মো: মোস্তফা কামাল মিন্টু
বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কানাডীয় রাজনীতিবিদ। ২০১৮ সালে কানাডার ওন্টারিও প্রদেশের টরন্টো এলাকার স্কারবরো সাউথওয়েস্ট (Scarborough Southwest) আসন থেকে জয়ী হয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন। এর আগে কোনো বাঙালি টরন্টো এমনকি কানাডার কোনো নির্বাচনে জিততে পারেন নি। ডলি বেগম প্রথমবারের মতো প্রোভিন্সিয়াল পার্লামেন্ট নির্বাচনে জিতে শুধু কানাডায় নয়, সারা বিশ্বের বাঙালিদের জন্য ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন। ডলি বেগমই নর্থ আমেরিকায় প্রথম বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত তরুণ রাজনীতিক, যিনি অন্টারিও প্রাদেশিক সংসদে সরাসরি নির্বাচিত একজন সদস্য। প্রবাস মেলা’র এবারের প্রচ্ছদে তাকে নিয়েই আমাদের আয়োজন।
ডলি বেগমের জন্ম সিলেটের মৌলভীবাজার জেলায়। তাঁর বাবার নাম রাজা মিয়া, মায়ের নাম জবা বেগম। মা-বাবা ও ছোট ভাইয়ের সঙ্গে ১১ বছর বয়সে তিনি কানাডায় চলে যান। কানাডা যাওয়ার আগে ডলি বেগম মৌলভীবাজারের স্থানীয় মনুমুখ বাজরাকোনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে লেখাপড়া শেষে মনুমুখ পিটি বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে ৬ষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেন।
কানাডায় গিয়ে জীবনের চরম বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয় ডলি বেগমকে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম বাবা রাজা মিয়া সড়ক দুর্ঘটনায় পড়ে অনেক বছর হাসপাতালের বিছানায় পড়ে থাকেন। এর মধ্যেই ২০১২ সালে ইউনিভার্সিটি অব টরন্টো (সেন্ট জর্জ) থেকে রাজনীতি বিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন ডলি। ২০১৫ সালে উন্নয়ন ডেভেলপমেন্ট, অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ও প্ল্যান্টে ইউসিএল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স সম্পন্ন করেন।

পড়াশোনা শেষ করে সিটি অব টরন্টোতে প্রায় ১০ মাস কাজ করেন। গত বছরের এপ্রিল পর্যন্ত রিচার্স অ্যানালিস্ট হিসেবে কাজ করেন দ্য সোসাইটি অব অ্যানার্জি প্রফেশনে। বর্তমানে অন্টারিওর কিপ হাইড্রো পাবলিক ক্যাম্পেইনের প্রধান সমন্বয়কের দায়িত্বে রয়েছেন ডলি। স্কারবারো স্বাস্থ্য জোটের সহ সভাপতি হিসেবেও কাজ করেছেন। এ ছাড়া ওয়ারডেন উডস কমিউনিটি সেন্টারের উপ-প্রধান হিসেবে পার্টির কাজ করছেন ডলি বেগম।
গত বছরের এপ্রিলে ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পান ডলি বেগম। মনোনয়ন পাওয়ার পর থেকেই নড়েচড়ে ওঠেন কানাডায় বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিরা। তাদের আশা ছিল ডলি জিতবেন, আর জিতলে তা হবে ইতিহাস। ডলি নির্বাচনে জিতলেন এবং কানাডায় বাংলাদেশি হিসেবে ইতিহাস সৃষ্টি করলেন।

