হাকিকুল ইসলাম খোকন, নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র প্রতিনিধি: বাংলাদেশের জনপ্রিয় শিল্পী হৃদয় খান ও বাউল শিল্পী সায়েরা রেজার জঁমজমাট পরিবেশনায় আর বৃহত্তর ওয়াশিংটন প্রবাসী বাংলাদেশিদের আনন্দোচ্ছল অংশগ্রহনের মাধ্যমে অনুষ্ঠিত হল বৃহত্তর ওয়াশিংটন ডিসি, মেরিল্যান্ড ও ভার্জিনিয়ার জনপ্রিয় সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন ফ্রেন্ডস এন্ড ফ্যামেলীর পিঠা উৎসব ২০১৯।
দিনভর গুঁড়িগুড়ি বৃষ্টি আর বৈরী আবহাওয়ার মধ্যে দিয়ে ১৯ জানুয়ারি শনিবার ভার্জিনিয়ার লরেলহীল এলিমেন্টারী স্কুল অডিটরিয়ামে হল উপচেপড়া প্রবাসী বাংলাদেশীদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত হল এই পিঠা উৎসব ২০১৯।

বিকাল পাঁচ টার সময় অনুষ্ঠানের উপস্থাপক শতরূপা বড়ুয়া ও শিব্বীর আহমেদের উপস্থাপনার মধ্যে দিয়ে শুরু হয় পিঠা উৎসবের জমজমাট অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানের শুরুতেই শিল্পী রাতিব রহমান বাংলাদেশ ও আমেরিকার জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশন করেন। এই সময় উপস্থিত দর্শকবৃন্দ দাঁড়িয়ে জাতীয় সঙ্গীতের প্রতি শ্রদ্ধা জানান।
এরপর মঞ্চে দলীয় সঙ্গীত পরিবেশন করা হয়। ওয়াশিংটনের স্বনামধন্য সঙ্গীত শিক্ষক নাছের চৌধুরীর পরিচালনায় স্থানীয় শিল্পী শেখ মাওলা মিলন, আরিফুর রহমান স্বপন, আসমা আহমেদ, শিখা আহমেদ, ক্লেমন্ট গোমেজ, ফাহমিদা শম্পা, রুমানা চৌধুরী সুমি সহ অন্যান্যরা দলীয় সঙ্গীতে অংশগ্রহন করেন। এ সময় তবলায় সঙ্গত করেন আশিষ বড়ুয়া এবং বাঁশীতে সুর তোলেন মোহাম্মদ মাজেদ।
দলীয় সঙ্গীতের পরপরই শুরু হয় একক সঙ্গীত পরিবেশনা। এই পর্বে একক সঙ্গীত পরিবেশন করেন বৃহত্তর ওয়াশিংটনের জনপ্রিয় শিল্পী উৎপল বড়ুয়া, ক্লেমন্ট গোমেজ, রুমানা চৌধুরী সুমি, কালাচাঁদ সরকার, ও সীমা খান। নৃত্য পরিবেশনায় একক নৃত্য পরিবেশন করেন রোকেয়া হাসি। মাটির টানে শিরোনামে পরমা স্যানালের পরিচালনায় দলীয় পরিবেশনা করে তা-থৈ শিল্পীগোষ্ঠীর শিল্পীবৃন্দ। এছাড়া বর্ণমালা শিক্ষাঙ্গনের শিল্পীরা পরিবেশন করে দলীয় নৃত্য। চোখের আলোয় শিরোনামে ওয়াশিংটনের সাংস্কৃতিক সংগঠন হৃদয়বীনা পরিবেশন করে গীতনৃত্য নাটিকা। এই পর্বে অংশগ্রহন করে রুমা ভৌমিক, সোমা বোস, প্রিয়াংকা বোস, মিজানুর রহমান ও মোহাম্মদ মাজেদ। এছাড়াও দলীয় নৃত্য পরিবেশন করে মরিয়াম, আকিব, ইশাত, রাতিব, পারিসা সহ অন্যান্যরা।
