তানজিলা তাবাসসুম নকশী
বালি ইন্দোনেশিয়ার একটি দ্বীপ যা প্রশান্ত মহাসাগরের পশ্চিমে অবস্থিত। মূল ভূখন্ড থেকে দক্ষিণ পূর্বে এর অবস্থান। ৫৭৮০ বর্গকিলোমিটার এই দ্বীপটিকে ভূস্বর্গ বললে ভুল হবেনা মোটেই। ভ্রমণপিপাসুদের কাছে আরাধ্য এক সৌন্দর্য আছে এখানে। পরিপাটি ছিমছাম শহর আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য মিলে স্থানটিকে করে তুলেছে অতুলনীয়।
কিভাবে যাবেন
বালিতে ঘুরতে যাবার সবচেয়ে সুবিধাজনক দিক হল সেখানে যেতে কোনো ভিসা লাগবেনা আপনার। বিমানে ঢাকা থেকে বালি যেতে ট্রানজিটসহ সময় লাগবে ১১-১৪ ঘন্টা। কারণ ট্রানজিট সময় বিভিন্ন এয়ারলাইন্সে বিভিন্ন রকম হয়। বালির ডেনপেয্যর এয়ারপোর্টে নামার সাথে সাথেই আপনি পেয়ে যাবেন অন অ্যারাইভাল ভিসা। তবে অবশ্যই আপনাকে আগে থেকে হোটেল বুকিং করে যেতে হবে এবং এয়ারপোর্টে প্রয়োজনীয় বুকিং এর ডকুমেন্টস দেখাতে হবে। সেটা হতে পারে হার্ডকপি বা সফ্ট কপি। দেশে অসংখ্য ট্রাভেল এজেন্সি আছে এখন যাদের কাছ থেকে আপনি টিকিট, হোটেল এমনকি ভ্রমণ পরিকল্পনা সবই পেয়ে যাবেন। তবে চাইলে নিজেরাও নিজেদের মত করে হোটেল এবং দর্শনীয় জায়গা বেছে নিতে পারেন। তবে আগে থেকে টিকেট কেটে রাখাই উত্তম। কারণ বিমান ভাড়া সবসময় পরিবর্তনশীল। যত আগে কাটবেন তত সুবিধা। আমার মতো ব্যস্ততার চাপে দুদিনের নোটিশে টিকেট না নেওয়াই ভালো। হঠাৎ করে ঘুরতে যাবার সিদ্ধান্ত নিলে গুনতে হবে বেশ কিছু বাড়তি টাকা। সবার পক্ষে সেটা সম্ভব নাও হতে পারে। তাই হাতে সময় নিয়ে ঠান্ডা মাথায় পুরো কাজটা করতে হবে।

দর্শনীয় স্থান
পুরো বালির ম্যাপটি নখদর্পণে আনতে পারেন যদি খুব ভালো মতো ঘুরে দেখতে চান। মোট পাঁচ ভাগে ভাগ করে নেওয়া যেতে পারে একে। উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব, পশ্চিম ও মধ্য বালি। আসলে পুরো বালি ঘুরে দেখতে ১ মাসও যদি থাকেন তারপরও আপনার একঘেয়েমি আসবে না। কারণ জায়গাটি ঐতিহ্য আর প্রাকৃতিক প্রাচুর্যে ভীষণ বৈচিত্র্যময়। ইউরোপীয় পর্যটকরা হাতে অনেকটা সময় নিয়েই এখানে আসে। তবে আমাদের দেশ থেকে বিভিন্ন কাজ কর্ম সামলে এতোদিন থাকা সম্ভব নয়। তাই আপনার সময়ের উপর নির্ভর করে ভ্রমণ পরিকল্পনা গুছিয়ে নিতে হবে।
উল্লেখযোগ্য তালিকার মধ্যে উবুদ, কুটা, নুসা দুয়া, উলুয়াতু, সেমিনিয়াক, আগ্নেয়গিরি, ঐতিহ্যবাহী নাচ, সংস্কৃতি, অদ্ভুত সুন্দর সব মন্দির ও স্থাপনাশৈলী, ভিন্নমাত্রার সৈকত, কফিক্ষেত, ধানক্ষেত (আমাদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা), বিভিন্ন ইকোপার্ক থাকতে পারে। এছাড়া প্রতিটি সৈকতেই আছে বিভিন্ন বিনোদন মাধ্যম, সার্ফিং, প্যারাক্লাইম্বিং, স্নরেলিং। এছাড়াও আছে সাগরতলের রোমাঞ্চকর ভ্রমণ সেখানে লেখকের মতো স্টারফিশের দেখা পেলেও পেতে পারেন! আর হাতে সময় বেশি থাকলে ঘুরে আসতে পারেন নুসা পেনিদা, গিলি আর লম্বক থেকেও। কারণ কে জানে, হয়তো বারে বারে আর আসা হবে না।

