রিমন ইসলাম, নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র থেকে: আর মাত্র কয়েকদিন পরই যুক্তরাষ্ট্র তথা পৃথিবী পাবে একজন রাষ্ট্রপতি, যিনি শুধুমাত্র আমেরিকার নেতা নন সমগ্র দুনিয়া তার দিকে অধীর আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে থাকবে। এবার আসা যাক মূল আলোচনায়। মার্কিন নির্বাচনে ব্যালট পেপারের গুরুত্ব অপরিসীম। ৫০টি রাজ্যে এই ব্যালট পেপার ভোট প্রদান করেন ভোটাররা তাদের পছন্দের প্রার্থীকে। বাইডেন হ্যারিছ বা ট্রাম্প পেন্সকে অর্থাৎ ডেমোক্রেট বা রিপাবলিকান পার্টিকে। যে রাজ্যে ডেমোক্রেটিক দল ভোট বেশি পাবে সে রাজ্যের সবক’টি ইলেক্টোরাল ভোট পাবে বাইডেন হ্যারিছ। যেমন ধরুন নিউইয়র্ক রাজ্যে জিতে ২৯টি ইলেক্টোরাল ভোট পাবে বাইডেন হ্যারিছ।
এভাবে ক্যালিফোর্নিয়া রাজ্যে জয়ী হলে সেখানকার ৫৬টি ইলেক্টোরাল ভোট পাবে বাইডেন হ্যারিছ, এভাবে ২৭০টি বা বেশি ভোট যে দল বা প্রার্থী পাবেন তিনিই মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হবেন। একইভাবে ট্রাম্প পেন্স বিভিন্ন রাজ্যে পপুলার ভোট বেশি পেয়ে জয়ী হলে এবং ২৭০টি বা বেশি ইলেক্টোরাল ভোট পেলে ট্রাম্প আবারো প্রেসিডেন্ট হবেন। রিয়েলিটি শো ‘দি এপ্রেনটিস’
বা ‘World Beauty Peagant’ এর আয়োজক হয়ে একসময় আলোচিত ও নারী কেলেংকারির জন্য সমালোচিত ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন ইতিহাসে একেবারে রাজনৈতিক অনভিজ্ঞ প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন ২০১৬ সালে, আমেরিকার সিস্টেম আর পকেটের টাকায় সেবার উতরে গিয়েছিলেন। এবারো একইভাবে জো বাইডেনকে ব্যক্তিগত আক্রমণ করে আর জনগণকে মিথ্যা ভাষণে বিভ্রান্ত করে ক্ষমতায় আসতে চাচ্ছেন!
রাশিয়ান মেডলিং তো ছিলই White Supremacy গ্রুপ এর সমর্থন। ইলেক্টোরাল ভোট বিভিন্ন রাজ্যে কম বেশি হয় জনসংখ্যা অনুযায়ী। প্রতিটি রাজ্যে ২ জন করে সিনেটর আছেন ফলে ৫০টি রাজ্যে ১০০জন সিনেটর। জনসংখ্যা অনুযায়ী কংগ্রেসম্যান নির্ধারণ করা হয়। নিউইয়র্ক এ ২৭ জন কংগ্রেসম্যান আছে, সে হিসাবে ২৯টি ইলেক্টোরাল ভোট সেখানে। একইভাবে টেক্সাস রাজ্যে ৩৮টি ভোট, ফ্লোরিডা রাজ্যে ২৯টি ভোট বা পেনসিলভানিয়া রাজ্যে ২০টি ভোট। অন্যান্য রাজ্যে কম বা বেশি ভোট থাকায় মোট ৫৩৮টি ইলেক্টোরাল ভোটে নির্বাচিত হন প্রেসিডেন্ট। ৩টি ভোট আছে ওয়াশিংটনডিসিতে, যেটি আমেরিকার রাজধানী। ৪৩৮টি হলো কংগ্রেসম্যান এবং ১০০টি সিনেটর, এভাবে মোট ইলেক্টোরাল ভোট ৫৩৮টি। আর এখানেই হারা-জেতার খেলা।
গত নির্বাচনে ট্রাম্প ৩০৬টি ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছিলেন। হিলারী ক্লিনটন পেয়েছিলেন ২৩২টি ভোট। এই ইলেক্টোরাল ভোট মার্কিন নির্বাচনে একটি ভারসাম্য রক্ষা করে। যেটি মার্কিন সংবিধান দ্বারা রচিত। কিন্তু ব্যালট পেপার ভোট বা পপুলার ভোট অত্যন্ত গুরুত্ব বহন করে নির্বাচনে। বিভিন্ন রাজ্যে আগাম ভোট দেয়ার রীতি থাকায় এই লেখা পর্যন্ত প্রায় ৯ কোটি ভোট দিয়েছেন ভোটাররা। এদেশে নাগরিক মানেই ভোটার নয় ভোটার হিসাবে রেজিস্ট্রি করে রেজিস্টার্ড ভোটার হয়ে ভোট দিতে হয়। মেইলিং ভোট দেয়ার ব্যবস্থা থাকায় ইতিমধ্যে কয়েক কোটি ভোট দেয়া হয়েছে মেইল করে পোষ্ট অফিসের মাধ্যমে, এসব ভোট গুণতে কয়েক দিন সময় লাগবে। নভেম্বর ৩ তারিখ ভোটের দিন। এদিন মূলত সব ভোট গ্রহণ করে ফলাফল প্রকাশ করা হবে। আশা করা হচ্ছে ৩ তারিখ মঙ্গলবার রাত ১টা বা ২টার মধ্যে সম্ভাব্য (প্রজেক্টেড) জয়ী
পাওয়া যাবে। মূলত টেলিভিশন চ্যানেলগুলো প্রজেক্টেড (সম্ভাব্য) জয়ীর নাম ঘোষণা করে থাকে। এভাবে বিজয়ী আমরা পেয়ে যাবো।
এখন নির্বাচনী মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন দুই প্রার্থী। বিশেষকরে ব্যাটেল গ্রাউন্ডগুলোর দিকে তাদের নজর বেশি পড়ছে। জো বাইডেন মার্কিন ইসু নিয়ে কথা বলছেন, ব্যক্তিগত আক্রমণ তেমন করছেন না। ৫০টি রাজ্যের মধ্যে কিছু রাজ্য ছাড়া বাকি রাজ্যগুলো ঠিক হয়ে আছে, কোন রাজ্য নীল অর্থাৎ ডেমোক্রেটরা পাবে আর কোন রাজ্য লাল বা রিপাবলিকানরা পাবে। মাত্র ৮/৯ টি রাজ্যে ট্রাম্প বা বাইডেনের ভাগ্য ঝুলছে।
এসব রাজ্যের মধ্যে বাইডেন ইতিমধ্যে জরিপে এগিয়ে আছেন পেনসিলভানিয়া, মিশিগান, ওহাইও, ওইসকনসিন ও জর্জিয়ায় তবে সবশেষ জরিপে ৪ পয়েন্টে এগিয়ে আছেন গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য ফ্লোরিডায়। এরিজোনায় এগিয়ে থাকার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। সেখানে রিপাবলিকান সিনেটর প্রয়াত জন ম্যাককেইন এর স্ত্রী সিন্ডি ম্যাককেইন বাইডেনকে সমর্থন করায় এই অবস্থা তৈরী হয়েছে। টেক্সাস এর প্রভাবশালী রিপাবলিকান বুশ ফ্যামিলি সমর্থন করছেন বাইডেনকে। একইভাবে সাবেক রিপাবলিকান পররাষ্ট্রমন্ত্রী জেনারেল কলিন পাওয়েল সহ বহু রিপাবলিকান উচ্চপদস্থ আর্মি অফিসার বাইডেনকে সমর্থন করছেন। বহু রিপাবলিকান ভোটার এবার পার্টিলাইন চেঞ্জ করে বাইডেনকে ভোট দেবেন। যেটি মার্কিন গণতন্ত্রের একটি চমৎকার বৈশিষ্ট। ব্যক্তির পছন্দকে খুব গুরুত্ব দেয়া হয়ে থাকে। দুই দলের প্রতীক যা কিনা মার্কিনমুলুকের নয়। গাধা হলো ডেমোক্রেটিক দলের প্রতীক আর হাতি হচ্ছে রিপাবলিকান প্রতীক। গাধা বা হাতি কোনটি আমেরিকার প্রাণী নয়।
সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বাইডেনের পক্ষে বিরামহীন প্রচার চালাচ্ছেন। আজ থেকে দুজন একসাথে কয়েকটি ব্যাটেল গ্রাউন্ড রাজ্যে প্রচারণা চালাবেন।ওদিকে কমলা হ্যারিছও প্রচারণায় পিছিয়ে নেই। ট্রাম্প কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত হয়ে দশদিন বিরতি দিয়ে এখন রাতদিন প্রচার চালাচ্ছেন। তবে গত চার বছরের খারাপ রাষ্ট্র পরিচালনা (বেড পারফর্মেন্স) এবং কোভিড -১৯ এর মোকাবেলায় চরম ব্যর্থতা তাকে বিপদে ফেলে দিয়েছে। এ পর্যন্ত ২ লক্ষ ৩০ হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছে এবং প্রতিদিন ১ হাজারের বেশি মানুষ মারা যাচ্ছে। যা কিনা ট্রাম্পের ক্ষমাহীন ব্যর্থতা হিসাবেই দেখছে সবাই। তারপরও সাদারা প্রায় একজোট ট্রাম্পকে জেতানোর জন্য। কাল ও হিস্পানিক ভোটারদের বড় অংশ প্রায় ৮০ ভাগ ভোট ট্রাম্প পাবে না বলেই জরিপ বলছে, এসব ভোট বাইডেন পাবার কথা, সাদা ভোটতো আছেই।
এশিয়ান ভোটের প্রায় ৭০ ভাগ বাইডেন পাবেন। ইহুদী ভোটের ৮০ ভাগ ভোট বাইডেনের পক্ষে যাবে বলে মনে করা হচ্ছে। বাংলাদেশি ভোটাররা মূলত বাইডেনকে ভোট দেবেন। ভারতীয় ও পাকিস্তানি ভোটাররাও বেশি সংখ্যায় বাইডেন হ্যারিছকে ভোট দিচ্ছেন। ভাইস প্রেসিডেন্ট পেন্স নির্বাচনি প্রচারে কোন বিরতি দিচ্ছেন না। যদিও ট্রাম্প ইজরায়েল এর পক্ষে অনেক কাজ করেছেন এবং ট্রাম্প জামাতা জেরেড কুশনার একজন ইহুদী। তিনি ক্লান্তিহীনভাবে ট্রাম্পের পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছেন। ছেলে এরিক ট্রাম্প সহ ট্রাম্প প্রশাসনের সবাই কোমর বেধে নেমেছেন ট্রাম্পকে জয়ী করতে। ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট থাকায় অনেক বেশি রাষ্ট্রীয় সুবিধা পাচ্ছেন, যেমন প্রাইভেট জেট এয়ার ফোরস ওয়ান ( Air Force One) প্লেইন সহ সরকারি প্রটোকল, নিরাপত্তা এবং আরো অনেক সুবিধাদি, নিরাপত্তা ছাড়া অন্য সুবিধাদি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বাইডেন।
এবারের দুটি টেলিভিশন বিতর্ক ছিল বাইডেনের একক বিজয়, ট্রাম্প প্রথম বিতর্কটি একতরফা আক্রমণ করে নিজের বিপদ নিজেই ডেকে এনেছিলেন। চুড়ান্ত বিতর্কটি ছিল একপেশে, ট্রাম্প চরিত্রগতভাবে মিথ্যা কথা ও অপ্রয়োজনীয় কথা বলে বিতর্কে পিছিয়ে পরেছেন। দুটি বিতর্কর চুলচেরা বিশ্লেষণ করে মার্কিন রাজনৈতিক বোদ্ধারা এ রায় দিয়েছেন। এবারের নির্বাচন হবে মার্কিন ইতিহাসে সবচেয়ে ব্যয়বহুল। বাংলাদেশি টাকায় যা কিনা ১ লক্ষ ৩০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলার। নির্বাচনের অর্থ আসে মূলত পাব্লিক ডোনেশন থেকে। ট্রাম্প পাব্লিক ডোনেশন এবং নিজের অর্থ থেকে ব্যয় মিটাচ্ছেন। বাইডেন পুরো খরচ যোগাচ্ছেন ডোনেশন ও পার্টির ফান্ড থেকে। এই হলো মার্কিন নির্বাচন খরচা। চার বছর পর এই নির্বাচনে ৪৩৮ জন কংগ্রেসম্যান, দুই তৃতীয়াংশ সিনেটর, মেয়র, গভর্নর সহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হয়ে থাকেন। সব দিক থেকে এবারের নির্বাচন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যদিও চায়না বা রাশিয়ার জড়িত থাকার কোন প্রমাণ এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি তবুও কিছুই উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না। বাইডেন জয়ী হলে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির ব্যাপক পরিবর্তন হবে।
ডোমেস্টিক পলিসিতেও (অভ্যন্তরীণ) অনেক পরিবর্তন আসবে নিশ্চিত বলা যায়। ইমিগ্রেশনেও বড় রকম ছাড় দেবেন বাইডেন। এখন পর্যন্ত জাতীয় পোল বা জরিপে বাইডেন ৮/৯ পয়েন্টে এগিয়ে আছেন। এদিকে টেলিভিশন এর স্ক্রিন জুড়ে শুধু নির্বাচনি বিজ্ঞাপন, রেডিও, পত্রিকায় একই অবস্থা। এবার সোশাল মিডিয়ায় ব্যাপক প্রচার চলছে জোরেশোরে।
শেষ মুহুর্তে দৈব ঘটনা না ঘটলে বাইডেনের বিজয় প্রায় নিশ্চিত। এবার সম্ভবত ডেমোক্রেটরা কংগ্রেস, সিনেট ও হোয়াইট হাউজ তিনটা গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করতে যাচ্ছে। এমন আভাস দিচ্ছেন রাজনৈতিক পণ্ডিতরা।
দেখা যাক শেষ হাসি কে হাসে নিউইয়র্ক নেটিভ বিলিয়নিয়ার ৭৪ বছর বয়সী ট্রাম্প নাকি ডেলাওয়ার নেটিভ সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট ৭৭ বছর বয়সী বাইডেন? যেই প্রেসিডেন্ট হবেন তিনি হবেন আমেরিকার সবচেয়ে
বয়স্ক প্রেসিডেন্ট।