রফিক আহমদ খান, কুয়ালালামপুর, মালয়েশিয়া
ঘুরে এলাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা মালয়েশিয়ার পাহাড়ি পর্যটন এলাকা ক্যামেরোন হাইল্যান্ডস। যেখানে অনেক উঁচু উঁচু পাহাড়ের সমারোহ। সবুজে ভরপুর পাহাড়ের গায়ে গুহা আর গুহা। পাহাড়ের চূড়ায় মেঘেরা খেলে ডানা মেলে। ক্যামেরোনের পাহাড়গুলো যেনো মেঘেদের বাড়ি। মেঘেরা সেখানে ঘর-সংসার পেতেছে। এ জন্য সেখানে সবসময় মেঘ থাকেই। মেঘকন্যারা নিজেদের ঘর-সংসার ফেলে যাবেই বা কোথায়। ওরা (মেঘ) সেখানেই ওড়ে বেড়ায়। কখনো বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ে। যতই বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ুক। সেখানে মেঘ বালিকাদের পুন:জন্ম হয়ে যায়। সবসময়ই মেঘ বালিকারা ঘুরে বেড়াবেই।
গুহার উপরের দিকে শাক-সবজি বাগান, আঁকা-বাঁকা সড়কের পাশ ঘেঁষে স্ট্রবেরি বাগান। স্ট্রবেরি বাগানগুলো সবার জন্য উন্মুক্ত। যেকোনো বাগান পরিদর্শন করা যায়। সব বাগানই অত্যন্ত চমৎকারভাবে সাজানো-গোছানো। দেখে মনজুড়িয়ে যায়। সব বাগানের সামনেই বিক্রয় প্রদর্শনী আছে। সেখানে তাজা স্ট্রবেরি ও স্ট্রবেরিতে তৈরি চকোলেট সহ নানা ধরনের খাবার বিক্রয় হয়।
স্ট্রবেরি ফলটা আসলেই দেখতে খুব সুন্দর। মায়াবী রঙ ফলটির। মেঘের ছায়ায়, মেঘের মায়ায়, মেঘে ঘেরা পাহাড়ে হয় বলে তার চেহারা এতো সুন্দর!
ক্যামেরোনে আছে মৌমাছি মিউজিয়াম। মৌমাছি মিউজিয়ামে পাওয়া যায় খাঁটি মধু। মৌমাছি মিউজিয়াম থেকে সামনে আরেকটু গাড়ি চালালেই দেখা যায় বাটারফ্লাই ফার্ম। এর আগে আছে গোলাপ বাগান ‘রোজভেলী’। পাঁচ রিঙ্গিত প্রবেশ ফি দিয়ে বাগানে ঢুকলেই গোলাপ ও ফুলপ্রিয় যে কোনো মানুষের মন ভরে যাবে ফুলের সৌরভে। সেখানে আছে নানান রঙের নয়নাভিরাম গোলাপ ফুল। কুয়ালালামপুরের চায়নাটাউনে কাঁচা ফুলের দোকানগুলোতে বহু বছর ধরে দেখে আসছি নানা রঙের গোলাপ ফুল। কেউ কেউ বলেন, এগুলো রঙ দিয়ে কালার করা হয়; গোলাপ এতো রঙের হয় না। রোজভেলীতে ঢুকেই বুঝলাম চায়নাটাউনের সেই গোলাপগুলোর রঙ নকল নয়। আসলেই গোলাপ ফুল বহু রঙের হয়। রোজভেলীতে গোলাপ ছাড়াও আছে বিভিন্ন ফুল, ঝর্ণা, ময়ুরসহ নানান পাখি ও ছবি তোলার মত ভিউ নিয়ে বৈঠকখান।

বাটারফ্লাই ফার্ম ফেলে গেলেই মিলবে পাচার মালাম (রাতের বাজার, যেটা বিকেল থেকেই বসে)। পাচার মালামে স্ট্রবেরিসহ তাজা শাকসবজি ও স্থানীয় বিভিন্ন ফল বিক্রয় হয়। সেখান থেকে উঁচুনিচু পথ চলতে চলতে গাড়ি পৌঁছে গেলো চা বাগান ক্যামেরোন টি ভেলী। অসাধারণ সুন্দর ক্যামেরোন টি ভেলী। দুইপাশে তার উঁচু পাহাড়। পাহাড়ের চূড়ায় সাদা-কালো মেঘ ওড়ে। পাহাড়ের ঢালু ও গুহায় বিশাল চা বাগান। বাগানের একপাশে ওপরে আছে একটি রেস্টুরেন্ট। আরেকপাশে পাহাড়ের কোল ঘেঁষে সড়ক। চা বাগান ভিউ রেস্টুরেন্টটিতে বসে চা বাগান, উঁচুপাহাড় ও মেঘ দেখে দেখে চা খেতে সত্যিই দারুণ উপভোগ্য। রেস্টুরেন্ট লাগোয়া আছে চা বিক্রয়কেন্দ্র। সেখান থেকে নানা প্রকার চা-পাতা, স্যুভেনিয়র, ‘ক্যামেরোন হাইল্যান্ডস’ লেখা টি-শার্ট কেনা যায়। এসব অবশ্য সব স্পটেই পাওয়া যায়।
