৪ মেয়াদে কুষ্টিয়া জেলা সমিতি ঢাকা’র মহাসচিব এবং বর্তমানে সিনিয়র সহ-সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

জীবনে আর কী কী পেতে চান? মৃদু হেসে কৃতি এ মানুষটি জানান, ‘জীবনে তেমন আর কিছু পাওয়ার নেই, এখন দেবার পালা। ঢাকাস্থ বনশ্রীতে আব্দুর রাজ্জাক স্কুল অ্যান্ড কলেজ-এর নামে ২৯.৫৪ শতক জমি ক্রয় করা হয়েছে। আরো কিছু জমি ক্রয় প্রক্রিয়াধীন। এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটিকে একটি আদর্শ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলাই মূল লক্ষ্য। এটি একটি অলাভজনক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানের কোনো অর্থই আমি বা আমার উত্তরাধীকারদের ভোগ করার সুযোগ নেই। তাছাড়া ঢাকা’র অদুরে আশুলিয়ায় একটি সেবা কমপ্লেক্স নির্মাণ করার পরিকল্পনা রয়েছে। যেখানে থাকবে সকল সুযোগ সুবিধা সম্বলিত একটি প্রবীণ আশ্রম, মসজিদ কাম মাদ্রাসা আর একটু ঘুমানোর জায়গা। দো’আ করবেন সেবা কমপেক্সটি যেন বাস্তবায়ণ করে যেতে পারি’।
আপনিতো বর্তমানে ইট-পাথরে সাজানো ঢাকা শহরে বসবাস করছেন এখনো কী গ্রামের সেই কাদামাটির কথা মনে পড়ে? আবারও মৃদু হেসে তিনি উত্তর দিলেন ‘গরু-মহিষ আর আমি একই পানিতে গোসল করেছি। গ্রাম আমাকে জীবনের প্রথম সময়ে লালন করেছে সেই গ্রামকে ভুলি কিভাবে? আমি বিশ্বাস করি ফলবান বৃক্ষ যেমন শিকড় ভুলে না গিয়ে মাটিকে আঁকড়ে রাখে, ঠিক তেমনই প্রতিটি সফল মানুষেরও উচিত নিজের শিকড়কে ভুলে না যাওয়া। নিজের অতীতকে অস্বীকার না করা।’ তাঁর কথা যেন কবি আল মাহমুদের তিতাস কবিতার প্রতিধ্বনি- ‘ভাবান্তর কিছুই খুঁজিনি আমি, যতবার এসেছি এ তীরে নীরব তৃপ্তির জন্য আনমনে বসে থেকে পাড়ে, নির্মল বাতাস টেনে বহুক্ষণে ভরেছি এ বুক’।

বর্তমান প্রজন্মের তরুণদের উদ্দেশ্যে আপনার পরামর্শ কি? জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি তরুণদের বলবো যারা সনদধারী অথচ সনদ অনুযায়ী কাঙ্খিত চাকরি পাচ্ছো না, তারা হয় যে কোনো ধরনের ব্যবসা শুরু করবে এবং লেগে থাকবে। অথবা কারিগরি শিক্ষা নেবে, তাহলে অন্তত কর্মহীন থাকবে না। তোমাদের অর্থ নেই অথবা সুযোগ নেই এটা কোন অজুহাত হতে পারে না। প্রয়োজন শুধু সঠিক পরিকল্পনা, মনোবল, পরিশ্রম, সততা এবং প্রতিশ্রুতি রক্ষা করার মানসিকতা। এগুলো অর্জন করতে পারলে সফলতা আসবেই। মনে রাখবে তোমাদের উন্নতির অর্থই হলো তোমাদের পরিবার, আত্মীয়-স্বজন, সমাজের সুবিধা বঞ্চিত সাধারণ মানুষ, সর্বোপরি জাতি এবং দেশের উন্নতি’।

ব্যক্তি জীবনে আব্দুর রাজ্জাক ৩ সন্তানের জনক। বড় ছেলে কানাডায় মাস্টার্স করছে, ছোট ছেলে আমেরিকায় গ্রাজুয়েশন করছে এবং একমাত্র কন্যা অষ্টম শ্রেণিতে পড়াশুনা করছে। তিনি সন্তানদের জন্য সকলের কাছে দো’আ চান।