সন্ধ্যা সাতটার সময় শেখ মাওলা মিলনের পরিচালনায় শুরু হয় পিঠা প্রতিযোগীতার বিচারকার্য। এই পর্বে বিচারক হিসাবে অংশগ্রহন করেন ওয়াহিদ হোসাইনী, শামীম চৌধুরী, মাসুদ আহমেদ, ও মিসেস আনিস খান। অনুষ্ঠানে রকমারি পিঠাঘর, ঝালটক মিষ্টি পিঠাঘর, লীজবার্গ পিঠাঘর, সাতক্ষীরা পিঠাঘর, সখী পিঠাঘর, নোয়াখালী পিঠাঘর, নিলাচল পিঠাঘর, ঢাকা পিঠাঘর, রংধনু পিঠাঘর, ও বর্ণমালা পিঠাঘর সহ মোট দশটি পিঠা ষ্টল অংশগ্রহন করে। পিঠা প্রতিযোগীতা সর্বোচ্চ ১৬০ নাম্বার পেয়ে প্রথমস্থান দখল করে বর্ণমালা পিঠাঘর। বর্ণমালা পিঠাঘর সর্বোচ্চ ৩৬ রকমের সুস্বাদু পিঠা বানিয়ে প্রথমস্থান অধিকার করে জিতে নেয় স্বর্নের চেইন। সখী পিঠাঘর দ্বিতীয় হয়ে আইপ্যাড এবং রকমারী পিঠাঘর তৃতীয় হয়ে ল্যাপটপ জিতে নেন।
পিঠা উৎসবের বিভিন্ন স্টলে স্টলে শোভা পাচ্ছিল শাড়ি, চুড়ি, নানা গহনা, ফতুয়া, পায়জামা, পাঞ্জাবি, সালোয়ার কামিজ সহ নানা খেলনা। পিঠার ষ্টলগুলোতে ছিল বাংলার ঐতহ্যিবাহী নানা প্রকারের নানা স্বাধের পিঠার সমাহার। পিঠগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য পাটিসাপ্টা, ভাপাপিঠা এলোগুলো, বুলশা, বিবিখানা, তেলের পিঠা, চিতই পিঠা, চানার সন্দেষ, গজগজা, পাকুনপিঠা, মাংসেররপিঠা, নারিকেল পুলি ও পিঠা, নিমকি, চুপিতা পিঠা, ঝালপিঠা, সাবুদানার পিঠা, ডালপুরি , ডালপাকন, পানতুয়া সহ প্রায় পঞ্চাশ রকমরে পিঠা।
এছাড়াও অনুষ্ঠানে ওয়াশিংটন বিসিসিডিআই বাংলাস্কুলের কর্মকর্তা ও অভিভাবকবৃন্দ সুস্বাধু বিরিয়ানী সহ অন্যান্য খাদ্যসামগ্রীর স্টলে নিয়ে অংশগ্রহন করেন। অনুষ্ঠানে দশটি পিঠা স্টলে সহ প্রায় চল্লিশটি ষ্টলের পশরা বসে। সন্ধ্যা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত ষ্টলগুলোতে মানুষের উপচে পড়া ভীড় ছিল লক্ষনীয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন ফেয়াফ্যাক্স কাউন্টির কমনওয়েলথ এটর্ণী জেনারেল রে মোরহ। বিশেষ অতিথি হিসাবে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ডেমোক্রেট নেতা ড্যান হেলমার, হিউম্যান রাইটস এটর্ণী ও ডেমোক্রেট নেতা ইয়াসমিন তায়েব, ফোবানা এক্সিকিউটিভ সেক্রেটারি জাকারিয়া চৌধুরী, ফোবানা ২০১৯ সম্মেলনের সদস্য সচিব আবীর আলমগীর এবং সাপ্তাহিক বর্ণমালার সম্পাদক মাহফুজ আহমেদ। অতিথিদের শুভেচ্ছা বক্তব্যের পর অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ফেয়াফ্যাক্স কাউন্টির কমনওয়েলথ এটর্ণী জেনারেল রে মোরহ লালফিতা কেটে অনুষ্ঠানের উদ্বোধন ঘোষনা করেন। এ সময় আয়োজক এবং আয়োজক সহযোগী আকতার হোসাইন, বোরহান আহমেদ, রেদওয়ান চৌধুরী, আরিফুর রহমান স্বপন, মনির হোসাইন ও শেখ মাওলা মিলন সহ অন্যান্যরা উপস্থিত ছিলেন।