আমার অভিজ্ঞতা
বালিতে গিয়ে ভাগ্য ভালো থাকলে অনেক চমকপ্রদ অভিজ্ঞতা জমতে পারে আপনার ঝুলিতেও। এমন অভূতপূর্ব একটি ঘটনার সাক্ষী আমি নিজেও। বীচে প্রচলিত ওয়াটার রাইডগুলোর মধ্যে স্কুবা ডাইভিং অত্যন্ত জনপ্রিয়। যারা ভ্রমণপিপাসু তাদের কাছে এর আবেদন বরাবরই অসামান্য। এই স্কুবা ডাইভিং এ নেমে সাগরতলে হাঁটতে গিয়েই চোখে পড়লো কমলা রং এর একটি রাজকীয় আকার ও আকৃতির স্টার ফিশ। সাহস করে কাছে গিয়ে হাতে নিলাম। পানির উপরেও উঠে আসলাম। কিন্তু স্টার ফিশের লোভ আর সামলাতে পারলাম না!
বীচ থেকে হোটেল এবং হোটেল থেকে এয়ারপোর্টে দিয়ে সোজা আমার বসবার ঘরে এখন তার অবস্থান। কিন্তু জীবিত প্রাণী বহনের কোন সুযোগ না থাকায় এয়ারপোর্ট অবধি লুকিয়ে ব্যাগে ভরে কিছু ভেজা কাপড় দিয়ে পেঁচিয়ে রেখেছিলাম। জ্যান্ত রাখার ব্যর্থ চেষ্টা এই আরকি!
মুদ্রা

বালির মুদ্রাকে স্থানীয়রা বলে রুপাইয়া। বাংলাদেশের টাকার চেয়ে এর মান কম। তবে দামের আধিক্যের কারণে খুব একটা তারতম্য হয় না।
ধর্ম
ইন্দোনেশিয়া মুসলিম প্রধান দেশ হলেও বালির অধিকাংশ অধিবাসীই হিন্দু ধর্মাবলম্বী। তবে মুসলিমও সংখ্যায় কম নয়। পথে ঘাটে সবখানেই পাবেন প্রচুর হালাল খাবারের দোকান। এছাড়া খ্রীস্টান ও অন্যান্য ধর্মাবলম্বী লোকেরাও সবাই মিলে সুখে সমৃদ্ধিতে একত্রে বাস করে সেখানে।
ভ্রমণের সেরা সময়
বালির আবহাওয়া সারা বছরই মনোরম থাকে। তবে এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর এই শুষ্ক মৌসুমে ভ্রমণ পিপাসুদের এই দ্বীপটিতে ভ্রমণের জন্য বেচে নেয়া উচিত।
কি করবেন-করবেন না

যেহেতু এটা অনেক শান্তিপ্রিয় একটি পর্যটন স্থান তাই আপনি কোন অপ্রীতিকর অভিজ্ঞতায় পরবেন না। সবাই নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত। তাই আপনিও অন্যের বিরক্তির কারণ না ঘটিয়ে সর্বোচ্চ আনন্দ করতে পারবেন এখানে। পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা ও নান্দনিকতা এ শহরের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বালি অসম্ভব প্রাণপ্রাচুর্যে ভরপুর একটি জায়গা। যার প্রত্যেকটি অধিবাসীই ভীষণ অতিথিপরায়ণ ও পর্যটকবান্ধব। তারা তাদের পর্যটনভিত্তিক অর্থনীতির বিষয়টা খুব ভালোভাবেই বুঝে নিয়েছে। সবার মুখেই হালকা হাসি সবসময়, শুধু পর্যটকদের জন্যে নয় নিজেদের মধ্যেও। বেশিরভাগ দোকানেই নারী কর্মী বা মালিক গভীর রাত পর্যন্ত নির্বিঘেœ কাজ করে যাচ্ছে। দিনে-রাতে সমান চঞ্চল এই বালি। রাত বেশি গভীর হলে মনে হয় শান্তির একটা ছোট্ট শহরে বুঝি পৌঁছে গেছি। আমাদের ব্যস্ত শহরে, ঠাস বুনোটের ভীড়ে একটু শান্তির নিঃশ্বাস ফেলতে ঘুরে আসাই যায় সৃষ্টিকর্তার এই অপার সৌন্দর্যের লীলাভূমি থেকে।