একজন বাঙালির এই বিজয়ে স্বাভাবিকভাবেই উল্লসিত কানাডাপ্রবাসী বাংলাদেশিরা। ডলি বেগমের নির্বাচনী প্রচারণার স্লোগান ছিল, ‘আমাকে নির্বাচিত করুন, আমি আপনাদের আশাহত করব না।’ বিজয়ী হওয়ার পর ভাষণে ডলি বলেছিলেন, আমি জনগণের পক্ষে লড়াই করে যাব। প্রতিনিয়ত জনগণের কথা শোনা ও তাদের জন্য সেই সুযোগের দ্বার উন্মুক্ত রাখাই আমার চ্যালেঞ্জ। নির্বাচনে জয়ের পর ডলি বলেন, আমি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, আমি আপনাদের নিচে নামতে দিবনা। ‘Promise – I won`t let you down’
তার বিজয়ে প্রবাসী বাংলাদেশিরা খুবই খুশি হয়েছিলেন, তারা বলেছেন প্রথম কোনো বাংলাদেশি কানাডার পার্লামেন্টে বসেছেন। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কেউ হয়েছেন কানাডার এমপিপি। বাংলাদেশি হিসেবে এটা আমাদের জন্য খুব গর্বের বিষয়। এখন খুব সহজেই তাঁর কাছে আমাদের সুখ-দুঃখের কথা বলা যাবে। ডলি সরকারের নীতিনির্ধারকদের কাছে আমাদের হয়ে দাবি-দাওয়া পৌঁছে দেবেন। এর চেয়ে আনন্দের আর কি হতে পারে!
অর্জন: এমপিপি নির্বাচিত হবার পর ডলি বেগম সাশ্রয়ী মূল্যের বিদ্যুৎ, মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা, লিঙ্গ সমতা এবং যুব উন্নয়নে কাজ করতে থাকেন। এছাড়াও তিনি শ্রমিক সংগঠন, কমিউনিটি একশ্যান গ্রুপ এবং পরিবেশ কর্মীদের সাথে কাজ করে “Keep Hydro Public নামে প্রচারাভিযান শুরু করে Toronto Hydro and Wasaga Distribution Inc বিক্রিকে সফলভাবে বন্ধ করতে সমর্থ হন। ডলি বেগমের স্কারবার্জ, জিটিএ বাংলাদেশ, ইথিওপিয়াতে যুব শিক্ষা ও নেতৃত্বকে শক্তিশালী করতে এক দশকেরও বেশি অভিজ্ঞতা রয়েছে। ডলি বেগম ‘ওম্যান অব ডিস্টিঙ্কশন’ (Woman of Distinction) ক্যাটাগরিতে ‘পেস-আরএমএম উইম্যান অ্যাচিভার্স এ্যাওয়ার্ড ২০১৯’ পেয়েছেন। বাংলাদেশি-কানাডিয়ানদের রাজনৈতিক স্পৃহার সফল অগ্রপথিক হিসেবে কমিউনিটিতে বিশেষ অবদান রাখার জন্য অলাভজনক সংস্থা পেস (প্রগ্রেসিভ অ্যাকশন ফর কমিউনিটি এ্যামপাওয়ারমেন্ট) ও টরন্টো থেকে সম্প্রচারিত শিক্ষামূলক বিনোদন চ্যানেল ‘রেডিও মেট্রো মেইল’ (আরএমএম) প্রতি বছর এ পুরস্কার প্রদান করে।

এই পুরস্কার পাওয়ার পর ডলি উদ্যোক্তাদের ধন্যবাদ জানিয়ে বলেছিলেন, কমিউনিটির সর্বস্তরের মানুষ ও সংগঠনের ভালোবাসা ও বিশ্বাসের ওপর ভর করেই আমার সমস্ত কাজ, কমিউনিটির মানুষের ক্ষমতায়ণের জন্যে সাধ্যমত আমি সব কিছুই করতে প্রস্তুত, মানুষের জন্যে, মানুষের পরামর্শেই কাজ করতে চাই। এই সম্মাননা মানুষের ভালোবাসারই আরেক রূপ, আমি আবেগাপ্লুত।
ডলি বেগম স্কারবরো তে বেড়ে উঠেছেন, বর্তমানেও তিনি পরিবার নিয়ে সেখানেই বসবাস করছেন। তিনি বলেন, filled with the hopes and dreams that maû of our parents brought with them after leaving everything behind. প্রত্যাশা ও স্বপ্ন পূরণ তাই যা অনেক পিছনে যাবার পরে আমাদের পিতামাতা সাথে নিয়ে এসেছেন।
কানাডায় বাঙালি কমিউনিটির প্রায় সকল অনুষ্ঠানেই ডলি বেগম উপস্থিত থাকার চেষ্টা করেন। অনুষ্ঠানগুলোতে তিনি প্রায়ই বলে থাকেন আমিও একজন বাংলাদেশি, আপনাদের অনুষ্ঠানে এসে আমি খুবই গর্বিত। আপনাদের কল্যাণে আমি কাজ করে যেতে চাই। মৌলভীবাজারের ডলি বেগম কানাডায় বেড়ে ওঠা বাংলাদেশি নতুন প্রজন্মের তরুণদের প্রেরণা হয়ে কাজ করছেন।