নজরুল ইসলাম হাবিবী, লন্ডন, যুক্তরাজ্য
মা হচ্ছেন একজন পূর্ণাঙ্গ নারী। একজন পূর্ণাঙ্গ মহামানব। এরপর ‘মা’ শব্দের আর বড় কোন ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ নেই। ‘মা’ বর্ণ, একটি শব্দ, সর্বোপরি একটি মহাকাব্য। এ জন্য বিভিন্ন ধর্মে, নীতিশাস্ত্রে, বিজ্ঞের জ্ঞানে, গানে, তপসীর ধ্যানে সব সময় জুড়ে থাকে, ঘিরে রাখে মা এবং মা। এদের কাছে মা-ই জগত, মা-ই জীবন।
মা এমন এক সত্ত্বা যার বিরাটত্ব বিশ্ব থেকে বড়। যার মহত্বে কারো অমত নেই। যার ভালোবাসার কিনারা নেই। যার স্নেহের সীমা নেই। যার বৌকের সমান কোনো স্বর্গ নেই। যার এক চিলতে হাসির সাথে পৃথিবীর কোনো ফুলের সাথে, কোনো দ্বাদশী চাঁদের সাথে, কোনো তারকার সাথে মিল নেই। যার কোল বিশ্ব থেকে বড়। মানুষ বড় কোন কিছুকে সাগরের সাথে তুলনা করে, অথচ সাগরের সীমা আছে। সাগরকে আমরা মাপতে পারি। মায়ের স্থান পৃথিবী থেকেও বড়, অসীম, অকুল ও অনন্ত।
যেভাবেই হোক আমরা ধর্মপ্রীয়। ধর্মকে নিয়ে যত কথাই হোক না কেন, ধর্মই যে তাদের শেষ সম্বল তা সবাই স্বীকার করে।
তাই আসুন মাকে নিয়ে ধর্ম কি বলে একটু দেখি
সনাতন ধর্মে মা:
হিন্দু ধর্মে মা এর অবস্থান অবিস্মরণীয়। তাঁদের ধর্মে দেবতার চেয়ে দেবীর আধিক্য। শ্রী শ্রী চন্ডির শুরুতেই ‘যা দেবী (দেব নয়) সর্বভূতেষু’। তাই সম্ভবত তাঁদের পূজাকরীদের মধ্যে পুরুষের চেয়ে নারীরাই একটু এগিয়ে। আমার গ্রামের বাড়ির সীমানায় হিন্দুদের বাড়ি। যখন সকাল-সাঁঝে গৃহলক্ষ্মী কোন নারী দিচ্ছেন পুজো, তখন আরেক পুরুষ গৃহঅলক্ষ্মী কুঁজো, ঘুমের উমে কাৎ।
‘মা’ নামে আমার একটি কবিতার বই আছে। বইটি প্রকাশিত হয়েছিল দুই হাজার সালে। এর একটি কবিতার নাম ‘মন্দাকিনী’। কবিতাটি উৎসর্গ করেছি আমার ‘ছোট্টবন্ধু’ অপূর্ব ভট্রচার্যকে; তার মাতার অকাল মৃত্যুতে।
সনাতন ধর্মে সুন্দর একটি শ্লোকে উল্লেখ আছে: “স্ববংশবৃদ্ধিকামঃ পুত্রমেকমাসাদ্য..”। আবার সন্তান লাভের পর নারী তাঁর রমণীমূর্তি পরিত্যাগ করে মহীয়সী মাতৃরূপে সংসারের অধ্যক্ষতা করবেন। তাই মনু সন্তান প্রসবিনী মাকে গৃহলক্ষ্মী সম্মানে অভিহিত করেছেন। তিনি মাতৃ-গৌরবের কথা বিশ্ববাসীকে জানিয়েছেন এভাবে- “উপাধ্যায়ান্ দশাচার্য্য আচায্যাণাং শতং পিতা। সহস্রন্তু পিতৃন্মাতা গৌরবেণাতিরিচ্যতে” [ (মনু,২/১৪৫) অর্থাৎ দশজন উপাধ্যায় (ব্রাহ্মণ) অপেক্ষা একজন ‘আচার্যের গৌরব অধিক, একশত আচার্যের গৌরব অপেক্ষা পিতার গৌরব অধিকতর; সর্বোপরি, সহস্য পিতা অপেক্ষা মাতা সম্মানার্হ। বাহ্ বাহ্, কী অমরবাণী! কী অসাধারণ কথা! আর কী চাও আমাদের ছেলেমেয়েরা?