অনুষ্ঠানে স্পন্সর অ্যাওয়ার্ড প্রদান করা হয়। অনুষ্ঠানের অতিথিদেন কাছ থেকে ফ্রেন্ডস এন্ড ফ্যামেলী অ্যাওয়ার্ড গ্রহন করে একাত্তর ফাউন্ডেশন কবির পাটোয়ারী ও পারভীন পাটোয়ারী, প্যানঅ্যাম গ্রুপ জিআই রাসেল ও জেবা বানু, গোলাম মোস্তফা ও রোখসানা পারভীন, ডাটাগ্রুপ জাকির হোসাইন, পিপল এন্ড টেক ফারহা হানিপ, ও ভার্জিনিয়ার বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মগবুল হোসাইন।
এছাড়া অনুষ্ঠানে বিশেষ সহযোগীতার জন্য অ্যাওয়ার্ড গ্রহন করেন রেদওয়ান চৌধুরী ও উৎপল সাহা। অনুষ্ঠানে উত্তর আমেরিকার দুটি সংঠনকে অ্যাওয়ার্ড প্রদান করা হয়। ফোবানার পক্ষ থেকে অ্যাওয়ার্ড গ্রহন করেন ফোবানার এক্সিকিউটিভ সেক্রেটারি জাকারিয়া চৌধুরী। ফোবানা সম্মেলন ২০১৯ এর স্বাগতিক সংগঠন ড্রামা সার্কেলের পক্ষে অ্যাওয়ার্ড গ্রহন করেন সম্মেলনের সদস্য সচিব আবীর আলমগীর।
অনুষ্ঠানে র্যাফেল ড্র প্রতিযোগীতার মাধ্যমে তিনটি টেলিভিশন প্রদান করা হয়। প্রথম পুরস্কার প্রদান করেন পারভিন পাটোয়ারী ও পালকি পাটোয়ারী, দ্বিতীয় পুরস্কার প্রদান করেন ওয়াশিংটনের বিশিষ্ট লোন স্পেশালিষ্ট শরিফ আহমেদ এবং তৃতীয় পুরস্কার প্রদান করেন আকতার হোসাইন ও ফাহমিদা শম্পা।
অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত শিল্পীদের মধ্যে নাজিয়া লীনা ও কামারুজ্জামান বকুল পরপর ছয়টি গান পরিবেশন করেন। এরপর মঞ্চ মাতান বাংলাদেশের জনপ্রিয় বাউলশিল্পী সায়েরা রেজা ও বর্তমান প্রজন্মের হাটথ্রব সঙ্গীত শিল্পী হৃদয় খান। সায়েরা রেজা ও হৃদয় খান পরপর প্রায় পৌনে দুইঘন্টা ধরে তাদের জনপ্রিয় গানগুলো পরিবেশন করে দর্শকদের মাতিয়ে রাখেন। মধ্যরাত পর্যন্ত ওয়াশিংটন প্রবাসী বাংলাদেশীরা নেচেগেয়ে আনন্দ উদ্দীপনায় মেতে থাকেন। অনুষ্ঠানে নিউইয়র্কের জনপ্রিয় মাটি ব্যান্ড অংশগ্রহন করেন। মাটি ব্যান্ডের সদস্যদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কি-বোর্ড পার্থ, লীড গিটার জোহান, বেইজ কেডি এবং ড্রামে ছিলেন রিচার্ড। বাংলাদেশের হার্টথ্রব শিল্পী হৃদয় খান ওয়াশিংটনের দর্শকদের সাথে দর্শকদের সাথে মিশে গিয়ে নেচে গেয়ে ভিডিও ও সেল্ফী তুলে আনন্দে মেতে উঠেন।
হার্টথ্রব শিল্পী হৃদয় খানের মনোমুগ্ধকর পরিবেশনা শেষে রাত প্রায় বারোটায় অনুষ্ঠানের মূল আয়োজক আকতার হোসেনের সমাপনী বক্তব্যের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটে।