মো: বাছের আলী
শ্রীলঙ্কা দক্ষিণ এশিয়ার একটি দ্বীপ রাষ্ট্র। দুই কোটি জনসংখ্যার এই দেশটি প্রাচীনকাল থেকেই বৌদ্ধ ধর্মালম্বীদের তীর্থস্থান হিসেবে পরিচিত। ভারত মহাসাগরের দক্ষিণ উপকূলে অবস্থিত দেশটির রাজধানী কলম্বো। দেশটিতে বৌদ্ধ ৬৯.১ শতাংশ, মুসলিম ৭.৬ শতাংশ, হিন্দু ৭.১ শতাংশ, খ্রিষ্টান ৬.২ শতাংশ এবং অন্যান্য ১০ শতাংশ। নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সমুদ্রসৈকত, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ দেশটি পৃথিবীর ভ্রমুপিপাসুদের জন্য অত্যন্ত আকর্ষণীয়। সময় করে আপনিও একবার দেশটিতে ঘুরে আসতে পারেন। তবে যাওয়ার আগে সেদেশের করণীয় ও বর্জনীয় বিষয়গুলো জেনে নেওয়া উচিত।
শ্রীলঙ্কার ভাষা: সিংহলি হল শ্রীলঙ্কার রাষ্ট্রীয় ভাষা। এছাড়া তামিল ভাষাও দেশটিতে বেশ প্রচলিত রয়েছে। তবে সরকারি স্বীকৃত ভাষা হিসেবে ইংরেজীও ব্যাপক প্রচলিত। দেশটির প্রায় ১৬ মিলিয়ন লোক সিংহলি ভাষায় কথা বলেন।
অভ্যর্থনা: সাধারণত শ্রীলঙ্কায় তাদের নিজেদের মধ্যে অভ্যর্থনার রীতি রয়েছে। তাই একজন বিদেশি হিসেবে সেখানে আপনি অভ্যর্থনা না-ও পেতে পারেন। এটা আশা করাও আপনার ঠিক হবেনা। যদিও অধিকাংশ শ্রীলঙ্কানই বিদেশিদের অভ্যর্থনা জানিয়ে থাকেন।

শ্রীলঙ্কার বয়স্করা নমস্তে (namaste) বলে অভিবাদন জানিয়ে থাকে। এছাড়া সিংহলীজরা আপনাকে আয়ুব্বান (ayubowan) অর্থাৎ আপনি দীর্ঘজীবী ও সুখী হোন, তামিলরা ভানাক্কাম (vanakkam) অর্থাৎ আপনি দীর্ঘজীবী ও সুখী হোন বলে আভিবাদন জানাবেন। যুবকরা সাধারণত বিদেশিদের সাথে হ্যান্ডশেক করে থাকে। অনেক শ্রীলঙ্কান মহিলারা তাদের পরিবারের বাইরের লোকদের সাথে হ্যান্ডশেক করা এড়িয়ে চলে, তাই সেখানকার মহিলারা অভ্যর্থনার সময় হাত বাড়ানো পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। কাউকে সম্বোধন করতে পুরো নাম যথাযথভাবে তুলে ধরতে হবে।
উপহার দেওয়া নেওয়া: শ্রীলঙ্কায় সাধারণত জন্মদিন এবং ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলোতে উপহার দেওয়া হয়। উপহার হল সেখানে একটা প্রতীকী বিষয় তাই দামি কিছু দেওয়ার প্রয়োজন নেই। দেশটিতে জাতিগত ও ধর্মীয় কিছু পার্থক্য থাকলেও উপহার দেওয়া সবার মধ্যেই প্রচলিত একটি শিষ্টাচার। উপহার হিসেবে ফুল এড়িয়ে চলুন। কারণ এটা সেখানে শোকের সময় অধিকহারে ব্যবহার করা হয়। হোস্ট অ্যালকোহল পান করে এটা নিশ্চিত হলে এজাতীয় উপহার দিতে পারেন। সাদা এবং কালো রং সেখানে শোক ও অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় ব্যবহার করা হয়। হোস্ট মুসলিম হলে অ্যালকোহল জাতীয় খাবার পরিত্যাগ করবে না। হিন্দু হলে চামড়ার তৈরি কিছু উপহার দেওয়া ঠিক হবে না। উপহার দেওয়া নেওয়ায় দু’হাতই ব্যবহার করুন। কোন কোন শ্রীলঙ্কান উপহার দেওয়ার সময় বাম হাত ডান হাতের সাথে স্পর্শ করেন। শ্রীলঙ্কায় সাধারণত উপহার নেওয়ার সময় খুলে দেখার রীতি নেই।
খাবারের নিয়মাবলী: শ্রীলঙ্কায় পরিবার অথবা বন্ধুদের সাথে খাওয়া বেশ উপভোগ করা হয়। আপনি যদি কোথাও সন্ধ্যা ৭ টার সময় খাবারের আমন্ত্রণ পেয়ে থাকেন তবে খাবারের পূর্বে আপনাকে কয়েকঘন্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে। সুতরাং খালি পেটে কোথাও না বের হওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ!