বৌদ্ধ ধর্মে মা:
‘বৌদ্ধধর্মে ‘নারী -পুরুষ সমান । দুঃখমুক্তির জন্য ‘নির্বাণ’ ছাড়া অন্যকোন পথ নেই বলে বৌদ্ধধর্ম মনে করে । এই ‘নির্বাণ’ লাভের একমাত্র উপায় হলো ‘অরহত্ত্ব মার্গফল’ লাভ করা । এই ‘অরহত্ত্ব মার্গফল’ পুরুষ হয়ে যেমন লাভ করা যায় তদ্রুপ নারী হয়েও লাভ করা যায় । সবচেয়ে মজার বিষয় হল, অরহত্ত্ব লাভ করার পর যেই ‘নির্বাণ’ অধিগম হয়, তা একজন সম্যক সম্বুদ্ধের জন্য যে রূপ তেমনি একজন নারী যদি ‘নির্বাণ’ লাভ করে তারজন্যও একইরূপ, এই জায়গায় বিন্দুমাত্র ও বৈষম্য নেই ।
আমার কাছে ত্রিপীঠকের অনুবাদ আছে। দেশে থাকতে শতবার বক্তব্য রেখেছি, কবিতা আবৃত্তি করেছি বৌদ্ধ মন্দিরে। রাউজানের জ্ঞানানেন্দু বিহারের অধ্যক্ষ শ্রীমত জ্ঞানানেন্দু মহাথেরো
(সম্ভবত এখন মহাস্থবির)আমাকে সবসময় বই-পুস্তক উপহার দিতেন। উনার পদন্নোতির ম্যাগাজিনে আমার কবিতা আছে। মন্দিরে যখন যেতাম, দেখতাম, পুরুষের চেয়ে নারী পুজারীই বেশী।
ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষের কাছে তার মা অতি মূল্যবান হয়ে থাকে। শুধু মানুষ কেন? পৃথিবীর প্রতিটি প্রাণীই তার মায়ের কাছে ঋণী। সে ঋণ শোধ করার কোনো উপকরণ স্রষ্টা দুনিয়ায় সৃষ্টি করেন নি।
ইসলাম ধর্মে মা:
কোরআনুল কারীমে আল্লাহ পাক বলেন, ‘’আর আমি মানুষকে মা-বাবার সঙ্গে সদয় ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছি। তার মা তাকে অতি কষ্টে গর্ভে ধারণ করেছেন এবং অতি কষ্টে তাকে প্রসব করেছেন। তার গর্ভধারণ ও দুধপান ছাড়ানোর সময় লাগে ত্রিশ মাস। অবশেষে যখন সে তার শক্তির পূর্ণতায় পৌঁছে এবং চল্লিশ বছরে উপনীত হয়, তখন সে বলে, হে আমার রব, আমাকে সামর্থ্য দাও, তুমি আমার ওপর ও আমার মা-বাবার ওপর যে নিয়ামত দান করেছ, তোমার সে নিয়ামতের যেন আমি কৃতজ্ঞতা আদায় করতে পারি এবং আমি যেন ভালো কাজ করতে পারি, যা তুমি পছন্দ করো। আর আমার জন্য তুমি আমার বংশধরদের মধ্যে সংশোধন করে দাও। নিশ্চয় আমি তোমার কাছে তাওবা করলাম এবং নিশ্চয় আমি মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত’’। (সুরা আহকাফ : ১৫)। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘’মা-বাবাই হলো তোমার জান্নাত এবং জাহান্নাম’’- (ইবনে মাজাহ-মিশকাত, পৃ. ৪২১)।
অন্য হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, যখন কোনো অনুগত সন্তান নিজের মা-বাবার দিকে অনুগ্রহের নজরে দেখে, আল্লাহ তায়া’লা তার প্রতিটি দৃষ্টির বিনিময়ে একটি করে কবৌল হজ্বের সাওয়াব দান করেন। (বায়হাকি-মিশকাত, পৃ. ৪২১)।
ইসলাম মাতা-পিতাকে সর্বোচ্চ অধিকার ও সম্মান দিয়েছে। ইসলামের বিধানমতে, আল্লাহ তাআ’লার পরেই মাতা-পিতার স্থান। এ প্রসঙ্গে মহাগ্রন্থ আল কোরআনে বলা হয়েছে, ‘’তোমার প্রতিপালক আদেশ দিয়েছেন, তিনি ব্যতীত অন্য কারও ইবাদত না করতে এবং মাতা-পিতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করতে। তাঁদের একজন অথবা উভয়ে তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হলে তাঁদের উফ্ (বিরক্তি ও অবজ্ঞামূলক কথা) বলবে না এবং তাঁদের ধমক দেবে না; তাঁদের সঙ্গে সম্মানসূচক কথা বলবে। মমতাবশে তাঁদের প্রতি নম্রতার ডানা প্রসারিত করো এবং বলো, “হে আমার প্রতিপালক! তাঁদের প্রতি দয়া করো, যেভাবে শৈশবে তাঁরা আমাকে প্রতিপালন করেছেন।’’ (সুরা-১৭ ইসরা-বনি ইসরাইল, আয়াত:২৩-২৪)।
আল্লাহ তাআ’লা পবিত্র কোরআনের অন্যত্র ঘোষণা করেন, ‘‘আমি তো মানুষকে তার পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছি। জননী সন্তানকে কষ্টের পর কষ্ট করে গর্ভে ধারণ করেন এবং তার দুধ ছাড়ানো হয় দুই বছরে; সুতরাং আমার (আল্লাহর) প্রতি এবং তোমার পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও। প্রত্যাবর্তন তো আমারই কাছে।’’ (সুরা-৩১ লুকমান, আয়াত:১৪)। ‘’আর আমি (আল্লাহ) মানবজাতিকে নির্দেশ দিয়েছি তারা যেন তাদের পিতা-মাতার সঙ্গে সুন্দর আচরণ করে; তার মা তাকে অতিকষ্টে গর্ভে ধারণ করেছেন ও অতিকষ্টে প্রসব করেছেন এবং লালন-পালন করেছেন।’’ (সুরা-৪৬ আহকাফ, আয়াত: ১৫)।
এক হাদীসে আছে, একদিন মুয়াবিয়া ইবনে জাহিমা আসসালামী (রা.) রাসুল (সা.)-এর খেদমতে হাজির হয়ে বললেন, ‘ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমি জিহাদ করতে ইচ্ছুক। এ ব্যাপারে আপনার পরামর্শ কী?’ জবাবে রাসুল (সা.) বললেন, ‘’তোমার মা আছেন?’ তিনি বললেন, ‘’আছেন।’’ রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘’মায়ের সেবায় নিয়োজিত থাকো, কেননা তাঁর পায়ের নিচেই জান্নাত।’’
ইসলাম মায়ের মর্যাদাকে মহিমান্বিত করেছেন। একবার এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এসে জিজ্ঞাসা করল, ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমার কাছে কে উত্তম ব্যবহার পাওয়ার বেশি হকদার? তিনি বললেন, মা। লোকটি বলল, তারপর কে? তিনি বললেন, তোমার মা। সে বলল, তারপর কে? তিনি বললেন, তোমার মা। সে বলল, তারপর কে? তিনি বললেন, তোমার বাবা-(বুখারি-মুসলিম)।
মাতা-পিতার খেদমত না করার কারণে যারা জান্নাত থেকে বঞ্চিত হলো, রাসুল (সা.) তাদের অভিসম্পাত দিয়েছেন। হাদিস শরিফে এসেছে—একদা জুমার দিনে রাসুল (সা.) মিম্বারের প্রথম ধাপে পা রাখলেন এবং বললেন, আমিন! অতঃপর দ্বিতীয় ধাপে পা রাখলেন এবং বললেন, আমিন! তারপর তৃতীয় ধাপে পা রাখলেন এবং বললেন, আমিন! এরপর খুতবাহ দিলেন ও সালাত আদায় করলেন। এরপর সাহাবায়ে কেরাম প্রশ্ন করলেন, “ইয়া রাসূলুল্লাহ (সা.), আজ যা দেখলাম তা এর আগে দেখিনি (আপনি একেক ধাপে পা রেখে আমিন! আমিন!! আমিন!! বললেন)? এটা কি কোনো নতুন নিয়ম নাকি?”
নবী করিম (সা.) বললেন: না, এটা নতুন কোনো বিধান নয়, বরং আমি মিম্বারে উঠার সময় জিবরাইল (আ.) এলেন, আমি যখন মিম্বারের প্রথম ধাপে পা রাখি, তখন জিবরাইল (আ.) বললেন, “আল্লাহ তাআলা বলেছেন, যারা পিতা-মাতা উভয়কে বা একজনকে বার্ধক্য অবস্থায় পেয়েও তাঁদের খেদমতের মাধ্যমে জান্নাত অর্জন করতে পারল না, তারা ধ্বংস হোক।’ তখন আমি-রাসুল (সা.) সম্মতি জানিয়ে বললাম, আমিন! (তা-ই হোক)। আমি যখন মিম্বারের দ্বিতীয় ধাপে পা রাখি, তখন তিনি বললেন, ‘আল্লাহ তাআলা বলেছেন, যারা রমজান পেল কিন্তু ইবাদতের মাধ্যমে তাদের গুনাহ মাফ করাতে পারল না, তারা ধ্বংস হোক”। তখন আমি সম্মতি জানিয়ে বললাম, আমিন! আমি যখন মিম্বারের তৃতীয় ধাপে পা রাখি, তখন তিনি বললেন, ‘আল্লাহ তাআলা বলেছেন, যারা আপনার পবিত্র নাম ‘মুহাম্মদ’ শুনলো কিন্তু ‘সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম’ দরুদ শরিফ পাঠ করল না, তারা ধ্বংস হোক।’ তখন আমি সম্মতি জানিয়ে বললাম, আমিন!
নবজাতক হজরত ঈসা (আ.)-এর মুখে রাব্বুল আলামিন ভাষা দিয়েছিলেন, হজরত ঈসা (আ.) বলেন, “আর আমাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, আমি যেন আমার মায়ের প্রতি সদ্ব্যবহার করি (অনুগত ও বাধ্য থাকি); আমাকে করা হয়নি উদ্ধত অবাধ্য ও দুর্ভাগা হতভাগ্য।” (সূরা-১৯ মারিয়াম, আয়াত:৩০-৩২)।
বনি ইসরাইলের নবী হজরত মুসা (আ.)-এর প্রতিও এ বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। আল্লাহ বলেন: ‘আর আমি বনি ইসরাইল থেকে এই অঙ্গীকার নিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহ ছাড়া কারও ইবাদত করবে না, পিতা-মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করবে।’ (সুরা-২ বাকারা, আয়াত: ৮৩)।
হে আল্লাহ! দুনিয়ার সকল মাকে তুমি সুস্থ রেখ, সুখে রেখ, যাঁরা নেই তাঁদের স্বর্গে রেখ।