হাসিনা আক্তার, লন্ডন, যুক্তরাজ্য
প্রতি বছরের ন্যায় এবারও লন্ডনে মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক সপ্তাহ পালন করা হয় ১৩ মে থেকে ১৯ মে পর্যন্ত। মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক সমস্যা এবং সমাধানের বিষয়কে সামনে রেখে এই সপ্তাহে বিভিন্ন কোম্পানী, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন সংগঠন বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়ে থাকে। বিভিন্ন সেমিনারের মাধ্যমে গণসচেতনতা বাড়ানোসহ এই রোগের হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করার জন্য বিভিন্ন পন্থা নিয়ে আলোচনা করা হয়। তাছাড়া সপ্তাহ জুড়ে সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে বিভিন্ন তথ্যের আদান প্রদান এবং নিজেদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা আলোচনা করা হয়ে থাকে। এ বছরই মানসিক স্বাস্থ্য সপ্তাহে টেলিগ্রাফের কলাম লেখক ব্রোনি গর্ডনের একটি সাক্ষাতকারে প্রিন্স উইলিয়াম এবং প্রিন্স হ্যারি বর্ণনা করেছেন যে, তাদের মায়ের অস্বাভাবিক মৃত্যুর পর দীর্ঘ সময় তারা মানসিক যন্ত্রণায় ভুগেছিলেন।
শরীর এবং মন এই দুটো নিয়ে মানুষ। মানুষের শারীরিক অসুস্থতা যেমন সত্য মানসিক অসুস্থতা তেমনি সত্য। সামান্য অসুখ হলেও শারীরিক অসুস্থতাকে খুব প্রাধান্য দিলেও মানসিক অসুস্থতার কথা লুকিয়ে রাখতে সবাই অভ্যস্ত। একজন মানুষ মানসিকভাবে অসুস্থ জানলে আশেপাশের মানুষ নানা ধরনের বিরূপ ধারণা পোষণ করে বলে কঠিন মানসিক সমস্যায় ভুগলেও আত্মীয় স্বজন, বন্ধু বান্ধবের কাছে প্রকাশ করতে চায় না। মানসিক সমস্যা যেকোন সময় যে কোন পরিস্থিতিতে যে কারো হতে পারে। কিন্ত আমরা হয়তো অনেকে জানিনা বা জেনেও স্বীকার করি না যে, শারীরিক অনেক বড় বড় রোগের কারণ হচ্ছে দীর্ঘদিন থেকে নিজের মধ্যে বেড়ে উঠা মানসিক রোগ। বাহিরের দেশে যারা বসবাস করেন তাদেরকে ভীষণ হিমসিম খেতে হয় নিজের অফিসের কাজ, বাসার কাজ, বাচ্চার দেখাশুনা সবকিছুর সাথে তাল মিলিয়ে চলতে। বিশেষ করে একজনই যখন বাবা মা উভয়ের ভূমিকা পালন করেন। এই সব পরিস্থিতি থেকে জন্ম নেয় উদ্বেগ এবং বিষণ্নতা। স্বামী স্ত্রী এবং পার্টনারের মধ্যে অহেতুক সন্দেহের কারণে যে সম্পর্কেও টানাপোড়ন শুরু হয় তার থেকে রেহাই পায় না কেউই, বিষণতায় ভুগতে থাকে উভয়ই, এই পরিস্থিতি দীর্ঘদিন চলতে থাকলে সে ক্ষেত্রে হতে পারে বিবাহ বিচ্ছেদ অথবা আত্মহত্যার মতো ঘটনা। আবার অনেক সময় দেখা যায়, মা বাবার সম্পর্কের টানাপোড়ন অথবা মা বাবার উদাসীনতা ছেলেমেয়েদের মধ্যে বিষণ্নতার জন্ম দেয় যার ফলে তাদের মধ্যে জন্ম নেয় মাদকাসক্তি। সমাজের একটি বিশাল অংশ অন্যের সমালোচনায় নিজেকে নিয়োজিত