নিচে নামার পথে দেখা মিলে স্থানীয় আদিবাসীদের (ওরাং আসলি)। অর্ধেক নামার পর লাতান ইস্কান্দারে রয়েছে নয়নাভিরাম পাহাড়ি ঝর্ণা। ঝর্ণায় এলাকায় রয়েছে আদিবাসীদের হাতে তৈরি জিনিসের কয়েকটি দোকান। পাশাপাশি খাবারের দোকানও রয়েছে। পুরো ক্যামেরোন হাইল্যান্ডসে বিভিন্ন জায়গায় সড়কের পাশে মার্কেট ও হোটেল। রয়েছে কুয়ালালামপুরের মতই পনের-বিশ তলা অ্যাপার্টমেন্ট।
ক্যামেরোন হাইল্যান্ডস পাহাং প্রদেশের একটি জেলা। সমুদ্রপৃষ্ঠ হতে ২৬০০ থেকে ৫২৫৯ ফুট উচুঁ ক্যামেরোন হাইল্যান্ডস। এটি মালয়েশিয়ার প্রাচীনতম পর্যটন এলাকাগুলোর একটি। আমাদের পিকনিক বাস কুয়ালালামপুর থেকে সমতলে দুই ঘণ্টা পথচলার পর থেকে পৌঁছে যায় পাহাড়ি পথে; সম্পূর্ণ পাহাড়ি পথ। মাত্র দুই লেনের পাহাড়ি সড়ক। একলাইন দিয়ে উপরে উঠা, আরেক লাইন দিয়ে নিচে নামার। আমরা অবশ্যই যে পথ দিয়ে ক্যামেরোন হাইল্যান্ডস’র উপরে উঠেছি, সে পথ দিয়ে নিচে আসি নি। আমাদের বাস পর্যটন স্পটগুলোয় থামতে থামতে অন্য পথ দিয়েই নিচে নেমেছে। সর্বশেষ আমরা দেখেছি লাতান ইস্কান্দারে পাহাড়ি ঝর্ণা।

পাহাড়ি পথ বেয়ে বাস যখন উপরে উঠছিলো তখন মনে হচ্ছিল রাঙামাটি যাচ্ছি। রাঙামাটির মতো আঁকাবাঁকা পথ। তবে ক্যামেরোনের সড়ক রাঙামাটির চেয়ে অনেক বেশি আঁকাবাঁকা। গাড়ি প্রতি মিনিটেই মোড় নেয়। এমনকি কোথাও কোথাও মিনিটে দুইবারও মোড় নিতে হয় গাড়ি। রাঙামাটিতে ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক হলেও গাড়ি যে গতিতে চলে, ক্যামেরোন হাইল্যান্ডস এ গাড়ি চলে এর চেয়ে অনেক কম গতিতে। সড়কে সব জায়গায় লেখা আছে কত গতিসীমায় গাড়ি চলাতে হবে। বাসের ড্রাইভার সড়কে লেখা নির্দেশনার বাইরে গাড়ি চালায়নি কোথাও। তাই ক্যামেরোন হাইল্যান্ডসে উপরে উঠতে মোটামুটি সময় খরচ হয় অনেক। উপরে উঠে প্রথমেই দেখা যাবে স্ট্রবেরি বাগান।
ক্যামেরোনে আছে অসংখ্য পর্যটনস্পট। গাড়িত পথ চলতে চলতে বিভিন্ন স্পটে থেমে থেমে পরিদর্শন করেছি স্পটগুলো। যাওয়া-আসা ও ঘোরাঘুরি সব মিলিয়ে আমাদের বরাদ্দ ছিলো একদিন। প্রবাসী তরুণ উদ্যোক্তা শাহাবুদ্দিন আহমেদের ‘ট্রাভেল স্টোরিজ’ এর আয়োজনে ছুটিরদিন রোববার (৭ জুলাই) সকাল আটটায় পিকনিকের বাস ছেড়েছিলো কুয়ালালামপুরের মসজিদ জামেক ডব্লিউ হোটেলের সামনে থেকে। ক্যামেরোন ঘুরে রাত পৌনে বারোটায় বাস ফিরে এসে মসজিদ জামেক এলআরটি স্টেশনের সামনে থামার মধ্য দিয়ে ষোল ঘণ্টার আনন্দভ্রমণের পরিসমাপ্তি হয়।
ট্রাভেল স্টোরিজ’র কথা একটু বলতেই হয়। শাহাবুদ্দিন নামে বাংলাদেশি এক তরুণ আটটা-পাঁচটা কাজ করেন একটি ফার্নিচার কোম্পানিতে। ছুটিরদিনে প্রবাসীদের আনন্দ ভ্রমণ ও পিকনিকে নিয়ে যাবেন বিভিন্ন পর্যটন কেন্দ্রে। মালয়েশিয়ার দর্শনীয় স্থানগুলোতে ঘুরাবেন, দেখাবেন, আনন্দ দিবেন স্বদেশ ও স্বজন ছেড়ে দূরে থাকা প্রবাসীদের। সেই জন্যই গড়ে তুলেছেন ‘ট্রাভেল স্টোরিজ’।