আপনার জন্য নির্দিষ্ট করা সিটেই বসুন। খাবারের আগে এবং পরে আপনার হাত ধুয়ে নিতে হবে। পরিস্থিতি অনুযায়ী আপনার প্লেটে খাবার সরবরাহ হতে পারে এবং আপনি খাবার শুরু করতে পারেন। খাবারের সময় আপনার কনুই টেবিলের উপর রাখতে পারেন। ডান হাতে খাবার খাওয়া শুরু করতে হবে। প্লেট থেকে খাবার খেতে ছুরি ব্যবহার করতে পারেন। আপনাকে যদি দ্বিতীয়বার খাবার দেওয়া হয় কিন্তু আপনি আর খেতে চাচ্ছেন না তবে এগুলো না খেয়েও উঠে যেতে পারেন। প্লেটে কিছু খাবার রেখে দিতে পারেন, যাতে হোস্টরা বুঝতে পারেন আপনি তৃপ্তি সহকারে খেয়েছেন। খাবার শেষ করার আধা ঘন্টার মধ্যে সেখান থেকে উঠে যাওয়ার রীতি রয়েছে।
ব্যবসায়িক আলোচনা: শ্রীলঙ্কায় ব্যবসায়িক আলোচনায় ফরমাল নিয়ম অনুসরণ করা হয়। একজন বিদেশি হিসেবে সেদেশের সংস্কৃতি মানার শর্তে কিছুটা অবকাশ দেওয়া হতে পারে।
মিটিংয়ের শুরুতে সেখানে হ্যান্ডশ্যাক করা সাধারণ রীতি, মিটিংয়ের শুরুতে এবং শেষ হওয়ার পর অর্ভ্যথনা জানানো হয়। পুরুষ পুরুষের সাথে, মহিলারা মহিলাদের সাথে হ্যান্ডশ্যাক করবে। শ্রীলঙ্কানরা অধিকাংশ টাইটেলে তাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ব্যবহার করেন। যদি কেউ প্রফেশনালি টাইটেল ব্যবহার না করেন তাহলে স্যার অথবা ম্যাডাম ব্যবহার করতে হবে। নামের যথাযথ উচ্চারণ করতে হবে।
ব্যবসায়িক কার্ড হ্যান্ডশেকের পর বিনিময় করা হয়। কার্ডে টাইটেল এবং যোগ্যতা যোগ করতে ভুলবেন না। কার্ডের একপাশে সিংহলি বা তামিল ভাষা ব্যবহার করতে পারেন, তবে তা গুরুত্বপূর্ণ নয়। ব্যবসায়িক কার্ড সবসময় দু’হাতে বিনিময় করুন। আলোচনার সময় মুখ সামনের দিকে রাখুন। খোলাখুলিভাবে কারো সমালোচনা করা ঠিক হবে না। যোগাযোগের ক্ষেত্রে শ্রীলঙ্কানরা সচেতন নন, তারা মুখে একটা বলে কিন্তু কাজের ক্ষেত্রে অনেক সময় অন্যটা করে। তাই আপনাকে এ বিষয়ে সচেতন হতে হবে।