রাখতে বেশী পছন্দ করেন। যারা এটিকে নেশায় পরিণত করেছেন তারা এক ধরনের মানসিক রোগে আক্রান্ত। বানিয়ে বানিয়ে অন্যের সম্পর্কে গল্প বানিয়ে সমাজে কাউকে ছোট করাই যেন তার মূল কাজ। এখনকার সময় একটা ব্যাপার সবার কাছে লক্ষ্যণীয় যে, অনেককেই ফেইসবুকে উল্টাপাল্টা মন্তব্য করতে দেখি যাতে করে খুব সহজে অন্যের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে, এ ক্ষেত্রে বেশীরভাগ মন্তব্যই হয়ে থাকে অন্যকে অসম্মান এবং অপমান করা। তবে এসবের মূল কারণ হিসেবে আমার মনে হয় পারিবারিকভাবে কোন ঘাটতি থাকার কারণে মানুষের মধ্যে এই ধরনের প্রবণতা জন্ম দিয়ে থাকে। আলস্যভাবে সময় না কাটিয়ে মানুষ নিজেকে যদি বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং সৃষ্টিশীল কাজে নিয়োজিত রাখে তবে সেইসব ব্যক্তির মধ্যে এই ধরনের বাজে চর্চা গড়ে উঠার সুযোগ কম থাকে।
এম কিউ (ট্রান্সফরমিং মেন্টাল হেলথ থট) এর এ্যাম্বাসেডর সামারা তার উদ্বেগ ও বিষন্নতার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন ব্লগে, কিভাবে এই উদ্যোগ ও বিষণ্ণতা থেকে নিজেকে বের করে এনেছেন এবং বর্তমানে তিনি মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কিত বিষয়ে পরামর্শ দিচ্ছেন। দীর্ঘ সম্পর্ক ভেঙ্গে যাওয়ার পর মানসিকভাবে কতটা তিনি ভেঙ্গে পড়েছিলেন তার বর্ণনায় তিনি বলেছেন, তিনি খেতে পারতেন না, ঘুমাতে পারতেন না, হাঁটার মত শক্তি তিনি পেতেন না, ব্যাংকের পিন নাম্বার থেকে শুরু করে প্রাত্যহিক জীবনের প্রয়োজনীয় কোন কিছুই তিনি মনে রাখতে পারতেন না। এই কঠিন সমস্যা থেকে নিজেকে বের করে আনার জন্য তিনি ডাক্তারী পরামর্শের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের ব্যায়ামের আশ্রয় নিয়েছিলেন এবং অসংখ্য পুষ্টিকর পরিকল্পনা, ধ্যান, মনোজ্ঞতা কৌশলসহ খাবারেও আনেন অনেক পরিবর্তন। সামারার মতে, উদ্বেগ ও বিষণ্নতা থেকে রক্ষা পেতে সব চেয়ে বেশী কাজ করেছে কলা এবং যোগ ব্যায়াম। তার এই সব অনুশীলনের মাধ্যমে ৬ মাসের মধ্যে তিনি সুস্থ জীবনে ফেরত আসতে সক্ষম হয়েছিলেন পাশাপাশি তিনি মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করার যোগ্যতা অর্জন করেছেন। ফটোগ্রাফির পাশাপাশি এম কিউ (ট্রান্সফরমিং মেন্টাল হেলথ থট) এর এ্যাম্বাসেডর তার আরেকটি পেশা।
মানসিক অবস্থা বর্ণনা করে মানসিক সুস্থতাকে, দৈনন্দিন জীবনে সমস্যাগুলোর সাথে মোকাবেলা করতে আমরা কতটুকু সম্ভব, নিজের প্রতি কতটুকু আত্মবিশ্বাসী, নিজের সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা, সবধরনের মানুষের সাথে আপনি কিভাবে তাল মিলিয়ে চলতে পারছেন এবং আপনার জ্ঞানের পরিধি কতটুকু তার উপর নির্ভর করে একজন মানুষের মানসিক সুস্থতা।