দীর্ঘ যোগাযোগ, চোখের যোগাযোগ অথবা প্রতারণার কৌশলগুলো পরিহার করুন। ব্যবসায়িক আলোচনায় সম্পর্ক খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শ্রীলঙ্কানরা ব্যবসায়িক আলোচনার পূর্বে আপনার ব্যাকগ্রাউন্ড সম্পর্কে জানতে চাইবে, পাশাপাশি আপনার কোম্পানির কিছু তথ্যও তাদেরকে সরবরাহ করতে হতে পারে। আলোচনার এ্যাজেন্ডা আগেই ঠিক করা উচিত। প্রথম আলোচনায় সর্ম্পক উন্নয়নের চেষ্টা করাই ভালো। এতে করে পরবর্তী আলোচনা ফলপ্রসু করার সম্ভবনা থাকে। আলোচনায় অন্য ব্যবসার কথাও উঠতে পারে তবে হতাশ হওয়া ঠিক হবেনা। প্রথম দিকের মিটিংগুলোতে মধ্যম পর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকেন এবং তারা বিভিন্ন তথ্য পলিসিমেকারদের কাছে জানান। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তগুলো উচ্চপদস্থ কর্মকতারাই নিয়ে থাকেন।

বৌদ্ধ সংস্কৃতি: বৌদ্ধই শ্রীলঙ্কায় প্রধান ধর্ম। যা দেশের ৭০ শতাংশের মত। এছাড়া অন্যরা ইসলাম, হিন্দু ও খ্রিষ্টান ধর্মের অনুসারী। বৌদ্ধ মন্দিরগুলোতে হাত অথবা মাথা দিয়ে স্পর্শ করা যাবে না। শিশুদেরকেও এটা মানতে হয়। বৌদ্ধ ধর্মীয় নেতাদের সম্মান প্রদর্শন করতে হবে। বৌদ্ধ নেতা বা অন্য দেবতারা যে সকল পোশাক পরিধান করেন সেগুলো পড়া যাবে না। এটা সেখানে তাদের অসম্মান বা অসংবেদনশীল মনে করা হতে পারে, এমনকি এ কারণে আপনি গ্রেপ্তারও হতে পারেন। বৌদ্ধ ভিক্ষুকদের সবসময় সম্মান করুন। মন্দিরে প্রবেশ করলে কাঁধ এবং পা ঢেকে রাখুন।
ছবি তোলা: শ্রীলঙ্কায় ভ্রমণকারীদের ছবি তুলার ক্ষেত্রে কিছু নিয়ম মানতে হয়। চাইলেই যে কোন জায়গায় আপনি ছবি তুলতে পারবেন না। শপিং মল, চা বাগান ছাড়াও কলম্বো সী বিচে আপনি যদি সেখানকার সেনারা দাঁড়িয়ে আছেন দেখেন তাহলে আপনার হাতের ক্যামেরা আড়ালে রাখাই ভালো। সামরিক ঘাঁটি এবং সরকারি ভবনগুলোর ছবি তোলাও শ্রীলঙ্কায় অপরাধের আওতায় পড়ে। তবে পার্ক সহ ফিল্ম ইন্ড্রাস্ট্রি এলাকায় সকাল ৬ টা থেকে ১০ টা পর্যন্ত ছবি তুলতে পারবেন।
শ্রীলঙ্কায় সামাজিক শিষ্টাচার: শ্রীলঙ্কায় জনসম্মুখে চুম্বন দেওয়া নিষেধ। তবে প্রাপ্তবয়স্কদের নাইটক্লাব, ক্যাসিনো, সমুদ্র সৈকতের মত জায়গাগুলোতে চুম্বন দিলে খুব একটা সমস্যা হবে না। তাছাড়া শ্রীলঙ্কায় গণ নগ্নতা বৈধ নয় তবে ব্যক্তিগত পর্যায়ে সমুদ্র সৈকতের মত জায়গাগুলোতে ছোট পোশাক পরতে কোন বাধা নেই। সব মিলিয়ে শ্রীলঙ্কায় স্থানীয়দের মত আচরণ করুন, সম্ভাব্য সকল সমস্যা এবং ভ্রমণ অধিক আড়ামদায়ক করতে তাদের কাছ থেকেই শেখার চেষ্টা করুন।